ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটেছে। দেশ পরিচালনায় গঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ভবিষ্যতে দেশ কোনদিকে এবং কী ধারায় অগ্রসর হবে, তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। দেশে যেন স্বৈরশাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তা নিয়ে একাট্টা রাজনৈতিক দলগুলো। তাই রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগে সমর্থন আছে দলগুলোর। তবে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার শেষ করে যাবে, নাকি নির্বাচিত সরকার এসে করবে, তা নিয়ে মতভেদ আছে।
কোনো কোনো দল বলছে, তারা সংস্কারের পরই নির্বাচন চায়। আবার কোনো কোনো দল রাষ্ট্র মেরামতে সংস্কার চাইলেও তার জন্য অনির্বাচিত সরকারকে দীর্ঘ সময় দিতে চায় না। তাদের মতে, সরকার সংস্কারের পথ তৈরি করে দ্রুতই নির্বাচনের আয়োজন করবে।
গত বুধবার বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভোটের মাধ্যমে দেশে একটি নতুন সরকার নির্বাচিত করার আগে নানা সংস্কার দরকার। সংস্কারের গতিই ঠিক করে দেবে, নির্বাচন কত দ্রুত হবে।
গত ৫ আগস্ট তীব্র গণআন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। তার সরকারের পতনের পর গত ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাসহ অনেকেই গা-ঢাকা দিয়েছেন। শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ দেশ ছেড়েছেন, কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন। গ্রেপ্তার হয়েছেন কয়েকজন। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা বা দলটিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে না দেওয়ার কথাও হচ্ছে। তবে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পক্ষে নয় বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারে থাকা কয়েকজন উপদেষ্টাও একই কথা বলেছেন। তারা মনে করেন, রাজনীতি থেকে বিরত রাখার বিষয়টি ছেড়ে দিতে হবে আদালত ও জনগণের ওপর।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপি-জামায়াতসহ ছাত্র-জনতার আন্দোলনে থাকা দলগুলো সক্রিয়।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হলেও বিএনপির অনেকেই তা মানেননি। দখল-বাণিজ্যসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে। যদিও এসব বিষয়ে বেশ কঠোর অবস্থানে বিএনপি। এমনকি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকেও এসেছে কঠোর বার্তা। এ সময় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সাংগঠনিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
নির্বাচন ও সংস্কার নিয়ে একাধিকবার অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। দলটির পক্ষ থেকে আগেই ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ দীর্ঘ হোক, তা চায় না দলটি। তারা চাইছে, অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করবে। দলটি মনে করে, সব সংস্কার এই অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নয়। গুরুত্বপূর্ণ এমন কিছু বিষয় যেটা নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সেই বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে অনতিবিলম্বে সেগুলো সংস্কার করে জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। পরবর্তী সময়ে জনগণের ভোটের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকার সংস্কার কার্যক্রম শুরু করবে।
ঠাকুরগাঁওয়ে গত ১৩ নভেম্বর এক সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ১৭ বছরের জঞ্জাল সরানো ১৭ দিনেও সম্ভব নয়, ১৭ মাসেও সম্ভব নয়। তাই এ সরকারকে সময় দিতে হবে। তবে তাদের সবকিছু সংস্কারে হাত দেওয়ার খুব বেশি প্রয়োজন নেই। সেটা নির্বাচিত যে পার্লামেন্ট (সংসদ) আসবে, সেই পার্লামেন্ট করবে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিকভাবে সুবিধা করতে না পারলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে দলটি। প্রথম দিকে রাজনৈতিক সক্রিয়তা দেখাচ্ছিল প্রশাসনিক স্তরে। এসব জায়গায় নিজেদের লোক নিয়োগ, পদায়নেরও অভিযোগ ওঠে দলটির বিরুদ্ধে। এ ছাড়া গত এক যুগে জামায়াত নেতারা যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল, সেগুলো ফিরে পেতে বেশ তৎপরতা দেখা গেছে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে বেশ কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন জামায়াত নেতারা। সরকারকে যথেষ্ট সময় দিতে চান তারা। যদিও তাদের এমন অবস্থান নিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতাদেরও সমালোচনা করতে দেখা গেছে।
গতকাল শুক্রবার বাগেরহাটে জামায়াতের সদস্য (রুকন) সম্মেলনে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের দেশের অধিকাংশ প্রশাসনিক দায়িত্বে রেখে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। বিচার, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, সংবিধানের সংস্কারসহ ছয়টি স্তরে সংস্কারের যৌক্তিক সময়ের পর একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। তিনি বলেন, শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধের জন্য অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে হবে। এমন একটা জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, যার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের কবর রচনা হবে।
শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে সমর্থন থাকলেও জুলাই আন্দোলনের মাঠে দেখা যায়নি জাতীয় পার্টিকে। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ওই বৈঠকে জাতীয় পার্টির নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
তবে দলটির ব্যাপারে আপত্তি তুলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। তাদের অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সহযোগী ছিল জাতীয় পার্টি। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের ডাকা সংলাপে জাতীয় পার্টিকে এখনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এমনকি দলটির কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
সংস্কার-নির্বাচন স্পষ্ট হচ্ছে মতভেদ : রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর প্রথম দিকে যে উৎসাহ ও ঐক্য দেখা গিয়েছিল, তা এখন অনেকটা ভাটা পড়েছে। সংস্কার, তার রূপ ও প্রক্রিয়া বিভিন্ন দলগুলোর মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সংসদ নির্বাচন, সংবিধান বাতিল না সংস্কার, রাষ্ট্রপতির অপসারণ, আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজনৈতিক ঐকমত্যকে পাশ কাটিয়ে কোনোরকম সংস্কার বা বদল স্থায়ী হয় না। সংস্কার রূপরেখা ও যৌক্তিক সময় দিতে সম্মত। কিন্তু সরকার কী করতে চায়, তা স্পষ্ট হতে চাইছে রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে তাদের আস্থায় নিয়ে নির্বাচনী সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারকে নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের মতো ঘটনা ঘটলে সেখানে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার থাকে। বিভিন্ন দল বিভিন্ন গোষ্ঠী বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে সেই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করে। আমরা দেখেছি বিভিন্ন দল আলাদা আলাদাভাবে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে। সেটা নিয়ে মতানৈক্যও হয়েছে। এখানে বিশেষ করে বিএনপি, তারা সরকারের সঙ্গে তাদের কিছু দ্বিমত পোষণ করছে, চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। আবার জামায়াতে ইসলামীকে দেখলাম তারা সরকারকে সময় দিতে চায়। এ নিয়ে কিছুটা মতবিরোধ হয়তো তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে সরকারের উপদেষ্টাও নানা বক্তব্যে বলার চেষ্টা করছেন, তারাও চাপে আছেন। তারাও চাইছেন দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন দিতে। আমার কাছে মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে ভালো সমাধান হলো নির্বাচনের দিকে। আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকটকাল চলছে। আগামী দিনগুলোতেও এ সংকটের মধ্যে থাকবে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম সেলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সামান্য কিছু বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে রোডম্যাপ নিয়ে এ মতভেদ। অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে আস্থায় নিয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা অব্যাহত রেখে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে পারে। আবার একই সঙ্গে নির্বাচনের রোডম্যাপও দিতে পারে। এ দুটোর মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে এলে আমার মনে হয় না রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আর মতানৈক্য থাকবে।’