ঢাকার সাভারে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ইন্সটিটিউট অব রেডিয়েশন এন্ড পলিমার টেকনোলজি’র একটি ই-রেডিয়েশন সেন্টার রয়েছে যেখানে গামা রশ্মির সাহায্যে কৃষিজাত ও মেডিসিন পণ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়। কেন্দ্রটির সক্ষমতা বৃদ্ধির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন করবে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থা রসাটমের সাইন্টিফিক ডিভিশনের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান।
ইন্সটিটিউট অব রেডিয়েশন এন্ড পলিমার টেকনোলজি ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করে। এই ইন্সটিটিউটের অধীনে পরমাণু নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গবেষণার পাশাপাশি কৃষিজাত ও মেডিক্যাল পণ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এর সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যই মূলত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রটি প্রতিস্থাপনের জন্য রোসাটম প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির নকশা প্রণয়ন, তৈরি, সরবরাহ, স্থাপন, স্থাপনকালীন তত্ত্বাবধায়ন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং কমিশনিংয়ের কাজ সম্পাদন করবে।
খাদ্যদ্রব্য বেশিদিন সংরক্ষণের জন্য প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকারক প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন ক্ষতিকারক প্রিজারভেটিভ থেকে বেরিয়ে এসে কৃষি, মেডিক্যাল ও অন্যান্য পণ্য সংরক্ষণে গামা রেডিয়েশনের ব্যবহার বাড়াচ্ছে।
আধুনিক এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের খাবার পণ্যের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে ব্যবহৃত নানা রকম পণ্য দীর্ঘদিন ধরে গুণগত মান ঠিক রেখে সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করা যায়। পাশাপাশি চামড়াজাত বিভিন্ন ধরনের পণ্য সংরক্ষণেও এর কার্যকারিতা রয়েছে। কেমিক্যাল ব্যবহার করে পণ্য সংরক্ষণ করা তুলনামুলক ব্যয়বহুল ও ক্ষতিকর। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি এজেন্সি (আইএইএ) এ পদ্ধতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
এ বিষয়ে রসাটমের কর্মকর্তারা ই-মেইলে দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রকল্পটির প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং বাংলাদেশে সরবরাহের পাইপলাইনে আছে। দেশে পৌছার পর এগুলোর স্থাপনের কাজ শুরু হবে। যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ শেষ হলে এখানে প্রতি ঘণ্টায় ১ থেকে ১.২ টন পণ্য প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে শোষণকৃত ডোজের পরিমাণ হবে ১০ কিলো-গ্রে।
খাদ্য শিল্পে এবং কৃষি ক্ষেত্রে রসাটমের রেডিয়েশন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্যের সংরক্ষণের মেয়াদ কয়েক গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে জানিয়েছে রসাটম। এর ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ছাড়াই কৃষিজাত ও মেডিকেল পণ্য ২ থেকে ১০ গুণ পর্যন্ত বেশি সংরক্ষণের সময় বেড়ে যায়। এতে ব্যয়ও তুলনামূলক কম। স্থানীয় জনগণের খাদ্য দ্রব্যের নিরাপত্তা এবং দেশের রপ্তানি সম্ভাবনায় ইতিবাচক ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হবে এই কেন্দ্রের মাধ্যমে। অন্যদিকে ৯৯ শতাংশ রোগ সংক্রমণকারী ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসের পাশাপাশি ৯০ শতাংশ পর্যন্ত খাদ্য পণ্যের অপচয় হ্রাস পায়।
বাংলাদেশ ছাড়াও রসাটম বিলিভিয়াতে এ জাতীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। ২০২৩ সালে বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট লুইসা আর্সে কাতাকোরার উপস্থিতিতে প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয়। মাল্টিপারপাস প্রসেসিং সেন্টার পারমাণবিক গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রকল্পের অংশ হিসেবে সমূদ্র পৃষ্ঠ থেকে চার হাজার মিটার উচ্চতায় এল-আলটোতে অবস্থিত। রুশ প্রযুক্তিতে নির্মিত মাল্টিপারপাস সেন্টারে বিভিন্ন কৃষিজাত পণ্যের প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে এগুলোর সংরক্ষণের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় মানদণ্ড নিশ্চিত করা সম্ভব। বিভিন্ন মেডিসিন পণ্য ও সরঞ্জামের স্টেরিলাইজেশনের সুযোগ রয়েছে এ জাতীয় প্রকল্পে। বলিভিয়া প্রকল্পে প্রতিদিন ৭০ টন পণ্যের প্রক্রিয়াজাত করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে ফল, সবজি, দানাদার শস্য ইত্যাদি। উজবেকিস্তানেও এ জাতীয় একটি কেন্দ্র বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। অন্যান্য দেশে কয়েকটি প্রকল্প নির্মাণ নিয়ে আলোচনার চলছে।
অন্যান্য দেশের তুলনায় রুশ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির পার্থক্য তুলে ধরে রসাটম জানায়, প্রথমত, রেডিয়েশন প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে রসাটমের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও রেফারেন্স রয়েছে। ২০১৪ সালে রসাটম তাদের মাল্টিপারপাস প্রসেসিং সেন্টারের উন্নয়নে দিক নির্দেশনা নির্ধারণ করে। বর্তমানে, রাশিয়ায় রসাটমের এ জাতীয় ৮টি সেন্টার রয়েছে। এগুলোর সর্বমোট উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ৬০ হাজার টন।
দ্বিতীয়ত, রসাটম টার্ন-কী ভিত্তিতে কমপ্রেক্স সল্যুশন প্রদান করে থাকে। প্রযুক্তি নির্বাচনের সুযোগ রয়েছে সংস্থাটির। যেমন, এটা ইলেকট্রন এক্সিলারেটর নাকি গামা স্থাপনা, তা নির্বাচনের সুযোগ রয়েছে। রসাটম গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন সমাধান দিতে সক্ষম, এর মধ্যে রয়েছে রেডিয়েশন মেশিনারিজের ধরণ, পরিবহণ পদ্ধতি, অটোমেটিক কনট্রোল, এবং সর্বোপরি গামা ডিভাইসের ক্ষেত্রে কোবাল্ট ভিত্তিক রেডিয়েশন উৎস।
তৃতীয়ত, রসাটম নিজেই সকল যন্ত্রপাতি নিজস্ব কারখানায় তৈরি করে থাকে, যার ফলে ২৪/৭ প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়া সম্ভব হয়। জরুরি প্রয়োজনে গ্যারান্টি মেয়াদে এবং তার পরেও সার্ভিসিং সেবা প্রদান করে থাকে।
সাভারের প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্রটির আধুনিক প্রযুক্তি ভিত্তিক সার্ভিসিং প্রদান করা গেলে, এটির লাইফসাইকেল ৩০ বছর হবে। তবে, সর্বদা রেডিয়েশন নির্গমনকারী ব্যবস্থাকে ন্যূনতম পর্যায়ে সক্রিয় রাখতে হবে, যাতে অতি প্রয়োজনীয় উৎপাদন ক্ষমতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
রসাটমের কর্মকর্তারা জানান, দক্ষিণ এশিয়ায় দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষস্থানীয়। দেশটি মানসম্পন্ন খাদ্যপণ্য নিশ্চিত করতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য, খাদ্য পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণের নেটওয়ার্ক ক্রমাগতভাবে সম্প্রসারণ করতে হবে। আশা করা যাচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে মাল্টিপারপাস প্রসেসিং সেন্টারগুলোর চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। এর লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে।