সমাজ সংস্কারে নবীজির অবদান

পৃথিবীর সবচেয়ে অসভ্য ও নিষ্ঠুর সমাজ ছিল ইসলাম-পূর্ব জাহেলি সমাজ। সে সমাজে ফেতনা-ফ্যাসাদ ও অন্যায়-অবিচার চরম আকার ধারণ করেছিল। মানবজাতি ছিল পথহারা, দিশেহারা। জাতির এমন চরম দুর্দিনে আল্লাহতায়ালা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে হেদায়েতের বাণী দিয়ে সমগ্র পৃথিবীর রহমত বানিয়ে প্রেরণ করেন। পবিত্র কোরআনে রাসুল (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে পুরো বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া ১০৭)

মানবতার মুক্তির দূত প্রিয় নবীজির আদর্শের প্রভাবে অল্প দিনেই জাহেলিয়াতের অন্ধকার কেটে যায়। সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় ইনসাফ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। নবীজি (সা.) জাহেলি সমাজকে সংস্কার করে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পাঠকদের জন্য তার সংস্কারের সামান্য নমুনা উল্লেখ করা হলো।

একত্ববাদের শিক্ষা : তৎকালীন গোটা মানবজাতি ছিল কুফর-শিরকে নিমজ্জিত। মানবতার মুক্তির দূত মহানবী (সা.) এসে পৃথিবীবাসীকে একত্ববাদের শিক্ষা দিয়েছেন।

বৈষম্য নিরসন : রাসুল (সা.) এসে সমমর্যাদা ও সমঅধিকারের শিক্ষা দিয়েছেন। জন্মগতভাবে মর্যাদা ও সম্মানের প্রথা বিলুপ্ত করেছেন। তিনি মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করে শুধুমাত্র মানবতার ভিত্তিতে সমাজের বন্ধন সুদৃঢ় করেন। মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, হে লোক সকল! শোনো, তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতা এক। শোনো, আরবের ওপর অনারবের এবং অনারবের ওপর আরবের, কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের এবং শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আছে কেবল তাকওয়ার জন্যই। (মুসনাদে আহমাদ)

সংঘাতমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা : তৎকালীন আরবের বিভিন্ন গোত্রে হিংসা-বিদ্বেষ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগেই থাকত। মহানবী (সা.) সে সবের অবসান ঘটিয়ে তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বীজ বপন করেন। ফলে শত্রুতার পরিবর্তে তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় ভ্রাতৃত্বের বন্ধন।

শিক্ষা-দীক্ষা সংস্কার : মহানবী (সা.) সামাজিক শিক্ষা-দীক্ষার উদ্যোগ নেন। সমাজের অশিক্ষিত মানুষদের শিক্ষিত করে তোলেন। শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে সমাজের কুসংস্কার প্রথাগুলো দূর করেন।

নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা : তৎকালীন আরবের বর্বর লোকেরা নারীজাতিকে ভোগ-বিলাসের বস্তু ছাড়া কিছুই মনে করত না। মহানবী (সা.) এসে অধিকার বঞ্চিত নারী জাতির অধিকার নিশ্চিত করেন। জুলুম-নিপীড়ন থেকে মুক্তি দান করেন। আইয়ামে জাহেলিয়াতের মনুষত্বহীনরা নিজ কন্যাসন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলতেও দ্বিধাবোধ করত না। মানবতার নবী এসে নারীদের বেঁচে থাকার অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তাকে কী অপরাধে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা তাকভির ৯) মহানবী (সা.) নারীজাতিকে মর্যাদার উচ্চাসনে সমাসীন করে ঘোষণা করেন, মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত। (কানজুল উম্মাল) তিনিই সর্বপ্রথম নারীদের পৈতৃক সম্পদের উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা দেন।