দায় সবার নিতে চায় না কেউই

বনভোজনে যাওয়ার পথে বাসে বিদ্যুতায়িত হয়ে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর দায় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম খান। গতকাল শনিবার সকালের এই দুর্ঘটনায় চিকিৎসাধীন আহতদের দেখতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে তিনি এমন প্রশ্ন তোলেন। ভিসি রফিকুল ইসলাম এই দুর্ঘটনার জন্য সরাসরি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী না করলেও তিনি পিকনিকের আয়োজকদের পাশাপাশি বাস সরবরাহকারী বিআরটিসি এবং পল্লীবিদ্যুৎ কর্র্তৃপক্ষের দিকে আঙুল তুলেছেন। যদিও এই দুর্ঘটনার জন্য আইইউটি কর্র্তৃপক্ষ এবং শিক্ষার্থীরা বনভোজনের জন্য যে রিসোর্টে যাচ্ছিলেন তার মালিকপক্ষ দায় এড়াতে পারে না বলে মনে করেছেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবক এবং দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা।

আহতদের দেখতে গিয়ে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। রাস্তায় বের হলে যদি এ রকম হয়, তাহলে এ দায়িত্বটা কার আপনারাই ভালো বোঝেন। আমি আসলে কাউকে সরাসরি দায়ী করতে চাই না। ছাত্ররা বাইরে যাবে এটাই স্বাভাবিক, পিকনিকে যাবে তাও স্বাভাবিক। একটা ছেলে গাড়িতে বসে বা দাঁড়িয়ে থেকেও যদি তার জীবনের নিরাপত্তা না থাকে তাহলে কী করবে? এটা তো এমন দুর্ঘটনা না যে মুখোমুখি সংঘর্ষ কিংবা বাসটা উল্টে পড়ে গিয়েছে। সে গাড়িতেই আছে কিন্তু বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা গেছে। তাহলে বুঝতেই পারছেন দায়দায়িত্ব কার। আর যেন এভাবে প্রাণ না যায়, ভবিষ্যতে রাস্তাঘাট যেন ক্লিয়ার থাকে, বিদ্যুতের তার যেন যথেষ্ট উচ্চতায় থাকে এবং সেগুলো যেন লিকেজ না থাকে কর্র্তৃপক্ষকে নজর রাখতে হবে।’

সরু সড়কে দ্বিতল বাস চলার অনুমতি ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ভিসি বলেন, ‘যারা পিকনিকের আয়োজন করেছে, তারা কেন দ্বিতল বাস নিল এবং সে রাস্তায় তা চলাচলে অনুমতি ছিল কিনা তা আমার জানা নেই। এটা তো ভালো জানার কথা বিআরটিসির। কারণ, তারা বাস ভাড়া দেয়। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।’

এই দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুনকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নাফিসা আরেফীন। কমিটিতে পল্লীবিদ্যুৎ ও পুলিশের প্রতিনিধিও রয়েছেন। অন্যদিকে প্রো-ভিসি রাকিবুল ইসলামকে প্রধান করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক মো. মুহতাশিম মাশফি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরাই বনভোজনের আয়োজন করেছিলেন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মাশফি হায়দারের বাবা ময়মনসিংহ মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ শফিকুল হায়দার বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ আরেকটু সতর্ক হলে দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোনো আনন্দ ভ্রমণে যাওয়ার আগে কর্র্তৃপক্ষ যেন আগে থেকেই সম্ভাব্যতা যাচাই করে নেয়।’

একই ধরনের মন্তব্য করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই বিভাগের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক রমজান হোসেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক থেকে গ্রামীণ সরু সড়কে যেখানে মিনিবাস চলাই কঠিন সেখানে কী করে বিআরটিসির  দোতলা বাস প্রবেশ করানো হলো? পিকনিক স্পট বুকিং করার আগে আঞ্চলিক এক লেন সড়কে ডাবল ডেকার বাস প্রবেশ করবে কি না সেটা আগে থেকেই জানা দরকার ছিল। কিন্তু তারা (বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ) এসব বিষয় চিন্তাতেই আনেননি। রিসোর্ট কর্র্তৃপক্ষও বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষকে জানায়নি। এ ঘটনার দায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ ও রিসোর্ট কর্র্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না।’

প্রত্যক্ষদর্শী ও দুর্ঘটনাস্থলের পাশের উত্তর পেলাইদ গ্রামের বাসিন্দা জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বড় রাস্তা থেকে সংযোগ সড়ক দিয়ে বিআরটিসির দোতলা বাসগুলো আসতে থাকে। তবে রাস্তা বেশ সরু ছিল। এ রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বৈদ্যুতিক সংযোগ তারে উঁচু বাসের ওপরের অংশ লেগে যায়। আচমকা শব্দে অনেকেই হুড়োহুড়ি করে নেমে যায়। এমন সরু আর ছোট সড়কে দোতলা বাস নিয়ে আসাই একটা অবিবেচকের কাজ। এটার জন্য দায়িত্বশীলদের শাস্তি হওয়া দরকার। তাদের খামখেয়ালি আর দায়িত্বহীনতায় তিন শিক্ষার্থীর প্রাণ ঝরে গেল।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-২ এর  মাওনা জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘এ ঘটনায় পল্লী বিদ্যুতের কোনো গাফিলতি ছিল না। এ বিদ্যুতের লাইনটি প্রায় ২০ বছর আগে নির্মাণ করা। আগে এখানে মাটির সরু রাস্তা ছিল। সেখানে কয়েক স্তরে মাটি ফেলে উঁচু করা হয়েছে। তারপর এটি ইটের সলিং করে পাকা করা হয়েছে, রাস্তাটি প্রশস্ত কম। মাটি ফেলার পর রাস্তা উঁচু হওয়ায় বৈদ্যুতিক খুঁটির উচ্চতাও কমে গেছে। রাস্তাটি বিআরটিসির দোতলা বাস চলাচলের উপযোগী নয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের ভেবে দেখার উচিত ছিল। বিদ্যুতের লাইনের কোনো ত্রুটি ছিল না। বাসটি অন্য একটি বাহনকে সাইড দিতে গিয়ে বাম দিকে কাত হয়ে বিদ্যুৎ লাইনের সংস্পর্শে আসে।’

আর মাটির মায়া রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মাসুদ বলেন, ‘দুর্ঘটনার বিষয়ে রিসোর্টের কোনো গাফিলতি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকজন রিসোর্টে এসে সবকিছু দেখে গেছেন। আর তারা এখানে দোতলা বাস নিয়ে আসবেন এ কথা আমাদের জানা ছিল না। থাকলে নিষেধ করতাম।’

মাটির মায়া রিসোর্টের ব্যবসায়িক অংশীদার (কয়েকজন মালিকের একজন) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরও এই দুর্ঘটনায় তাদের কোনো দায় নেই বলে দাবি করেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের রিসোর্টে যারা বেড়াতে আসেন, তারা আসার আগেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিস্তারিত জেনে নেন। আমাদের অফিসে যোগাযোগ করার পর আমরা তাদের (দর্শনার্থীদের দায়িত্বশীল কেউ) বলে রাখি তারা যেন আসার জন্য ছোট বাস ব্যবহার করেন। গ্রামের সরু সড়কের বিষয়টি তাদের অবহিত করা হয়ে থাকে। সবার ব্যাপারে একই নিয়ম প্রযোজ্য থাকে। নিজ নিজ দায়িত্বে আমাদের এখানে আসেন পিকনিকের লোকজন।’

তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসবে মনে করেন তদন্ত কমিটির প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি রাকিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এটা একটি দুর্ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ আমাকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিতে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের ডিনদেরও রাখা হয়েছে। কারও কোনো অবহেলা ছিল কি না তা তদন্তে বের হয়ে আসবে।’