মাত্র চার বছর আগেই মাদারীপুর জেলাকে ড্রেজারমুক্ত ঘোষণা করা হয়। অথচ নদ-নদী থেকে এখনও বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। প্রতি রাতে নদ-নদী থেকে বালু তুলে যাচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। প্রতিনিয়ত অর্ধশত স্পট থেকে বালু তোলায় ভাঙছে নদ-নদীর পাড়। বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি। ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ। বারবার অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার পাচ্ছেন না এলাকাবাসী। যদিও প্রশাসন বলছে, বালু উত্তোলন বন্ধে তাদের অভিযান চলছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার শ্রীনদী, কালিরবাজার, ধুরাইল, দুধখালী, কুনিয়া, বাজিতপুর, পাঁচখোলার জাজিরার তাল্লুক, মহিষেরচর, চরমুগরিয়া, দুধখালী, লঞ্চঘাট, রাজৈর উপজেলার হরিদাসদি-মাহেন্দ্রদী, কবিরাজপুর, আমগ্রাম, টেকেরহাট, কালকিনি উপজেলার ফাঁসিয়াতলা, সাহেবরামপুর, কালীনগর, রমজানপুর, রাজারচর, শিবচর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী, কুতুবপুর, উৎরাইল হাটসংলগ্ন, দত্তপাড়া, নিলখী, শিরুয়াইল, চরচান্দা, কাওলিপাড়া, চরজানাজাতসহ জেলার অর্ধশতাধিক স্থানে অবৈধভাবে এই বালু উত্তোলন কার্যক্রম চলছে। বেশিরভাগ সময়ই রাত থেকে ভোর পর্যন্ত ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু তোলা হয়। পরে সারা দিন ড্রেজার মেশিনগুলো নদীর পাড়েই ফেলে রাখা হয়।
জেলার পদ্মা, পালরদী, ময়নাকাটা, কুমার, আড়িয়াল খাঁসহ বিভিন্ন নদ-নদীতে অবৈধভাবে এভাবে বালু তোলা হচ্ছে। এ কাজের সঙ্গে জড়িত আছেন বিভিন্ন দলের সাবেক ও বর্তমান পদধারী নেতাকর্মীরা।
জানা যায়, ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন মাদারীপুরকে ড্রেজারমুক্ত ঘোষণা করেন। ওই সময় বালু উত্তোলন অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি বদলিজনিত কারণে চলে যাওয়ার পর আবার শুরু হয় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। পরে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর থেকেই নতুন করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের হিড়িক পড়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীরা কৌশলে রাতভর বালু উত্তোলন করছেন। এ কারণে স্থানীয়রা এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হন না।
নদীর পাড়ের মাইতুল ইসলাম এখন থাকেন শহরের ভাড়া বাসায়। কিন্তু একসময় কুমার নদের পাড়ে তার বাড়ি ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছর আগে নদীভাঙনে বাড়িঘর, জমিজমা বিলীন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘যারা ড্রেজার মেশিন দিয়ে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তুলছেন, তাদের কোনো দল নেই। তারা সব সময়ই সুবিধাজনক অবস্থায় থাকেন। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। যত দিন না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তত দিন এ কার্যকম চলবেই। তাই তাদের অবৈধ কার্যক্রম বন্ধের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাই।’
মাদারীপুর শহরের লঞ্চঘাট এলাকার এসএম হোসেন বলেন, ‘দিনের পর দিন অপরিকল্পিতভাবে এই বালু উত্তোলন করায় শহররক্ষা বাঁধটিও হুমকির মুখে। তাই এখনই যদি এগুলো বন্ধ না হয়, তাহলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে সবাইকে। তাই প্রশাসনের উচিত এখনই কঠোরভাবে এগুলো দমন করা।’
রাজৈর উপজেলার বাসু নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘দিনের বেলা বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও রাত হলেই শুরু হয় কার্যক্রম। রাতে ড্রেজারের শব্দে টিকে থাকা দায়। দিন দিন ড্রেজারের সংখ্যা বাড়ছেই। এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে নদীর তীর ও তীরবর্তী ফসলি জমি।’
মাদারীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘মাদারীপুর জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে জেল-জরিমানাসহ ড্রেজার মেশিন জব্দ ও পাইপ ভেঙে নষ্ট করা হচ্ছে। বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।’