দেশ গঠনে স্থানীয় সরকার পদ্ধতির সংস্কার প্রসঙ্গে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের ছাত্রছাত্রীদের ১ জুলাই ২০২৪ থেকে কোটাবিরোধী আন্দোলনের বিপরীতে শেখ হাসিনার সরকারের অর্বাচীন নেতাদের অবহেলা, অবজ্ঞা এবং অদূরদর্শী মন্তব্যের ফলে তা সহিংস রূপ নেয়। ৫ আগস্ট দুপুরে শেখ হাসিনা বোনকে নিয়ে ভারতে পালিয়া যায়, যা আমাদের সবারই জানা। উল্লেখ্য, ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ছাত্র-জনতার ওপরে শেখ হাসিনার পেটোয়া পুলিশ বাহিনী যে নারকীয় তান্ডব চালিয়েছে, হাজারের ওপরে ছাত্র-জনতা, শিশু-বৃদ্ধ, পথচারী, রাজনৈতিক কর্মীকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছে, তার জন্য তাকে এবং তার সহযোগী সবাই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, এটাই জনগণের প্রত্যাশা। 

সুপ্রিয় পাঠক, আপনারা জানেন, গত ৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে বিশ^বরেণ্য নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেশ পরিচালনায় দক্ষ, অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকাদের নিয়ে তারুণ্য মিশ্রিত একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। এই নতুন সরকারের কাছে সবারই প্রত্যাশা, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া সব জঞ্জাল দূর করে দুর্নীতিমুক্ত বৈষম্যহীন একটা সমাজ গঠনের মধ্য দিয়ে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ে তোলা। এ সময় দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মুখে একটিই কথা, তা হলো রাষ্ট্র সংস্কার। ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ শব্দটি অনেক ছোট হলেও এর ব্যাপকতা অনেক বেশি। দেশের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, লেখক, গবেষক এবং সুশীল সমাজসহ অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিরা রয়েছেন তারা নিশ্চয়ই রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে তাদের মতামত দেবেন। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কার করে ঢেলে সাজাতে হবে। এক কথায় দেশের সার্বিক সংস্কার করতে হবে। এই সংস্কারের নিমিত্তে ইতিমধ্যে ৬টি কমিশন গঠিত হয়েছে যেগুলোর নেতৃত্বে আছেন ড. বদিউল আলম মজুমদার (নির্বাচন কমিশন), ড. আলী রীয়াজ (সংবিধান), সফর রাজ হোসেন (বাংলাদেশ পুলিশ), জাস্টিস শাহ আবু নায়িম মমিনুর রহমান (বিচার বিভাগ), ড. ইফতেখারুজ্জামান (দুর্নীতি দমন বিভাগ) এবং আব্দুল মুয়িদ চৌধুরী (জনপ্রশাসন)। গঠিত কমিটি আগামী ডিসেম্বর ২০২৪-এর মধ্যে তাদের প্রস্তাবনা প্রধান উপদেষ্টা বরাবর উপস্থাপন করবেন। অতঃপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্রসমাজ, সুশীল সমাজের সঙ্গে আলোচনা করে কাক্সিক্ষত সংস্কার করা হবে। এরপর স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে সর্বজনের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হবে। আমরা আস্থা রাখতে চাই, দেশের এই আপদকালীন সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার তার ওপরে বর্তিত এই গুরুদায়িত্ব যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হবেন।

আমার বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে, সেই ১৯৮৬ সালের নির্বাচন, ১৯৯০, ১৯৯৬, ২০০১, ১/১১ (২০০৭-২০০৮), ২০০৯, ২০১৪, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচন দেখেছি। প্রতিটি নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন দল সবসময় নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে। ব্যালট বাক্স ছিনতাই থেকে বর্তমানকালের ডিজিটাল চুরি/মিডিয়া ‘ক্যু’-এর মাধ্যমে ফল নিজেদের করার চেষ্টা করেছে। ২০০৯ পরবর্তী নির্বাচনে কী হয়েছে তা আমরা সবাই জানি। আমার ধারণা, এ ধরনের গতানুগতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন করা হলে ফল একই রকম হবে। তাই এই পদ্ধতির পরিবর্তন দরকার।

একটি ভালো এবং দুর্নীতিমুক্ত সরকার গঠন করতে হলে সবার আগে নির্বাচন ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার করতে হবে। এক্ষেত্রে একেবারে রুট লেভেল থেকে শুরু করতে হবে। যেমন গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, এর পরে জেলা এবং জাতীয় নির্বাচন। গতানুগতিক পদ্ধতি পরিহার করে গ্রাম থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নতুন পদ্ধতি অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে নির্বাচন-পরবর্তী ফলকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করার সুযোগ না থাকে। এতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অধিকার সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। আমাদের ছোটবেলায় গ্রাম সরকার পদ্ধতি চালু হয়েছিল, পরবর্তী সময় উপজেলা পদ্ধতি চালু হয়, কিন্তু সরকারের নীতির ধারাবাহিকতার অভাবে এর আবেদন সর্বজনীন না হওয়ায় সেটা টিকে থাকতে পারেনি, কারণ পুঁজিবাদী সমাজে সামন্তবাদের প্রভাবে তা হারিয়ে যায়। আমাদের দেশে যে প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থা রয়েছে, তাতে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, উপজেলা থেকে জেলা, এমনকি জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনকে স্থানীয় নেতাকর্মীদের ক্ষমতা (মাসল পাওয়ার) এবং অর্থ লেনদেনের প্রভাবমুক্ত রাখা খুবই কঠিন। যা নির্বাচন-পরবর্তী সময় নির্বাচিত প্রতিনিধি ওই অর্থ উত্তোলনের প্রয়োজনে দুর্নীতি করতে বাধ্য হয়। তাই এ ধরনের নির্বাচন ব্যবস্থাকে পরিহার করে একটি নতুন পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। আমার ধারণা, এতে একক ক্ষমতার অবসান হবে। শুধু তাই-ই নয়, এতে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। আসলে আমাদের শুরু করতে হবে গ্রাম পর্যায় থেকে। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার পদ্ধতি এবং নির্বাচন ব্যবস্থা নিম্নরূপে সংশোধন করা যেতে পারে :

প্রতিটি গ্রামে ‘গ্রাম পরিষদ সরকার’ নামে একটি সরকার ব্যবস্থা থাকবে, যার প্রধান হিসেবে থাকবেন ‘গ্রাম সরকারপ্রধান’ (ঐবধফ গধহ)। ওই গ্রাম সরকারপ্রধানের অধীনে ১৬ সদস্যের একটি কমিটি থাকবে। এই কমিটির সব সদস্যকেই স্থানীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হতে হবে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলো :

ক. শিক্ষা সম্পাদক, খ. ক্রীড়া সম্পাদক, গ. পরিকল্পনা ও উন্নয়ন সম্পাদক, ঘ. মহিলা ও শিশুবিষয়ক সম্পাদক, ঙ. বন ও পরিবেশ সম্পাদক, চ. অর্থ ও বাজেট সম্পাদক, ছ. ধর্ম সম্পাদক, জ. কৃষি সম্পাদক, ঝ. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, ট. সাংস্কৃতিক সম্পাদক, ঠ. যোগাযোগ সম্পাদক, ড. পানি সম্পাদক, ঢ. আইন ও বিচার সম্পাদক, ণ. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, ন. নির্বাহী সম্পাদক-১ (প্রথম সদস্য সচিব), প. নির্বাহী সম্পাদক-২ (দ্বিতীয় সদস্য সচিব)।

গ্রাম সরকার এর অনুরূপ ইউনিয়ন পরিষদ সরকার, উপজেলা পরিষদ সরকার এবং জেলা পরিষদ সরকার থাকবে। প্রত্যেক সরকারের গঠনতন্ত্রে একই সংখক সদস্য থাকবে। প্রত্যেক সরকারের প্রধান হিসেবে একজন প্রধান থাকবে, যার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি কেন্দ্রীয় সরকারের আদলে স্ব স্ব গ্রাম/ইউনিয়ন/উপজেলা/জেলার সার্বিক উন্নয়নে নিজ নিজ বিভাগের বার্ষিক বাজেট প্রণয়নসহ সব বিষয়ে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রত্যেক সম্পাদকের নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য সুনির্দিষ্টভাবে  উল্লেখ থাকবে। এতে স্থানীয় পর্যায়ের দুর্নীতি ব্যাপক হারে কমবে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচনে তাদের বিশেষ ভোটিং ক্ষমতা থাকবে। যেমন গ্রাম সরকারের ভোটিং ক্ষমতা ১৫, অন্যান্য সম্পাদকের ক্ষমতা ১০। ‘ইউনিয়ন পরিষদ সরকার’-এর অধীনেও ১৬ জন সম্পাদক থাকবে, যাদের ভোটিং ক্ষমতা ইউনিয়ন সরকারপ্রধানের ক্ষেত্রে ২০ এবং সম্পাদকদের ক্ষেত্রে ১৫ হতে পারে। একইভাবে উপজেলা সরকার প্রধানের ভোটিং ক্ষমতা ২৫ এবং তার সম্পাদকদের (১৬ জন) ভোটিং ক্ষমতা ২০ করা যেতে পারে, জেলা পরিষদের প্রধানের ভোটিং ক্ষমতা ৩০ এবং সম্পাদকদের ২৫ করা যেতে পারে। এই ভোটিং ক্ষমতা জাতীয় নির্বাচনের (সংসদ নির্বাচন) ভোটের সঙ্গে সন্নিবেশ করতে হবে। জাতীয় নির্বাচন, বিশেষ করে সংসদ নির্বাচন সাধারণ জনগণের ভোটের মাধ্যমে হতে হবে। তবে ভোট গণনার ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের ভোটের ফলকে ৭৫ শতাংশের মাধ্যমে গণনা করতে হবে এবং অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ ভোট সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার সব গ্রাম সরকার, ইউনিয়ন সরকার, উপজেলা/জেলা পরিষদ সরকার এবং তাদের সম্পাদকদের ভোটের ফলাফলের মাধ্যমে চূড়ান্ত করতে হবে। এতে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী জনপ্রতিনিধিদের একক ক্ষমতা, দম্ভ এবং প্রভাব কিছুটা হলেও খর্ব হবে, ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার উপায় তৈরি হবে বলে আমি মনে করি।

স্থানীয় সরকার পদ্ধতি পরিবর্তন করে গ্রাম সরকার, ইউনিয়ন পরিষদ সরকার চালু করার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে উপজেলা এবং পরবর্তী সময় জেলা পরিষদ সরকার নির্বাচন করে একটি সর্বজনীন সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। যদিও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এ ধরনের সংস্কার একটি জটিল এবং সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া, ফলে এতে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ এবং বাধার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো :

ক. প্রশাসনিক দক্ষতা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি : গ্রাম বা ইউনিয়ন পরিষদ সরকার চালু করার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের কাছে প্রশাসনিক ক্ষমতা সরাসরি পৌঁছে যাবে, যা স্থানীয় সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করতে সহায়ক হতে পারে। খ. স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন : এ ধরনের সরকার ব্যবস্থা স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করবে এবং তাদের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে। গ. জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা : স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহি বৃদ্ধি পাবে। প্রতিটি স্তরে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচন করা হলে সরকারের ওপর তাদের বিশ্বাস ও আস্থা বাড়বে। ঘ. অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ : এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করতে হলে সরকারি বাজেটে বড় পরিবর্তন আনতে হবে এবং যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া স্থানীয় নেতাদের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে কার্যকরী নীতিমালা তৈরি করতে হবে। চ. আইনি ও সাংবিধানিক সংশোধন : এমন পরিবর্তন আনতে হলে প্রচলিত আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হবে। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং এ জন্য জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা, সহমত এবং সমর্থন প্রয়োজন।

এ ছাড়া সরকার গঠন প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন পদ্ধতির ওপর প্রভাব ফেলে এমন বেশ কিছু বিষয় যেমন ভোটার রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া, নির্বাচনী অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণে ভারসাম্য বজায় রাখা, প্রার্থীদের যোগ্যতা এবং নির্বাচন ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ, নির্বাচনী প্রচারণা ও মিডিয়া ব্যবহারের নিয়ম-কানুন প্রণয়ন ইত্যাদি বিষয়ে যথাযথ কার্যক্রম নেওয়া, যাতে সব প্রার্থী সমান সুযোগ পায় এবং জনমত গঠনের প্রক্রিয়া সঠিকভাবে পরিচালিত হয়। 

আমি মনে করি, এ ধরনের পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার একটি জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং জনগণের আস্থা অর্জন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে। এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক পরিকল্পনা, আইনগত সংশোধন এবং জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সমর্থন। তাই রাষ্ট্র সংস্কারের একটি ধাপ হিসেবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী এবং জনবান্ধব করতে দেশের নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকরা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করবেন এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা