মানুষের অনেক রকমের আকাক্সক্ষা আর প্রত্যাশা পূরণে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পাওয়া অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারে আটটি কমিশন গঠন করেছে। যার মধ্যে একটি হলো জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। তাদের হাতে পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও এটি বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আমলাতন্ত্র।
প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা আনতে হলে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও পদায়ন পদ্ধতি সংস্কারে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি জনমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন করতে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনকে কঠিন নীতিমালা ও কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে বলে মনে করেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলারা। নিয়োগে স্বচ্ছতা, প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া এবং তদবির ও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে বলে মনে করেন তারা।
অন্যদিকে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন বলেছে, জনমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ জনপ্রশাসনব্যবস্থা গড়ে তোলাই এ কমিশনের মূল লক্ষ্য।
বর্তমান সরকারের ১০০ দিনে দেখা গেছে, প্রশাসনে পদোন্নতি, বদলি, চাকরিচ্যুত ছাড়া তেমন কোনো বড় পরিবর্তন হয়নি। তিন মাসের বেশি সময় পরও এখনো আমলারা নিজেদের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত বেশি। প্রশাসনে এখনো গতি আসেনি পুরোদমে। সরকারও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের একের পর এক দাবি-দাওয়া মেনে নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সত্যিকার অর্থে কতটা জনপ্রশাসন সংস্কার হবে তা নিয়েও সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংস্কারের আগে প্রশাসনে কাঠামোগত ও আইনি এবং অন্যান্য যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। কিন্তু জনপ্রশাসন সংস্কারে গঠিত সংস্কার কমিশন যে প্রশ্নমালা তৈরি করেছে তা দেখে মনে হয়েছে এটা ছাত্রদের থিসিস পেপার। এভাবে সংস্কার হবে না। তাছাড়া সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং চলমান প্রক্রিয়া। এত অল্প সময়ে সত্যিকারের সংস্কার করা অসম্ভব।
তিনি বলেন, সংস্কার কমিশন হয়তো ছোটখাটো কিছু সংস্কার করে এ সংক্রান্ত একটা সুপারিশ দিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। একই সঙ্গে প্রশাসনে যারা আছেন তাদের মানসিকতার পরিবর্তনও দরকার। কিন্তু বর্তমানে জনপ্রশাসনের যে দুরবস্থা তাতে জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণ করা সম্ভব নয়।
ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘যারা সংস্কার করবেন তাদের ঈগলের চোখ দিয়ে দেখতে হবে। যোগ্য লোক বাছাই করে উপযুক্ত স্থানে বসাতে হবে। সিংহের চোখ দিয়ে দেখলে হবে না। কিন্তু আমরা দেখছি এখনকার প্রশাসন স্বজনপ্রীতি আর বিদ্বেষ নির্ভর। পছন্দের লোক অযোগ্য হলেও তিনি সুবিধা পাচ্ছেন বেশি। আবার যোগ্য ব্যক্তি অপছন্দের হলে তিনি ছিটকে পড়ছেন। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারও ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকে বের হতে পারেনি।’
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, যারা সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছেন তারাও দীর্ঘদিন আগে অবসরে গেছেন। বর্তমানে প্রশাসন কতটা সংস্কার করতে পারবে তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সংস্কার মানে তো শুধু বদলি আর পদোন্নতি নয়। কিন্তু এখনকার প্রশাসন তো দাবি আদায়ের ফোরামে পরিণত হয়েছে। নিজেদের ব্যক্তিগত দাবি তুলছে। আর সরকারও একের পর এক মেনে নিচ্ছে। এভাবে সংস্কার করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। সত্যিকারের সংস্কার করতে সব বিদ্বেষ ভুলে মেধাবীদের মূল্যায়ন করতে হবে। কাঠামোগত ও আইনগত পরিবর্তন জরুরি। না হলে অতীতের মতো এবারও সংস্কার সম্ভব হবে না বলে মনে করেন তিনি।
তার মতে, পদোন্নতির বর্তমান প্রক্রিয়টাই মান্ধাতা আমলের। এমন প্রক্রিয়া পৃথিবীর অনেক দেশেই নেই। এ ক্ষেত্রে যদি পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনা হয়, তাহলে রাজনৈতিক বিবেচনায়ও কাউকে পদোন্নতি বঞ্চিত করতে পারবে না।
ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘এখন জনবল কাঠামো যেভাবে আছে, সেটা অনেক পুরনো, সঠিকভাবে নেই। সংস্কারের জন্য আইনগত ও কাঠামোগত দুটি পরিবর্তনই প্রয়োজন হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক নতুন পদের প্রয়োজন হতে পারে। তাই সার্বিকভাবে প্রশাসনের কাঠামোটা পরিবর্তন করতে হবে।’
সাবেক এই আমলা বলেন, ‘নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব থাকা উচিত নয়। পিএসসিতে (সরকারি কর্ম কমিশন) রাজনৈতিক বিবেচনায় চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়। সার্চ কমিটির মাধ্যমে যোগ্যদের এখানে বসাতে হবে।’
গত ৪ নভেম্বর এক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টাকে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সবার মতামত সংগ্রহ শুরু হয়েছে। কমিশনের সদস্যরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সফর করে জনসাধারণের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। এ ছাড়া জনপ্রশাসনের বিভিন্ন ক্যাডার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় শুরু হয়েছে; যা চলমান রয়েছে। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন পেশ করবে বলে তিনি জানান।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সংস্কার আনতে দুই দফায় আটটি কমিশন গঠন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে রয়েছে জনপ্রশাসন। গত ৩ অক্টোবর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চেয়ারম্যান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরীকে প্রধান করে আট সদস্যের জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়।
জনমুখী, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক, নিরপেক্ষ জনপ্রশাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে এ কমিশন গঠন করা হয়েছে বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়। ৯০ দিনের (তিন মাস) মধ্যে প্রস্তুত করা প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এরপর ৫ অক্টোবর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জনপ্রশাসন সংস্কারে গঠিত কমিশনের সদস্যদের প্রত্যাখ্যান করেন প্রশাসন ক্যাডার ছাড়া বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) ২৫টি ক্যাডারের কর্মকর্তারা। তারা বলেন, কমিশনে সব ক্যাডারের সদস্য নেই। আটজনের মধ্যে ছয়জনই প্রশাসন ক্যাডারের। এ কমিশন সব ক্যাডারের প্রতিনিধিত্ব করে না। এতে জনপ্রশাসনের সমস্যার সঠিক চিত্র উঠে আসবে না।
এই জোটের কর্মকর্তারা জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন পুনর্গঠন করে সেখানে সব ক্যাডারের প্রতিনিধিত্ব চান। একই সঙ্গে তারা সিভিল সার্ভিসের বাইরে জনপ্রশাসন বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞকে কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্তির দাবি জানান।
তাদের অভিযোগ, এই ক্যাডারই মূলত প্রশাসনে বৈষম্য সৃষ্টিকারী। এর আগেও বৈষম্য নিরসনে প্রশাসন ক্যাডারকে দিয়ে কমিশন গঠিত হয়েছিল। তখন তারা সে সুযোগে বৈষম্য আরও বাড়িয়েছে। বৈষম্যপূর্ণ এ কমিশন কোনোভাবেই বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে না; বরং বিদ্যমান সিভিল প্রশাসন আরও গণবিরোধী হবে।
এর আগে গত ২১ সেপ্টেম্বর সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘টেবিলের ওপর জগ থাকবে না প্লাস্টিকের মগ থাকবে, এটা কোনো বিবেচ্য বিষয় না। এটা কোনো পরিবর্তন না। পুলিশের জার্সি চেঞ্জ হবে না লোগো চেঞ্জ হবে, স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন হবে এটি মুখ্য ব্যাপার না।’ সে সময় ‘সংস্কারের রোডম্যাপ’ না দেওয়ার সমালোচনাও করেন তিনি।