ন্যূনতম আয়ের প্রাথমিক লক্ষ্য ‘দারিদ্র্য হ্রাস’। পারস্য সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেটের সরকার ‘নিয়ন্ত্রিত ন্যূনতম মজুরি’ পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। তখন একজন শিশু জন্মের সময় পরিবারকে বিশেষ রেশন প্রদান করা হতো। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, ‘‘মানুষ তার জন্মগত অধিকার দ্বারা ‘অস্তিত্বের চাহিদা’ পূরণের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে পৃথিবীর উৎপাদিত অংশের অধিকারী।” এভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অসংখ্য ব্যক্তিত্ব ন্যূনতম আয়ের একটি স্কেল নির্ধারণ করে দেন যা এখনো চলছে।
আসলে ন্যূনতম গ্যারান্টিযুক্ত আয় হলো, একটি আর্থিক সুবিধা যাতে সমস্ত নাগরিকের জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান উপভোগ করা যায় এবং তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হয়। এরইমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশে এটি প্রয়োগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে সোমবার ‘ন্যূনতম আয় বাস্তবায়ন হলে দারিদ্র্য কমবে ৬.১৩ শতাংশ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বলা হয়েছে দেশে সামাজিক নিরাপত্তার জন্য যেসব কর্মসূচি রয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত উপকারভোগী এসব সহায়তা পান না। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় বাজেট ও অর্থ বিতরণ নিয়েও রয়েছে জটিলতা। এমন বাস্তবতায় ইউনিভার্সেল বেসিক ইনকাম (ইউবিআই) বা ‘সর্বজনীন ন্যূনতম আয়’ নামে একটি সমন্বিত সুরক্ষা কর্মসূচির প্রস্তাব করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। আগামী বাজেট থেকেই স্বল্প বা বিস্তৃত পরিসরে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক সেমিনারে সিপিডির পক্ষ থেকে এমন প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। সেমিনারে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাস্তবসম্মত একটি কথা বলেছেন। জানিয়েছেন ‘নাগরিক হিসেবে আমাদের ন্যূনতম আয় পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এ অধিকার দিতে হবে। কীভাবে সেটি নিশ্চিত হবে, তা নীতিনির্ধারকরা ঠিক করবেন। সারা দেশে একবারে না করা গেলেও ধাপে ধাপে এটি করা সম্ভব। এটা করতে গিয়ে শুধু সুরক্ষা নয়, আগামী দিনে কার্যকরভাবে যাতে উপকারভোগীরা স্বাবলম্বী হতে পারেন, সে জায়গাও তৈরি করতে হবে।’
জানা যাচ্ছে, জাতীয়ভাবে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে ১ বছরে সরকারের ৭৫ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা লাগবে। আর অতিদারিদ্র্যপ্রবণ ১১ জেলায় এটি বাস্তবায়ন করলে ১৪ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে, যা দেশের মোট বাজেটের ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। তিনি মনে করেন, আগামী বাজেটেই এ কর্মসূচি হাতে নেওয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশ সরকারের রয়েছে।
আসলে সর্বজনীন ন্যূনতম আয় প্রকল্পই হোক বা অন্য কোনো উন্নয়ন কর্মসূচি, তা নিয়ে আলোচনা করার সময় কতকগুলো কথা মাথায় রাখা প্রয়োজন। এক. প্রত্যেকটি নীতি, কর্মসূচির কিছু ভালো-মন্দ দিক আছে। কোন প্রকল্প কতটা ভালো আর কতটা মন্দ, তার তুল্যমূল্য বিচার করতে হবে। দুই. কোনো প্রকল্পই সবার জন্য সেরা নয়। পরিস্থিতি বিবেচনায়, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য যে আলাদা আলাদা প্রকল্প কার্যকর হতে পারে, সেটা মাথায় রাখতে হবে। প্রকল্প চালানো, নজরদারির জন্য যত লোকবল প্রয়োজন, যত টাকা প্রয়োজন, তার সংস্থান করা কি কোনো বাধা? সর্বজনীন ন্যূনতম আয়ের মতো প্রকল্পকে যদি বাজেট ঘাটতির পরিমাণ অথবা মূল্যস্ফীতির হার না বাড়িয়ে চালু করতে হয়, তবে এই প্রকল্পের টাকার সংস্থান করতে হবে করের পরিমাণ বাড়িয়ে। অথবা অন্য খাতে খরচ কমিয়ে।
দেশের দরিদ্র শ্রেণির মানুষ যাতে উন্নয়নের সোপান বেয়ে ওঠার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেন তার জন্য প্রয়োজন কর্মসংস্থান, যা সেই সোপান সৃষ্টি করবে। এর জন্য চাই বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর অনুকূল পরিবেশ, যার মধ্যে পরিকাঠামো ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার উন্নতি জরুরি বিষয়। মনে রাখতে হবে টনিক খেলে হয়তো কিছুটা বাড়তি শক্তি পাওয়া যায়, যার মূল্য আছে। কিন্তু তাতে রোগ সারে না, তার জন্য চিকিৎসা চাই। আর এ ক্ষেত্রে দরকার সামাজিক চিকিৎসা।