ওপরে ‘মুজিব চিরন্তন’ লেখা কালো চামড়ার ঘড়ির বাক্স। ভেতরে কালো বেল্টের সোনালি সাদা ডায়ালের ঘড়িটির বিশেষত্ব এটিতে বাংলায় সময় লেখা। যাতে রয়েছে জ¦লজ¦লে মুজিব শতবর্ষের লোগো। বিশেষভাবে অর্ডার দিয়ে বানানো টাইটানের এসব ঘড়ির প্রতিটির বাজার দাম ১৬ হাজার টাকা। মুজিব জন্মশতবর্ষ উদযাপনের অনুষ্ঠানে প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে এ ঘড়ি উপহার দেওয়ার একক সিদ্ধান্ত নেন জন্মশতবর্ষ উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। প্রথম দফায় ৩০০ ঘড়ি অর্ডার দেওয়া হয়, পরে অর্ডার দেন আরও ২০০ ঘড়ি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিব থেকে শুরু করে উদযাপনের কর্মযজ্ঞে সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই বরাদ্দ হয় এ ঘড়ি। যদিও এ ঘড়ি কেনার টাকার কোনো হিসাব জানেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কেউ কেউ বলছেন টাকা কোথা থেকে এসেছে এটি প্রধান সমন্বয়ক জানেন, আবার কেউ কেউ বলছেন এ ঘড়ি তৈরি পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ স্পন্সর করেছে। প্রিমিয়াম কোয়ালিটির এ ঘড়িটি বিদেশি অতিথিদের উপহারসামগ্রীতেও দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নারী কর্মকর্তাদের জন্য ছিল জামদানি, রাজশাহী সিল্ক ও কাতান শাড়ি। উপহারের এসব দামি ঘড়ি ও শাড়ির একটিও অবশিষ্ট নেই।
কিন্তু ভিন্ন চিত্র একই আয়োজনের জন্য তৈরি করা বিশেষ টি-শার্টের ক্ষেত্রে। জাতীয় পতাকার আদলে সবুজ জমিনে লাল বৃত্তে বঙ্গবন্ধুর ছবি আর তার পাশে মুজিববর্ষের লোগো। উদযাপনের বছরগুলোতে এ টি-শার্টের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও গত ৫ আগস্টের পর দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কেউই মুজিববর্ষের এ টি-শার্ট এখন আর নিতে চাইছেন না। নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পের অধীনে এ টি-শার্ট ক্রয় বা বিতরণ না হওয়ায় বেওয়ারিশ হয়ে মর্গে পরে থাকার মতোই অবস্থা।
মুজিব জন্মশতবর্ষ উদযাপনের সাইট অফিস হিসেবে ব্যবহৃত রাজধানীতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের নিচতলার একটি স্টোররুমে পড়ে আছে প্রায় ৪০ হাজারের মতো বিশেষ ওই টি-শার্ট। সেখানে ৩০০-৪০০টি কার্টনের প্রতিটিতে ১০০টি করে টি-শার্ট রয়েছে। ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা-কর্মচারী এমনকি স্থানীয়দের উপহার হিসেবে দিতে চাইলেও কেউ নিচ্ছেন না এ টি-শার্ট। এ প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তারক্ষী হেলালউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, একসময় ট্রাকে ট্রাকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এ টি-শার্টের কার্টন আর স্যুভেনির পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখন নিজেরাই সেই টি-শার্ট ভয়ে বাসায়ও নিচ্ছেন না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছি এই প্রতিষ্ঠানের। সার্বিক দেখভালের অংশ হিসেবে ভবন পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পাই কার্টন কার্টন টি-শার্ট ধুলোয় পড়ে আছে। এমনটি দেখে নিজের গ্রামের লোকজনকেও দিয়ে দিতে চেয়েছি, কিন্তু কেউই নিতে চাচ্ছে না এ টি-শার্ট।’ তিনি আরও বলেন, ‘কম দামের টি-শার্টের মালিক বা কর্র্তৃপক্ষ নেই, কিন্তু দামি দামি উপহারের কিছুই অবশিষ্ট নেই (শাড়ি, ঘড়ি)।’
টি-শার্টগুলোর নকশা পরিবর্তন করে ব্যবহার উপযোগী করার কথাও ভেবেছেন জানিয়ে অধ্যাপক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘কিন্তু সেটিও সম্ভব নয়। মুজিববর্ষ উদযাপন সংশ্লিষ্ট কেউই এসবের দায় নিতে চাচ্ছেন না।’
মুজিববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানের উপহারসামগ্রীর মধ্যে দামি ঘড়ির গল্প ইনস্টিটিউটের কর্মচারীদের মুখে মুখে। তাদের দাবি, ঘড়িগুলো লাখ টাকা দামের।
আলোচিত এ ঘড়ি কেনার অর্থের উৎস ও হিসাব সম্পর্কে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুজিববর্ষ উদযাপন কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব ছিল যা আদেশ তা বাস্তবায়ন, টাকা কোথা থেকে আসবে আর কোথায় ব্যয় হবে, এসব আমরা জানতেও পারিনি।’
মুজিব জন্মশতবার্ষিকী জাতীয় পর্যায়ে সুষ্ঠুভাবে উদযাপনের জন্য কমিটিকে সহায়তার দায়িত্ব পালন করেন বর্তমান কৃষি সচিব ড. মোহম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। তখন তিনি অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় ছিলেন।
আলোচিত ওই ঘড়ি উপহার পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, ঘড়ি উপহার পেয়েছি।’ উৎসব আয়োজন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘করোনা মহামারীর সময় তাকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সংযুক্ত করা হয়। সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে মন্ত্রণালয়ের অর্পিত দায়িত্ব পালন করা ছাড়া আর কিছুই তিনি জানেন না। মন্ত্রণালয় থেকে যে বাজেট দেওয়া হয়েছে, তা সুষ্ঠুভাবে অডিট করে হিসাব দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানে দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি জানান, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি সময় দিতে হয়েছে, কিন্তু বাড়তি কোনো সুবিধা তারা পাননি। এমনকি বছরে দুটি বর্ধিত বেসিক (মূল বেতন) দেওয়ার কথা থাকলেও, তা বাস্তবায়ন হয়নি। ঘড়ির প্রসঙ্গে বলেন, সরকারি টাকা নয়, বিজিএমইএর ব্যবসায়ীরা এটি স্পন্সর করেছিলেন।
সম্প্রতি মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে কোন কোন খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি হয়েছে তার হিসাব চেয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। মুজিববর্ষের নামে কোন কোন মন্ত্রণালয় কত কোটি টাকা খরচ করেছে, তা নিয়ে ডকুমেন্টেশন হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই খাতের সব ব্যয়ের হিসাব দিতে হবে।
মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে আর্থিক অনিয়ম প্রসঙ্গে সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বহুমাত্রিক রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। এসব ব্যয়ে কোনো প্রকার প্রকল্প নেওয়া হয়নি। সুনির্দিষ্ট জবাবদিহি বা আয়-ব্যয়ের হিসাব থেকে শুরু করে কোনো ধরনের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা বা কোনো কিছুই কিন্তু নিশ্চিত করা হয়নি। আমরা আশা করব, এ চক্রের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল; প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাদের সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।’