ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঠেকাতে নির্বিচার গুলিতে হাজারের বেশি মানুষকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের উপদেষ্টা, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও দলটির শীর্ষ নেতারা এবং পুলিশের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। যাদের বিচারে পুনর্গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এরই ধারাবাহিকতায় আজ সোমবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও দলটির নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা এবং সাবেক সরকারের উপদেষ্টা, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ ১৪ জনকে।
এদিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাত নেতাকর্মীকে গুম এবং নির্যাতন করে পঙ্গু করার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নতুন করে আরও সাতটি অভিযোগ জমা পড়েছে। গতকাল রবিবার ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখায় ভুক্তভোগীদের পক্ষে অভিযোগগুলো জমা দেন ছাত্রশিবিরের আইনবিষয়ক সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান।
আজ যাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করার কথা রয়েছে তারা হলেন সাবেক আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হক, আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বেসরকারি বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী দিপু মনি, দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, একই দলের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব জাহাঙ্গীর আলম এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাবেক সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। এর আগে গত ২৭ অক্টোবর এই ১৪ জনের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছিল বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন বিচারকের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। যার ধারাবাহিকতায় আজ তাদের হাজির করা হচ্ছে।
গণ-অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। এরপর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এ সরকার গণহত্যার অভিযোগে বিচার শুরুর উদ্যোগ নেওয়ার পর এই প্রথম আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও ক্ষমতাচ্যুত সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হচ্ছে।
গণহত্যা ও গুমের অভিযোগে প্রসিকিউশন শাখায় এখন পর্যন্ত ৮০টির মতো অভিযোগ জমা হয়েছে। যার বেশিরভাগ হত্যার অভিযোগে।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রাথমিক তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, দলটির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, পুলিশের কয়েকজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে গত ১৭ অক্টোবর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির মাধ্যমে বিচারের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। ইতিমধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে পুলিশের দুজন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের প্রাথমিক বিচারকাজ শুরু হয় পুরনো হাইকোর্ট ভবনের পাশে একটি ভবনে। তবে পুরনো ভবনটির সংস্কারকাজ প্রায় শেষের পথে। শিগগির এই ভবনে আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ (অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক) শুরু হবে। বিচারের লক্ষ্যে শিগগির ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধন করা হবে বলে কিছুদিন আগে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
শিবিরের ৭ নেতাকে নির্যাতন-গুমের অভিযোগ : ছাত্রশিবিরের যে সাত নেতাকর্মীকে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে বিচারের আবেদন জমা পড়েছে তাদের মধ্যে ছয় ভুক্তভোগী গতকাল ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। একজন এখনো গুম থাকায় তার পক্ষে স্বজনরা অভিযোগ জমা দেন। উপস্থিত থাকা অভিযোগকারীরা হলেন দেলোয়ার হোসেন মিশু, নুরুল আমিন, মো. আলমগীর হোসেন, আবদুল করিম, মো. জনি ইসলাম এবং সাইফুল ইসলাম। আরেক ভুক্তভোগী কামরুজ্জামান ২০১৭ সাল থেকে এখনো নিখোঁজ। পৃথক সাতটি অভিযোগে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, পুলিশ ও র্যাবের ৫৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের কারও নাম প্রকাশ করা হয়নি।
প্রথম অভিযোগ অনুযায়ী, মো. জনি ছাত্রশিবিরের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শাখার কর্মী হিসেবে কাজ করছিলেন। ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টার দিকে প্রশাসন ও ছাত্রলীগের ১৫-২০ জন তাকে বাড়ির পড়ার টেবিল থেকে উঠিয়ে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে নিয়ে যায়। বিনোদপুর বাজারে অবস্থান করা গাড়িতে তাকে উঠিয়ে চোখ বেঁধে ফেলে। জনিকে সেখান থেকে রাজপাড়া থানায় নেওয়া হয়। সেখানে রাত ১২টার পর থেকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। হাতের কবজি, পায়ের তালুতে চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করা হয়।
রাত দেড়টার পর তাকে থানা থেকে বের করে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় দাঁততলা নামে একটি আমবাগানে। সেখানে তার বাম পায়ে শটগান ঠেকিয়ে তিনটি গুলি করা হয়। পরে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে মামলা দিয়ে পাঠানো হয় কারাগারে। গুলির ঘটনায় জনির বাম পা কেটে ফেলতে হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগ অনুযায়ী, মো. আবদুল করিম ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানার কর্মী ছিলেন। ২০১৩ সালের ৩ মার্চ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে এবং তার মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন করিম। সেই মিছিলে পুলিশ এবং আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা হামলা ও গুলি চালায়। একটি বুলেট করিমের মেরুদ-ে বিদ্ধ হয়। এতে তার মেরুদণ্ড অকার্যকর হয়ে যায়। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি ১১ বছর যাবৎ চিকিৎসা নিচ্ছেন।
তৃতীয় অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে মির্জাপুর বাজার থেকে প্রতিবাদ মিছিল শুরু হয়। যাতে পুলিশ, বিজিবি এবং আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা গুলি চালায়। যার একটি বুলেট এসে ছাত্রশিবিরের কর্মী মো. আলমগীর হোসেনের ডান কানে লাগে। আহত অবস্থায় তিনি পড়ে গেলে পুলিশ গ্রেপ্তার করে গাড়িতে ওঠানোর সময় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা তাকে ছিনিয়ে নিয়ে মারধর করে। একপর্যায়ে রামদা দিয়ে দুপায়ে কোপ দিলে চেতনা হারিয়ে ফেলেন আলমগীর। পরে মৃত ভেবে তাকে ৩০ ফুট উঁচু ব্রিজ থেকে ফেলে দেয়। এতে তার মেরুদ- ভেঙে যায়। গত ১১ বছর ধরে তার চিকিৎসা চলছে।
চতুর্থ অভিযোগ অনুযায়ী, মো. দেলোয়ার হোসেন মিশু নোয়াখালীর মাইজদী থানা সেক্রেটারি ছিলেন। ২০২২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মাইজদী পৌর বাজার থেকে জামায়াতে ইসলামীর মিছিল শুরু হলে পুলিশ হামলা চালায় এবং গুলিবর্ষণ করে। ওই সময় একটি রাবার বুলেট লেগে তার ডান চোখ নষ্ট হয়ে যায়।
পঞ্চম অভিযোগ অনুযায়ী, মো. সাইফুল ইসলাম তারেক ছাত্রশিবিরের স্থানীয় থানার কর্মী ছিলেন। ২০১৭ সালের ১৪ জুন সাদা পোশাকে র্যাব সদস্যরা তাকে নিজ বাড়ির আঙিনা থেকে উঠিয়ে নিয়ে যান। দুদিন পর তাকে বান্দরবানের ক্যাসিংঘাটা নিয়ে গিয়ে ৫৯ দিন বন্দি রাখা হয়। পরে ২০১৯ সালে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হলে ১০ মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান।
ষষ্ঠ অভিযোগ অনুযায়ী, মো. নুরুল আমিন শিবিরের ভাটারা থানা সভাপতি ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষার্থী ঢাকা থেকে গুম হওয়ার পর তাদের সন্ধানে গুলশান থানায় ২০১৩ সালের ২৬ জুন সাধারণ ডায়েরি করে গুলশান আজাদ মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ে বের হলে সাদা পোশাকে থাকা র্যাবের সদস্যরা তাকে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নেন। ৩ মাস ১৫ দিন পর একদিন রাত ৩টার দিকে গাড়িতে করে চোখ বাঁধা অবস্থায় মানিকগঞ্জের ঘিওরে নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সপ্তম অভিযোগ অনুযায়ী, মো. কামারুজ্জামান ছাত্রশিবিরের ঝিনাইদহের একটি ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০১৭ সালের ৪ মে তিনি বন্ধুর বাসায় যান। রাত ২টার দিকে সাদা পোশাকে ৮-১০ জন লোক প্রশাসনের পরিচয় দিয়ে সেখান থেকে কামারুজ্জামানকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ মেলেনি।