এবারো কি উষ্ণ শীতকালের দিকে এগুচ্ছে দেশ? গত বছর কুয়াশার কারণে তাপমাত্রার পারদ বেশি নামতে পারেনি। তবে কুয়াশার কারণে শীতের দাপট ছিল। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ শুরু হলেও শীতের প্রভাব এখনো শুরু হয়নি। দেশের উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়ে গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে। তবে পুরোদমে শীত শুরু হতে আগামী মাসের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
চলতি মাসে দেশের গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকার কথা ১৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে তাপমাত্রার পারদ ১৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ঢাকায় ১৮ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হলেও এখনই তাপমাত্রা কমবে না বলে জানিয়েছেন ঝড় সতর্কীকরণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্রের আবহাওয়াবিদ কামরুল হাসান।
তিনি গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদিও পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে এসেছে তবে তা সহসা এর নিচে নামবে না। আরও প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত তাপমাত্রা এমন স্থিতিশীল থাকতে পারে। আর যদি এই অবস্থায় থাকে তাহলে পুরোদমে শীত শুরু হতে আগামী মাসের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত কয়েক বছরের চিত্র থেকে দেখা যায় এবারো হয়তো সংক্ষিপ্ত উষ্ণ শীতকালের অনুভব পাওয়া যেতে পারে। এখন শীতকালের দৈর্ঘ্য অনেক কমে গেছে। ডিসেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হলে জানুয়ারির শেষার্ধে আবার তাপমাত্রা বাড়তে থাকে।’
উষ্ণ শীতকাল কেন হতে পারে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে ঘন কুয়াশা দেখা যাচ্ছে। এই ঘন কুয়াশার কারণে শীতের দাপট থাকবে কিন্তু তাপমাত্রার পারদ বেশি কমবে না। আর এতে শীত বেশি অনুভব হবে কিন্তু তাপমাত্রা বেশি থাকবে।’
ঘন কুয়াশা প্রসঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ড. সমরেন্দ্র কর্মকার বলেন, ‘বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী হওয়ায় আমাদের দেশের আকাশে জলীয়বাষ্প থাকে। অপরদিকে ভারতের উত্তর প্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশ হয়ে দিল্লি পর্যন্ত আকাশে কুয়াশার একটি চাদর থাকে যা আমাদের অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। আর এ কারণেই ঘন কুয়াশা দেখা দিচ্ছে। এই কুয়াশার কারণে সূর্যের আলো ভূ-পৃষ্ঠে প্রবেশ করতে পারে না। আর সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না বলে ভূ-পৃষ্ঠের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বেশি থাকলেও শীতের অনুভব বেশি থাকে।’
এদিকে আবহাওয়ার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘চলতি মাসে আর বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ বা নিম্নচাপ সৃষ্টির সুযোগ নেই। এখন ধীরে ধীরে শীতের প্রভাব বাড়তে থাকবে। তবে পুরোদমে শীতের আবহ শুরু হতে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।’
এবার কি শীতের তীব্রতা বেশি থাকবে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জলবায়ুগত তারতম্যের কারণে শীতের তীব্রতা মারাত্মক আকারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তেমন একটা নেই। তারপরও বিক্ষিপ্তভাবে হয়তো অঞ্চলভেদে তাপমাত্রার পারদ কোথাও কোথাও বেশি নেমে যেতে পারে। স্বাভাবিকভাবে মাঝারি মাত্রার শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ঘন কুয়াশা কিভাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে জানতে চাইলে দীর্ঘদিন ধরে আবহাওয়া ও জলবায়ু নিয়ে গবেষণা করা ন্যাশনাল ওশেনোগ্রাফিক অ্যান্ড মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের (নোয়ামি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, ‘কুয়াশার কারণে তাপমাত্রা ভূ-পৃষ্ঠ বিকিরণ হতে পারে না বলে তাপমাত্রা কমে না, আবার সূর্যের আলোও আসতে পারে না বলে ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা যেমন আছে তেমনই থাকে। আর এতে এতে তাপমাত্রা না বাড়লেও শীতের অনুভূতি বাড়ে।’
সাধারণত ঘন কুয়াশা ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৫০০ বা ৩৫০০ ফুট উপর পর্যন্ত কুয়াশার চাদর থাকে। এই কুয়াশার চাদরের কারণে সূর্যের আলো প্রবেশে বাধা পায়। তখন বিমান বন্দরগুলোতে বিমান উঠা-নামায় সমস্যায় হয়। এসময় ঢাকায় অনেক বিমান অবতরণ করতে পারে না বলে চট্টগ্রাম বা দেশের বাহিরের কোনা বিমান বন্দরে গিয়ে অবতরণ করে।
তবে এবার বিকল্প হিসেবে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বিমান বন্দর সপ্তাহে চারদিন ও সিলেট বিমান বন্দর সপ্তাহে তিন দিন ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়া।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপাত্ত অনুযায়ী, কোনো অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যদি ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়, তখন ওই এলাকায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। আর যদি তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয় তখন ওই এলাকায় মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ এবং কোনো এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৫ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে।
উল্লেখ্য, দেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকাল হলেও জানুয়ারি মাস বছরের সবচেয়ে শীতলতম মাস। বছরের এসময়ে তাপমাত্রা সবচেয়ে কম থাকে। এসময়ে সাধারণত উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে শীতল বাতাস প্রবেশ করে থাকে।