মানহীন মানবাধিকার

আধুনিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠার শর্তগুলোর মধ্যে ‘মানবাধিকার’ একটি। যে রাষ্ট্রে মানবাধিকার নেই, সে রাষ্ট্রকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখা হয়। বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার রক্ষায় মানবাধিকার কমিশন জরুরি কিছু কাজ করে। চরিত্রগতভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের মূলনীতি হচ্ছে, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা এবং ক্ষমতাহীনকে সুরক্ষা দেওয়া। ফলত, মানবাধিকার কমিশন জনতার পক্ষ হয়ে রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। কিন্তু, স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় হয় উল্টো। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো মানবাধিকার কমিশনকেও সরকার করায়ত্ত, দলীয়করণ করে। যে কারণে জনতার পক্ষে ও মানবাধিকরার নিশ্চিত করার মতো কার্যকরী শক্তি কমিশনের থাকে না। নির্বাচন কমিশন আওয়ামী সরকারের শাসনামলে প্রায় অকার্যকর একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। নিয়োগ থেকে শুরু করে, এই প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণ ও কর্মপন্থা সবকিছুই সরকারের ইশারাতে হতো। ফলে বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার কমিশন পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনসের (জিএএনএইচআরআই)’ তালিকায় বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ‘বি’ স্ট্যাটাসধারী।

আওয়ামী আমলে মানবাধিকার কমিশন ছিল, দলীয়করণের আধার। আওয়ামী লীগ তাদের মতো করে নিয়োগ দিয়েছে চেয়ারম্যান ও সদস্য। পাঁচজনের মধ্যে চারজনই ছিলেন সরকারের সাবেক আমলা। আওয়ামী লীগ সরকারের কর্র্তৃত্ববাদী মনোভাব, আইনের দুর্বলতা ও আমলানির্ভরতা কমিশনকে দিনে দিনে দুর্বল করে তুলেছে। আইন অনুযায়ী, তিন বছর পরপর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, সার্বক্ষণিক সদস্য ও সদস্য নিযুক্ত করে সরকার। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন এ সংস্থার সব সাচিবিক দায়িত্ব পালন করে মন্ত্রণালয়। ৪৬ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার প্রতিকার নিয়ে কাজ করেন তারা। ২০০৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ২০০৯ সালের জুলাইতে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯’ করে। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন কমিশনের নিজস্ব ভবন নেই, কর্মীদের সরকারিভাবে বেতন থাকলেও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই। আবাসন কিংবা যাতায়াত সুবিধাও নেই। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পেলেও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সুপারিশ ছাড়া আইনিব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা নেই। নেই দক্ষ আইনজীবী প্যানেল, কমিশনের নেই নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতা। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কমিশনের জরুরি কাজে যাতায়াতের জন্য আছে একটিমাত্র পুরনো মাইক্রোবাস। গত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে এমন নানা সমস্যা নিয়েই চলেছে কমিশন। এসব সমস্যা সমাধানে আন্তরিক ছিল না তখনকার সরকার। 

এই কমিশনকে নিজেদের বলয়ে আটকে রেখেছিল। এমনকি বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনায় যখনই জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আন্তর্জাতিক মহল সোচ্চার হতো, ব্যাখ্যা চাইত তখন আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কমিশনকে এক ধরনের অলিখিত নির্দেশনা দেওয়া হতো। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক ছিল যে, গত বছরের নভেম্বরে জাতিসংঘের ‘ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর)’ বা মানবাধিকারের সর্বজনীন পর্যায়ক্রমিক সম্মেলনে কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিনকে ছাড়াই (যিনি আওয়ামী সরকারের পতনের পর পদত্যাগ করেছেন) বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। তখন মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশ ও আন্তর্জাতিক মহলে চাপে ছিল আওয়ামী লীগ সরকার। বিব্রতকর পরিস্থিতির আশঙ্কায় কমিশনের প্রতিনিধি না পাঠিয়ে তৎকালীন আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে দল পাঠানো হয় বলে গুঞ্জন রয়েছে।

এসব ঘটনা থেকেই পরিষ্কার যে, মানবাধিকার কমিশনকে প্রায় গলা টিপে রাখা হয়েছিল। এর সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো চেষ্টা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন কেবল সরকারকে দায় দিলেই হবে না। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও মানবাধিকার কমিশন নিয়ে উচ্চবাচ্য করেনি। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করা জরুরি। আইনের সংশোধনসহ প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকার নিয়ে যারা ধারণা রাখেন, কাজ করেন তাদের দিয়ে এই কমিশন গঠন করে একে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সরকারের আজ্ঞাবহ নয়, বরং জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে সরকারকে যাতে জবাবদিহি করতে পারে, সে লক্ষ্যে এই কমিশন গড়ে তুলতে হবে।