অন্তর্বর্তী সরকারে আঞ্চলিক ভারসাম্য কতটা জরুরি 

গত বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের সময়ে মন্ত্রিপরিষদে সরকারপ্রধানদের এলাকার ব্যক্তিদের প্রাধান্য ছিলো। বৈষম্যবিরোধী দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আগের রীতি-ধারা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি বলে অভিযোগ। আলোচনা-সমালোচনার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করার জরুরিত্ব নিয়ে নানাজনের নানা মত রয়েছে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে রয়েছেন অর্থনীতিবিদ, আইনজীবী, সাবেক কূটনীতিক, সাবেক সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী, উন্নয়নকর্মী, আলেম ও শিক্ষার্থীপ্রতিনিধি। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ উপদেষ্টা পরিষদে যে ২৪ জন সদস্য রয়েছেন তার মধ্যে অন্তত ১৩ জনের জন্মস্থান চট্টগ্রাম বিভাগ। এছাড়া ঢাকা বিভাগের ৭ জন, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ১ জন করে উপদেষ্টা রয়েছেন। সিলেট বিভাগের ১ জন ও কলকাতায় জন্মগ্রহণকারী ১ জন। চট্টগ্রাম জেলার উপদেষ্টা সবচেয়ে বেশি।

এসব উপদেষ্টার অধীনে থাকা দপ্তরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদেও তাদের নিজ এলাকার ব্যক্তিরা বেশি দায়িত্ব পাচ্ছেন। তবে উপদেষ্টা পরিষদে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের কেউ নেই।

উপদেষ্টা পরিষদে ছাত্রপ্রতিনিধি হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের মধ্য থেকে ৩ জন উপদেষ্টা রয়েছেন; তাদের দুই জন চট্টগ্রাম বিভাগের এবং একজন ঢাকা বিভাগের।

আইনগতভাবে মন্ত্রী কিংবা উপদেষ্টা পরিষদে নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের আধিক্য দোষের কিছু নয়। তবে এটা সাধারণ সময়ের যুক্তি। বিশেষ সময়ে এবং বিশেষ যুক্তিতে গঠিত সরকারের ক্ষেত্রে এটা শুধু দোষণীয়ই নয়, নিন্দনীয়ও বটে।

বিশ্লেষকরা যদিও বলছেন, এক্ষেত্রে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও দক্ষতার বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ সরকারে কোনো বৈষম্য হয়েছে বলা যায় না, তবে সরকার যেহেতু বৈষম্যবিরোধিতার স্লোগানসম্ভূত তাই দেশের সব অঞ্চলের মানুষের আনুপাতিক অংশগ্রহণ থাকলে এর সামর্থ্য ও সংহতি নিশ্চিত হত এবং সরকারের বিষয়ে কারও মনে কোনো প্রশ্ন জাগতো না।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন তারা তো শুধু তার নিজের এলাকার প্রতিনিধিত্ব করছেন না, তারা সারাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। পরিচিতি ও যোগ্যতার ভিত্তিতে উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে সারাদেশ থেকে প্রতিনিধি নেওয়া হলো ভালো হতো। কারণ একই এলাকার মানুষের মানসিকতা এক রকম হওয়াই স্বাভাবিক। সব এলাকার মানুষের অংশগ্রহণ থাকলে মানসিকতার বিচিত্রতা নিশ্চিত হতো।’

উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে শুরু থেকেই বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন দেশের নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সারজিস আলম। তিনি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘শুধু একটা বিভাগ থেকে ১৩ জন উপদেষ্টা! অথচ উত্তরবঙ্গের রংপুর, রাজশাহী বিভাগের ১৬ জেলা থেকে কোনো উপদেষ্টা নাই!....’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে সেটা বৈষম্য নয়। কারণ এটা কোনো রাজনৈতিক সরকার নয়। বিশেষ সরকার। পারস্পরিক সম্পর্ক ও আস্থার ভিত্তিতেই সাধারণ মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা হয়। রাজনৈতিক সরকারের সময়ে আগে থেকেই নিজেদের মধ্যে বোঝাপাড়া থাকে সদস্যদের মধ্যে, কারণ তারা একই দলের। কিন্তু বিশেষ ধরণের সরকারে সে সুযোগ কম। রাজনৈতিক দলের সরকারের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের বিষয়টি মিলবে না। দেখতে হবে কোয়ালিটিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি না।’

প্রশ্ন উঠে, দেশের সব যোগ্য ব্যক্তিই কি নির্দিষ্ট এলাকায় জন্ম নিয়েছেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘সে প্রশ্ন থাকতেই পারে। দেশের সব অঞ্চলের যোগ্য মানুষদের নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হলে এবং এর আয়তন আরও বাড়লে এটা ‘ডাইভার্সিফায়েড’ হতো। এমন হলে ভালো হতো, সরকারের সামর্থ্য ও সংহতি বাড়তো।’

উপদেষ্টা পরিষদে চট্টগ্রাম বিভাগের ১৩ জন

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্মস্থান চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায়। তার উপদেষ্টা পরিষদে তিনিসহ অন্তত ১৩ জনের জন্মস্থান চট্টগ্রাম বিভাগে। প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্তত ৬ জন চট্টগ্রাম জেলার। এরা হলেন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের অধিবাসী মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, যিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মতো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বীরপ্রতীক, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম, ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের জন্মস্থান চট্টগ্রাম জেলায়।

এ বিভাগের কুমিল্লা জেলার তিনজন রয়েছেন উপদেষ্টা পরিষদে। তারা হলেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার এবং যুব ও ক্রীড়া এবং স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

চট্টগ্রাম বিভাগের আরও যারা রয়েছেন- শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের জন্মস্থান নোয়াখালী; অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের পৈতৃক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়, যদিও তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকায়; পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার বাড়ি খাগড়াছড়ি এবং মো. মাহফুজ আলমের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলায়।

ঢাকা বিভাগে ৬ জন

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম এবং সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী ঢাকার বাসিন্দা। এ বিভাগের নরসিংদী জেলার অধিবাসী পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের জন্ম মুন্সীগঞ্জে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফের জন্ম কলকাতায়। কলকাতা কোর্টে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করে পরে তিনি ঢাকায় আসেন।

অন্যান্য এলাকা যেসব উপদেষ্টার জন্মস্থান

বন ও পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার অধিবাসী। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের জন্মস্থান সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জে, যদিও তিনি কর্মসূত্রে ময়মনসিংহে স্থায়ী।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বরিশাল বিভাগের একমাত্র উপদেষ্টা। অন্যদিকে খুলনা বিভাগ থেকে একমাত্র উপদেষ্টা হয়েছেন সেখ বশির উদ্দীন। যশোরের নাভারনে জন্ম নেওয়া এই উপদেষ্টা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন।