অর্থনীতি

ব্যবসায় স্থবিরতা বাজারে হতাশা

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনামলে গত দেড় দশকে ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে নতুন করে সাজাতে অন্তর্বর্তী সরকার ১০০ দিনে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু জুলাই-আগস্টের আন্দোলন, পরবর্তীকালে শ্রমিকদের আন্দোলনের প্রভাব রয়েই গেছে। বিশেষ করে শিল্প-কারখানার উৎপাদনে বড় সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক উৎপাদনশীল কোম্পানিও এখন ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকের তারল্যসংকট, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, বাজার অব্যবস্থাপনাসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে এখনো অস্থিরতা রয়েই গেছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে সফলতাও দেখা যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সুফল পেতে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। মূল্যস্ফীতি, বাজার ব্যবস্থাপনাসহ কিছু বিষয়ে এখনো শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়ার সময় আছে। আর শ্বেতপত্র কমিটি ও টাস্কফোর্স কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণের পথ পাওয়া যাবে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) ইতিমধ্যে জানিয়েছে, অর্থনীতিতে সংস্কার আনার জন্য ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে সময় দিতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনীতি সংস্কারের ভার পড়ে অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের ওপর। প্রথমে অর্থ, বাণিজ্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকলেও দুই ধাপে উপদেষ্টা পরিষদের আকার বাড়ানোর পরপর তিনি আছেন শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। ধসে পড়া ব্যাংক খাত সংস্কারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্বে রয়েছেন আরেক অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর।

দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি উচ্চ মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখিতা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব নেওয়ার পর ইতিমধ্যে কয়েক দফা নীতি সুদহার বাড়িয়েছেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। নীতি সুদহার বেড়ে এখন ১০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।

নতুন গভর্নরের নির্দেশনায় ব্যাংক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে দুর্বল ১১ ব্যাংকে (যাদের সিংহভাগই এস আলমের নিয়ন্ত্রণে ছিল) নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। রিজার্ভ সংকট কাটাতে আমদানি কমিয়ে সীমিত পর্যায়ে নিয়ে আসার সিদ্ধান্তও হয়েছে। পাশাপাশি আমদানির ক্ষেত্রে জোর তদারকিরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দিতে বেসরকারি অন্য ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তারল্য সংকট ধীরে ধীরে কাটছে।

ডলার সংকট কাটাতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত তিন মাসে এর ফলও এসেছে। ডলার বিক্রি না করে, ঋণ পরিশোধ করেও রিজার্ভ বাড়ছে। বিশেষ করে গত সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) বিল পরিশোধ করার ফলে রিজার্ভ কিছুটা কমলেও চলতি সপ্তাহে তা আবার ২০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার কথা রয়েছে। গত দুই মাসে রেমিট্যান্স এসেছে গড়ে ২৪০ কোটি ডলার করে। অক্টোবরে রপ্তানি আয় বেড়েছে ২১ শতাংশ। সব মিলিয়ে বিদেশি মুদ্রার প্রবাহ ধীরে ধীরে বাড়ছে।

গত সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইএমএফ জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক রেপো রেট বৃদ্ধি সঠিক পথে একটি পদক্ষেপ। মূল্যস্ফীতির সাম্প্রতিক বৃদ্ধির বেশিরভাগই সরবরাহ-সম্পর্কিত ছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারকে সংস্কারে সময় দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংস্থাটি বলছে, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থ প্রদানের ভারসাম্য এবং বিশেষত বিদেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রেও ব্যাঘাত ঘটেছে। সুতরাং বাজেট সহায়তা কিছুটা স্বস্তি দেবে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারকে নীতি সংস্কারে কিছু সময় ও সুযোগ দিন।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু জরুরি পণ্যে শুল্কছাড় ও কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পরে সুপারিশ আমলে নিয়ে সেগুলোতে শুল্কছাড়ও দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। গত সপ্তাহে বাণিজ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন সেখ বশির উদ্দিন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার আলুর ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্কহার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করেছে। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

ভোজ্য তেলের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে পরিশোধিত সয়াবিন তেল, অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, অপরিশোধিত পাম তেল ও অন্যান্য অপরিশোধিত ভোজ্য তেল আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। স্থানীয় উৎপাদক ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ভোজ্য তেলে মোট ১০ শতাংশ শুল্ক কমানো হয়। ডিম আমদানির ক্ষেত্রে আরোপনীয় কাস্টমস ডিউটি ২৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ ২০ শতাংশ শুল্ক সুবিধার পরও ডিমের বাজারে দাম না কমে উল্টো বাড়ছে। ইতিমধ্যে রমজানের গুরুত্বপূর্ণ পণ্য খেজুরের শুল্ক কমানোর সুপারিশ করেছে ট্যারিফ কমিশন।

বিভিন্ন পণ্যে এত শুল্কছাড়ের পরও সাধারণ মানুষের অস্বস্তি কাটছেই না। গত দুই বছর মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। সর্বশেষ গত অক্টোবর মাসে গড় মূল্যস্ফীতি আবারও বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে দেশের মানুষের গড় শ্রম মজুরি বেড়েছে মাত্র ৮ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের গড় আয়ের চেয়ে গড় ব্যয় এখনো ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। আবার গড় আয়ের চেয়ে খাবার কিনতে গড় ব্যয় ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেশি।

দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে এবং দৈনন্দিন দরকারি পণ্যের দাম যাতে যৌক্তিক পর্যায়ে থাকে, সেজন্য বাজার তদারকি করতে জেলায় জেলায় বিশেষ টাস্কফোর্স করেছে সরকার, যা ইতিমধ্যেই কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে পণ্য সরবরাহ ঠিক রাখা ও দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার কার্যকর কৌশল না থাকার সুযোগ নিয়ে দাম বাড়াচ্ছেন একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ে এখনো উদ্বেগের জায়গা আছে। এখানে এখনো শক্তিশালী কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ফল পেতে এখনো সময় লাগবে। কিছু পদক্ষেপ আরেকটু প্রাসঙ্গিক করে করলে হয়তো ভালো ফল পাওয়া যাবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার বাড়াচ্ছে, কিন্তু পাশাপাশি আরও কিছু পদক্ষেপ যেমন রাজস্বনীতি, বাজার ব্যবস্থাপনায় আরও শক্তিশালী উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’

এত শুল্কছাড়ের পরও বাজারের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না, এতে করণীয় কী হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে সেলিম রায়হান বলেন, ‘ডিম আমদানির অনুমতি আছে, কিন্তু সেটির জন্য অনেক বাধা-বিপত্তিও আছে। নানা ধরনের ক্লিয়ারেন্স পেতে সময় লাগছে। এখন সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।’ তিনি মনে করেন, একটি নীতি ঘোষণা দিলেই যে তা বাস্তবায়িত হয়ে যাবে, তা নয়। বাস্তবায়ন করার জন্য আরও অনেক আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বগুলো দেখতে হবে।

অর্থনীতি সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম পদক্ষেপগুলোর অন্যতম দুটি কমিটি সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদের নেতৃত্বাধীন ‘অর্থনীতির পুনঃকৌশলীকরণ এবং ন্যায়সংগত ও টেকসই উন্নয়নের জন্য সম্পদ সংগ্রহ’ শীর্ষক টাস্কফোর্স। এ দুই কমিটি সরকারকে অর্থনীতি সংস্কারে কিছু সুপারিশ করবে।

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘আমি এখনো অপেক্ষা করব শে^তপত্র প্রণয়ন কমিটি ও টাস্কফোর্স যে সুপারিশগুলো দেবে তার জন্য। সুপারিশগুলো এ সরকার কতটুকু আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করবে সেটির ওপর নির্ভর করবে অর্থনীতি। সে সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

তিনি বলেন, চলতি মাসের শেষের দিকে শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদন আসবে, সামনের মাসে আসবে টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন। তখন দেখা যাবে সরকার কতটুকু আন্তরিকতার সঙ্গে সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করছে।

গত তিন মাসে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থিতিশীলতাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে আগস্টের শেষদিকে শুরু হওয়া পোশাক খাতে শ্রমিকদের আন্দোলন এখনো চলছে। পোশাক শ্রমিকদের ১৮ দফা দাবি মেনে নেওয়ার পরও গাজীপুর ও আশুলিয়ার শিল্প এলাকায় অস্থিরতা থামছে না।

এরই মধ্যে পোশাক খাতের রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ। যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, এগুলো আগের ক্রয়াদেশের ফল। শ্রম অস্থিরতার কারণে গত তিন মাসে ৪০ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশের ক্ষতি হয়েছে বলেও জানিয়েছিল পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ। আগামী কয়েক মাস রপ্তানি আয় কমতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।