তিন চাকার বাহন রিকশা। প্যাডেল রিকশার সঙ্গে ব্যাটারি যুক্ত করে তৈরি হয় ব্যাটারিচালিত রিকশা। এই রিকশা যান্ত্রিক হওয়ায় তেমন পরিশ্রম না করেই বেশি উপার্জন করা যায়। ব্যাটারিচালিত হলেও প্যাডেল রিকশার মতোই এর ব্রেক পদ্ধতি। দ্রুত চলাচলে এই রিকশায় দুর্ঘটনাও বেশি হয়। তবে কম সময়ে দ্রুত চলাচল ও ভাড়া কিছুটা কম হওয়ায় ব্যাটারিচালিত রিকশার চাহিদাও বাড়ছে। নিয়ম-নীতির মধ্যে এই রিকশা চলাচল করলে দুর্ঘটনা কমবে ও এই পেশায় যারা জড়িত রয়েছেন তারাও বেঁচে থাকবেন বলে মনে করছেন সড়ক বিশেষজ্ঞরা।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুটা নড়বড়ে হয়ে পড়লে বেপরোয়া হয়ে ওঠে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। গত ৫ আগস্টের আগে ব্যাটারিচালিত রিকশা শুধু রাতেই চলত। রাতে দূরের পথে যেতে এই রিকশা ব্যবহার করতেন অনেকে। কিন্তু বর্তমানে রাতে-দিনে, অলিগলিতে ও প্রধান সড়কে চলছে এই রিকশা। দ্রুত চলাচলে দুর্ঘটনাও বাড়ছে এই রিকশায়। প্রায়ই সড়কে দেখা যায় মোটরসাইকেল বা বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে এই বাহন। নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়ায় চালকদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। দ্রুত যাত্রী উঠাতে হবে, জমা টাকা তুলতে হবে ও বাড়তি উপার্জনের টার্গেট থাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশায় ঝুঁকি বাড়ছে।
ব্যাটারিচালিত রিকশার ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, পায়েচালিত রিকশায় যখন কোনো রকমভাবে মোটর ও ব্যাটারি দিয়ে অটোরিকশা বানানো হয়, সেগুলো চলাচলে সড়কে দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। কারণ যে অটোরিকশাগুলো দেখি, সেগুলো মূলত পায়েচালিত রিকশার জন্য উপযোগী। সেগুলো মানদ- আর অটোর মানদ- এক নয়। সেই অটোরিকশায় যখন মোটরসাইকেলের মতো ২৫ গতিতে চলে। আর ব্রেক সিস্টেম থাকে প্যাডেলচালিত রিকশার মতো। ফলে বেশি গতি থাকায় ব্রেক সিস্টেম সহজে কন্ট্রোল করা যায় না। আর যে ব্যাটারি লাগানো হয়, সেটিও কাঠামোগত অনেক ভুল থাকে। সেই রিকশাগুলোর সাইজ একেক রকম হওয়ায় কোনো কাঠামোই ঠিক থাকে না। কোনো গবেষণা ছাড়া যানবাহনগুলো তৈরি করায় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
কয়েকটি ব্যাটারিচালিত রিকশার দুর্ঘটনা : গত ১৮ নভেম্বর দুপুর ১২টায় রামপুরায় একটি অটোরিকশা বাসের ধাক্কায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানে থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শী মাহাবুব জানান, রামপুরায় প্রধান সড়কে বেপরোয়া গতিতে আসায় বাসের সঙ্গে ধাক্কা লেগে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায়। পরে অটোরিকশায় থাকা যাত্রীকে দ্রুত সিএনজিচালিত অটোরিকশায় হাসপাতালে পাঠানো হয়। আর রিকশাচালকও গুরুতর আহত হন। গত ২৭ অক্টোবর বংশাল এলাকায় রাস্তা পারাপারের সময় মো. সুমন নামে এক শিক্ষার্থী অটোরিকশায় আহত হন। তিনি জানান, গত ৫ আগস্টের পর এই অটোরিকশা বেড়ে গেছে সড়কে। চালক বেপরোয়া গতিতে চালানোর সময় আমার ওপর উঠিয়ে দেন রিকশা। তাদের মনিটরিং করা দরকার। তা না হলে সড়কে দুর্ঘটনা আরও বাড়বে। শুধু এই দুটি ঘটনাই নয়, এভাবে প্রতিনিয়ত রাজধানীর অলিগলিতে ব্যাটারিচালিত রিকশায় ঘটছে দুর্ঘটনা। বুয়েটের সড়ক ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটে (এআরআই) দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত রিকশায় ৯০০টি দুর্ঘটনা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৮২টি দুর্ঘটনা গুরুতর। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে ৩১৮ জন।
চাহিদাও বাড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশার : ব্যাটারিচালিত রিকশায় যেমন ঝুঁকি রয়েছে, তেমন কিছু বাস্তবতাও রয়েছে। এই পেশায় শুধু ঢাকা মহানগরী এলাকায় প্রায় ১৫ লাখ মানুষ জড়িত। তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপার্জন হয় অটোরিকশা। হঠাৎ এই রিকশা বন্ধ হয়ে গেলে এতগুলো মানুষ পথে বসে যাবে। এ ছাড়া আগের চেয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা নগরবাসীর কাছে জনপ্রিয়ও হয়ে উঠেছে। দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত, প্যাডেল রিকশার চেয়ে তুলনামূলক ভাড়া কম, দ্রুত চলাচলে রাতে ছিনতাইয়ের ভয় কম, দূর পথে যেতেও বাধা নেই এবং দ্রুত গন্তব্যের যাওয়া যাবে এই চিন্তা করে ব্যাটারিচালিত রিকশার চাহিদা বাড়ছে। আবার কম পরিশ্রম হওয়ায় ১৫-১৬ বছরের কিশোর ও ৬০ ঊর্ধ্বের বৃদ্ধরাও এই রিকশা চালাতে পারেন।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ঝুঁকির পাশাপাশি এই রিকশার কিছু ভালো দিকও রয়েছে। রাতারাতি এটা বন্ধ করা ঠিক হবে না। যাতায়াতের ক্ষেত্রে অন্য যানবাহন সহজলভ্য না থাকায় দিন দিন এই অটোরিকশার চাহিদা বেড়েছে যাত্রীদের কাছে। আমি মনে করি, এই অটোরিকশা আরও ভালোভাবে মডিফাইড করে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের একটি মানদ- তৈরি করতে হবে। সেই সঙ্গে ব্রেকিং সিস্টেমও হাইড্রোলিক করতে হবে। একটি নীতিমালার আওতায় এনে শাখা সড়কগুলোয় এই রিকশা চলাচল করতে পারে। সেই সঙ্গে শাখা সড়কগুলোতেও ২০ ধরনের যানবাহন চলে। তাই সেখানেও সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে এবং কোন রুটে কতগুলো ব্যাটারিচালিত রিকশা চলতে পারবে। পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশার গুণগতমান আরও বাড়াতে হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে এসব রিকশার কাঠামো তৈরি করতে হবে।
ব্যাটারিচালিত রিকশার সংগঠনগুলো যা বললেন : আধুনিয়কায়নের ছোঁয়ায় সুন্দর বডি, এমআইএসটি উদ্ভাবিত গতিনিয়ন্ত্রক, উন্নত ব্রেকসহ ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিআরটিএ লাইসেন্সের মাধ্যমে রাস্তায় চলতে দেওয়ার দাবি জানান রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, নগরীর যানজটের প্রধান কারণ হচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ব্যক্তিগত গাড়ি। সরকার যানজট নিরসনে পরিকল্পিত নগরায়ণ ও ব্যক্তিগত গাড়ি অনুৎসাহিত না করে গরিবের বাহন বন্ধের মধ্য দিয়ে জনগণের আইওয়াশ করছে, যা সমস্যার সমাধান না করে আরও নতুন নতুন সমস্যার জন্ম দিয়ে চলেছে।
রিকশা, ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক চালক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১২ বছর ধরে আমরা বলে আসছি ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করেন। সব ধরনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে বলেছি। কারও পেটে লাথি মেরে কারও জীবিকা নষ্ট করে কোনো রিট হয় না। বর্তমানে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, এটা উসকানি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। আমাদের দাবি নীতিমালা বাস্তবায়ন অতিবিলম্বে। সুপ্রিম কোর্টের রায় আছে, মন্ত্রিপরিষদের রায় আছে, তাহলে এ বিষয়টি নিয়ে আজ কেন নৈরাজ্য সৃষ্টি হচ্ছে?
সার্বিক বিষয় নিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে বুয়েট দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বলেন, গত ১৫ বছর ব্যাটারিচালিত যান নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। সেজন্য রাজধানীতে এ অবৈধ রিকশা এত বেড়ে গেছে। তাই এর দায় শুধু যে চালকদের তা নয়। এর দায় সে সময়ের নীতিনির্ধারকদেরও আছে। তবে এখন রাতারাতি এটা বন্ধ করা ঠিক হবে না। কারণ এটার সঙ্গে এখন লাখ লাখ চালকের জীবন-জীবিকা জড়িত।
নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করে ব্যাটারিচালিত রিকশা সড়কে চলাচলের দাবি : সুপ্রিম কোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন ও নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করে সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করতে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে রিকশা, ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক চালক সংগ্রাম পরিষদ। একই সঙ্গে সাত দফা দাবি বাস্তবায়নসহ অতিবিলম্বে ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য নীতিমালা বাস্তবায়ন করার দাবি জানায় সংগঠনটি।
গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক সমাবেশে এসব দাবি জানায় সংগঠনটি।
সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি জালাল আহমেদ বলেন, সারা দেশে ৫০ লাখ মানুষ ইজিবাইক, রিকশাসহ ব্যাটারিচালিত যানবাহনে যুক্ত রয়েছেন। কিস্তি করে, জমি বন্ধক রেখে, পুলিশি নির্যাতন, অবৈধ চাঁদাবাজি মোকাবিলা করে ৫০ লাখ মানুষ বছরে দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার অবদান রাখছেন। তারা কোনো প্রণোদনা বা সরকারি সহায়তা ছাড়াই আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। এই ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ করা হলে অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে। তাই অতিদ্রুত সুপ্রিম কোর্টের আদেশ পুনর্বিবেচনা করে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের অনুমতি দিতে হবে।
রিকশা, ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক চালক সংগ্রাম পরিষদের সাতটি দাবি হলোÑ নীতিমালা অনুযায়ী ইজিবাইক, রিকশাসহ ব্যাটারিচালিত যানবাহনের নিবন্ধন, চালকদের লাইসেন্স ও রুট পারমিট দেওয়া। কারিগরি ত্রুটি সংশোধন করে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের আধুনিকায়ন করা। ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, রিকশাসহ নিহত-আহত সব শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বিদ্যুৎ চুরি ও অপচয় বন্ধ করতে ইলেকট্রিক বা ব্যাটারিচালিত যানবাহনের জন্য চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা। প্রতিটি সড়ক-মহাসড়কে ইজিবাইক, রিকশাসহ ব্যাটারিচালিত, স্বল্পগতির ও লোকাল যানবাহনের জন্য সার্ভিস রোড-বাই লেন নির্মাণ করে সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা নিরসন করা। ঢাকাসহ সারা দেশে ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইক জব্দ বন্ধ করা এবং জব্দ করা গাড়ি ও ব্যাটারি ফেরত দেওয়া। সব শ্রমিকের জন্য আর্মি রেটে রেশন ও বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।