ভোটে আস্থা ফেরার আশা

নতুন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতি আস্থা রাখতে চায় রাজনৈতিক দলগুলো। তারা আশা করছে, এ কমিশন নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে কাজ করবে।

প্রায় দুই মাস শূন্য থাকার পর গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা হয়েছে। সাবেক সচিব এএমএম নাসির উদ্দীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তার সঙ্গে কমিশনার হিসেবে আছেন দুজন সাবেক আমলা, একজন সাবেক বিচারক ও একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও চার কমিশনার আগামীকাল রবিবার শপথ নেবেন বলে জানা গেছে।

নিয়োগ পাওয়ার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নাসির উদ্দীন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মানুষ যাতে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে।

এ নিয়ে বেশ কয়েকটি দলের নেতাদের সঙ্গে দেশ রূপান্তর কথা বলেছে। তারা বলছেন, নতুন নির্বাচন কমিশনের কাছে তাদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিন পর জনগণ তাদের ভোটের অধিকার ফিরে পাবে। বিগত তিনটি নির্বাচনে ইসির প্রতি যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, সেটি কাটাতে এ নির্বাচন কমিশন কাজ করবে।

রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। এ সরকারের অধীনে একটা ভালো নির্বাচন করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে এ নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে অবশ্যই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে হবে। গত ৫ আগস্ট প্রবল গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেড় ছেড়ে ভারতে চলে যান। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ৫ সেপ্টেম্বর কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন পদত্যাগ করে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হয়েছিল এ কমিশনের অধীনে। বিএনপিসহ অনেক দল নির্বাচন বর্জন করে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়। এমন প্রেক্ষাপটে গত জুলাই মাসে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের আন্দোলন থেকে গণআন্দোলনের সূত্রপাত হয়।

আওয়ামী লীগের আমলে তিনটি সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির ঘটনায় মানুষ নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থাহীন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় জনগণ অতিদ্রুত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন চায় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপিরও প্রত্যাশা নতুন কমিশন জনগণের চাহিদা পূরণে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করুক। আশা করি, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে এখন থেকেই কাজ শুরু করবে ও একটি নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করবে নতুন নির্বাচন কমিশন।’

অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনব্যবস্থাসহ বেশ কয়েকটি খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য কমিশনও গঠন করা হয়েছে। তবে নির্বাচন কবে হবে সে ব্যাপারে কোনো ধারণা দেয়নি সরকার। এ অবস্থায় অনেক দিন ধরেই নির্বাচন ও সংস্কার নিয়ে কথা বলছে রাজনৈতিক দলগুলো। বিএনপি দ্রুত নির্বাচন চায়। দলটি বলছে, নির্বাচনের জন্য যতটুকু সংস্কার প্রয়োজন, সেটা শেষ করে নির্বাচন দিক সরকার।

অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকে সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে প্রয়োজনীয় অত্যাবশ্যকীয় সংস্কারকাজ করেই দ্রুত নির্বাচন দেওয়া হবে বলেও সরকারের একাধিক উপদেষ্টা জানিয়েছেন।

এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের সরকারের সময় ২০২২ সালের জানুয়ারিতে করা নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন আইন অনুযায়ী, গত মাসের শেষের দিকে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। এ সার্চ কমিটি বুধবার রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিটি পদের জন্য দুজন করে ১০ জনের নামের তালিকা দেয়। সেই তালিকা থেকে পাঁচ সদস্যের এই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করে দেন রাষ্ট্রপতি।

এই নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রত্যাশার বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই কমিশনের প্রতি দাবি থাকবে, তারা যেন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করে ও নির্বাচনের আগেই কোনো দলের প্রতি হেলে না যায়।’

বাম গণতান্ত্রিক জোটের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আমরা চাই নতুন নির্বাচন কমিশন এমন একটি নির্বাচনের উদাহরণ তৈরি করবে যাতে আগামীতে নির্বাচন কমিশনের সদস্য হওয়ার পর দৃঢ়তা নিয়ে দায়িত্ব পালন করে ভালো নির্বাচন করতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমতায় অন্তর্বর্তী সরকার থাকলেও নানা প্রভাব রয়েছে নির্বাচন কমিশনের ওপর। এসব প্রভাবমুক্ত হয়ে ভালো নির্বাচন দিতে পারবে এটা প্রমাণ করতে হবে, এটাই তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।’

গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের করা আইনে গঠিত সার্চ কমিটির মাধ্যমে এই নির্বাচন কমিশন হয়েছে। সেই বিষয়ে তো বিতর্ক আছেই। সেই বিতর্ক বড় হয়ে দেখা দেবে যদি এই নির্বাচন কমিশনের উপযুক্ততা ভবিষ্যতে প্রমাণ না হয়। তারা ভালো করলে প্রশ্ন কম উঠবে। তারা যদি খারাপ করে বা কারও কারও বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ ওঠে, তখন কিন্তু পুরনো আইন বা সার্চ কমিটি নিয়ে আবার নতুন করে প্রশ্ন দেখা দেবে।’

তিনি মনে করেন, নির্বাচন কমিশনের প্রধান কাজ হবে নির্বাচন পদ্ধতির ওপর যে গণহতাশা তৈরি হয়েছে, সেটা থেকে মানুষকে উদ্ধার করা এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা।