আন্দোলনের অ্যাপ চাই

সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক, আখতার ভাইয়ের মতো স্মার্ট লোক খুব কম দেখেছি। একটু ভুল বললাম, আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে কম দেখি। রাস্তাতেই যাদের চলাচল করতে হয়, ইংরেজি পরিভাষায়, তাদের ‘স্ট্রিট স্মার্ট’ না হয়ে উপায় থাকে না। তাদের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তত্ত্বচিন্তা, মুখস্থ সমস্যা এগুলো বাদ।  এইসব ‘স্ট্রিট স্মার্ট’ লোকদের ‘ভদ্দরনোক’-এর মতো তত্ত্বজ্ঞান নিয়ে ভাবার উপায় নেই। উনাদের দৈনন্দিন জীবনের ছেদো ব্যাপারগুলো নিয়েই মেতে থাকতে হয়। জনপ্রিয় মিম টেমপ্লেটের ভাষায়, পেটের চিন্তায় কূল পাই না, তত্ত্ব নিয়ে ভাবব কখন?

আখতার ভাইয়ের কথায় ফিরে আসি। স্বল্পশিক্ষিত আখতার ভাইয়ের সিএনজিতে যাত্রী হওয়ার সুবাদে উনার ‘ডায়েরি’ দেখার সৌভাগ্য হইসিলো। ডায়েরি বলতে একটা কাগজ, যেইখানে উনি ঢাকা শহরের ‘আন্দোলনের শিডিউল’ লিখে রাখসেন। ব্যাপারটাও হইসিলো খুব নাটকীয় কায়দায়। উনার গাড়িতে উঠে হালকা চালে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, যাবেন কোনদিক দিয়ে? প্রেস ক্লাব হয়ে? আরে নাহ্, ঐদিকে আজ রিকশাচালকরা প্রতিবাদ সমাবেশ করবে। তাহলে কি পল্টন হয়ে যাবেন? এই প্রশ্ন করাতেও নেতিবাচক উত্তর দিয়ে তিনি জানালেন সেখানে একটি বড় রাজনৈতিক দলের সভা। বায়তুল মোকাররমের আশপাশেও নাকি কাদের সমাবেশ আছে। এইসব রাস্তা বাদ দিয়ে তিনি কালভার্ট রোডের সরু রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে শিল্পকলার পাশ দিয়ে যাওয়ার উদ্যাগ নিলেন। কিছুটা অবিশ্বাসের সঙ্গে বললাম, গুগল ম্যাপে তো এইসব রাস্তা মোটামুটি পরিষ্কার দেখাচ্ছে! তিনি হেসে বিখ্যাত কাগজটা বের করে বললেন, আরে ভাই! আপনাগো ঐসব অ্যাপ ভুয়া। এই দেখেন, সকালে উইঠা পেপার ঘাঁইটা আমি এই লিস্টি বানাই। উনার পেশাদারিত্ব দেখে মুগ্ধ হইলাম। মনে হচ্ছিলো, আমার গুগুলে কাজ করা বন্ধুকে ফোন দিয়ে বলি, তোদের বিলিয়ন ডলারের অ্যাপ ফেইল। কিন্তু এরমধ্যেই বেচারা আখতার ভাইয়ের ‘মেটিকুলাস প্ল্যান’ ফেইল করল। কালভার্ট রোড দিয়েই গাড়ি সব ঢুকতেসে। শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা দিশেহারা। বেচারা আখতার সাহেব ততক্ষণে খিস্তিখেউড় শুরু করে দিয়েছেন। অবধারিতভাবে দ্রব্যমূল্যর ঊর্ধ্বগতির ব্যাপারটা চলে এলো। এত আন্দোলন কইরা কী লাভ হইল, যদি জিনিসপত্রের দামই না কমে! এই ধরনের আফসোস করা শুরু করলেন। বেচারার ঐরকম অবস্থায় বলতে পারলাম না যে, প্রতি শুক্র শনিবার ঢাকা জুড়ে গত তিন মাসে কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই, কেমন রাজনৈতিক দল চাই, রুহানিয়াত কীভাবে কায়েম হবে, চেতনা কীভাবে সুরক্ষিত হবে, এইসব ভারী ভারী আলাপে অনুষ্ঠানের শেষ নেই। এইসব উচ্চ দর্শনের আলাপে আখতাররা থাকেন না, তাদের মতামতের তোয়াক্কাও করা হয় না। এসব ভাবতে ভাবতেই আখতার ভাই বলতেসিলেন, খালি দাবি আর দাবি। আর ইদানীং শুরু হইসে মাইরপিট। কখন কোন দিক দিয়ে হুট করে মারামারি লাগে। এত পরিকল্পনা করেও লাভ হয় না। আচ্ছা, সরকার কি এদের জন্য নির্দিষ্ট একটা জায়গা রাখতে পারে না? নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দাবি জানাইল, সময় বেঁধে দিল।

খুবই সরল প্রশ্ন, কিন্তু উত্তরটা কঠিন। রাজনীতি আর দাবি-দাওয়া যদি জনগণের জন্যই হয় তাহলে জনগণকেই ভোগান্তি দেওয়া কেন? নাকি জনগণকে জিম্মি করাটাই দাবি আদায়ের সবচেয়ে সহজ উপায় বলে এইভাবেই চলবে? তবে, এইসব বললে নিশ্চিতভাবেই সভা-সেমিনার করা আর দেশে, বিদেশে, ঢাকায়, দিল্লিতে, প্যারিসে থাকা বন্ধুরা খেপে যাবেন। ফলে ঐ আলোচনার দিকে যাওয়াই যাবে না। আরেকটা মিমের ভাষায়, ঐখানে যাওয়া ঠিক হবে না মারধর করতে পারে। ফলে, ব্যাপারটা পুঁজিবাদী কায়দায় সমাধানের চিন্তা মাথায় এলো। যুক্তরাষ্ট্রে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্কেটবল, ফুটবল খুব জনপ্রিয়। টিভি স্পন্সরশিপ ও বিজ্ঞাপনের সুবাদে বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি। আমার যেসব বন্ধু ‘পশ্চিমা বিরোধী’ তাদের চিন্তায় সায় দিয়েই মনে হইল ওদের ঐতিহ্য আমরা কেন নিব? আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে তুলে ধরব। কলেজে কলেজে মারামারি হইল আমাদের ঐতিহ্য।

একসময় ঢাকা আর সিটি কলেজে মারামারি হইলে দেখতাম, তারা ধানম-ির চিপা গলিতে চলে যাইতেন কিংবা লেকের পাড়ে গিয়ে দেশীয় স্টাইলে রেসলিং করতেন। আফসোস, মার্কিনিরা এই রেসলিংকেও বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি বানিয়ে ফেলেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভিন্স ম্যাকমোহনের ওপর সম্প্রতি নেটফ্লিক্স দারুণ একটা সিরিজ নির্মাণ করেছে। আমরাও কলেজে কলেজে মারামারি লাইভ দেখায়ে ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়া করাইতে পারি। ঢাকা বনাম সিটির ক্লাসিক ডার্বির বাইরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বনাম সাত কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজ বনাম নজরুল কলেজ, ইডেন বনাম গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ ইত্যাদি। টিভিতে লাইভ দেখায়ে বিপুল উপার্জন হবে, আইপিএলের মতো নিলাম হবে কলেজে কলেজে। কলেজে কলেজে হকিস্টিক এক্সপার্ট, চাপাতি বিশেষজ্ঞ, হাতুড়ি চালনায় অভিজ্ঞদের নেওয়ার হিড়িক পড়বে। প্রতিযোগী কলেজগুলো যে টাকা-পয়সা পাবে তা কলেজগুলার উন্নয়নের কাজে লাগানো যাবে। একদিকে গবেষণার উন্নয়নে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়ন হবে আবার মারামারি এক্সপার্টদের ফুটবলারদের মতো বিশেষ মৌসুমে রপ্তানি করা যাবে। দুনিয়া জুড়ে যে লোকরঞ্জনবাদের উত্থান, নির্বাচনগুলোর আগে অস্থিরতা, বছর জুড়ে যুদ্ধ, তাতে এইসব এক্সপার্টদের পাঠিয়ে দেশের রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাবে। এমনকি, প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা গবেষক আর উদ্যোক্তারাও একটা নিখুঁত অ্যাপ তৈরি করে ফেলতে পারেন মানুষের জন্য। উনাদের দক্ষতা তো বটেই দেশের প্রকৌশলীরা যে বুঝদার মানুষ এইটাও কিন্তু সম্প্রতি বুটেক্স আর পলিটেকনিক কলেজের মারামারিতেও বোঝা গেছে। উনারা অন্যদের মতো দিনেদুপুরে মারামারি করে জনদুর্ভোগ না বাড়িয়ে রাতে মারামারি করেছেন। এই কারণে আমরা উনাদের কাছে কৃতজ্ঞ।

অ্যাপের কথায় ফিরে আসি। আমাদের দুর্ভাগা জনতার জন্য, একটা ‘আন্দোলন অ্যাপ’ করা খুব জরুরি। এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও বিশাল। এই অ্যাপ সবাই ব্যবহার করবে। আখতার সাহেবরা করবেন জীবিকা নিশ্চিত করতে আর নিরাপদ থাকতে, আর কেউ কেউ করবেন আমোদ পেতে। মাঝে মাঝে মনে হয়, অ্যাপ না থাকলেও এই যে মারামারি, এই যে অস্থিরতা, এর একটা ডিজাইন আছে। আখতারদের জীবন দুর্বিষহ করে তুললেও, ছাত্রদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেললে হয়তো কারও কারও ফায়দা হয়। তারাই এই ডিজাইন বজায় রাখেন।

মাত্র তিন মাস আগে বিপুল প্রাণহানির বিনিময়ে স্বৈরশাসক পতনের পর এই জাতি আশা করেছিল এই চরম মূল্য চুকিয়ে অন্তত কিছুটা দিন তারা শান্তি পাবে। অধিকার পাবে। খেয়েপরে বাঁচতে পারবে। দেশে আইনশৃঙ্খলা ঠিক হবে। কিন্তু, অশান্তি থামে নাই। মৃত্যু থামে নাই। মারামারির আগাম খবর জেনেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মৃত্যু ঠেকাতে পারে নাই। সরকার জনতাকে সুরক্ষা দিতে পারে নাই। জনগণকে, রাষ্ট্রকে সুরক্ষার জন্য আমাদের টিকে থাকার জন্য, কার্যকর একটা অ্যাপ নির্মাণ করা হয় নাই।

লেখক : সাংবাদিক

faiz@dhaka.net