গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য বিশ্ব উন্মুখ হয়ে থাকলেও কিছু দেশে এখনো তা ব্যাহত হচ্ছে। এর কারণ অনুসন্ধান করেছে কয়েকটি সংস্থা। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
বিশ্বব্যবস্থা গণতন্ত্রমুখী। তবে কিছু দেশ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় পিছিয়ে আছে। এর কারণ অনুসন্ধান করেছে বেশ কয়েকটি সংস্থা। যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেদন তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ডয়চে ভেলে। তারা জানিয়েছে, গণতান্ত্রিক শাসননির্ভর না হওয়ার কিছু অন্তর্গত কারণ রয়েছে সেসব দেশে। একটা সময়ে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো ছিল অগণতান্ত্রিক শাসননির্ভর। এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ ধরনের শাসন চোখে পড়ে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, কমিউনিস্ট শাসিত ভিয়েতনাম গত মাসে সামরিক জেনারেল এবং পিপলস আর্মির রাজনৈতিক বিভাগের প্রাক্তন পরিচালক লুং কুওংকে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এর কিছুক্ষণ পর প্রাক্তন বিশেষ বাহিনীর কমান্ডার যিনি অপব্যবহারের অভিযোগে সামরিক বাহিনী থেকে বরখাস্ত হয়েছিলেন, সেই প্রাবোও সুবিয়ান্টো, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (এএনইউ) উদ্যোগে তৈরি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক ওয়েবসাইট নিউ মান্ডালার এক প্রতিবেদন অনুসারে, ১৯৯৮ সালে সুহার্তোর একনায়কত্বের পতনের পর প্রবোও’র সরকারকে ইন্দোনেশিয়ার ‘সবচেয়ে সামরিকায়িত মন্ত্রিসভা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের বেশিরভাগ অংশ সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কম্বোডিয়ার দীর্ঘদিনের নেতা হুন সেন গত বছর তার বড় ছেলে হুন মানেটের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২০১৪ থেকে থাইল্যান্ডের সামরিক বাহিনী রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশে অলিগার্করা জনগণের ক্ষমতাকে খর্ব করছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের পতন
ডয়চে ভেলে জানাচ্ছে, বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ হলো শুধু ব্রুনাই, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। ব্রুনাই একটি নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের দেশ। যেখানে মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলো ঐতিহাসিকভাবে সামরিক হস্তক্ষেপকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। ফিলিপাইন ১৯৮৬ সালে রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ দেখেছিল। ওই সময়ে সশস্ত্র বাহিনী স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোসকে উৎখাত করতে সাহায্য করেছিল। যদিও তারপর থেকে ফিলিপাইনের সশস্ত্র বাহিনী বেসামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, দেশটির রাষ্ট্রপতি সামরিক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফের দায়িত্বে আছেন। তবে ডয়চে ভেলেকে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সিনিয়র ফেলো জোশুয়া কুরলান্টজিক জানাচ্ছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক নেতৃত্বের উত্থান বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রবণতাকে প্রতিফলিত করে। কুরলান্টজিক বলেন, একসময় থাইল্যান্ডের মতো কিছু ছোটখাটো ব্যতিক্রম ছাড়া শাসক হিসেবে সামরিক শক্তির বেশিরভাগই বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে মনে করা হতো, তবে তারা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে এবং বিভিন্ন জায়গায়, এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাইরেও শাসনভার গ্রহণ করেছে। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল জুড়ে সাম্প্রতিক সামরিক অভ্যুত্থান এবং পাকিস্তান ও মিসরে নতুন করে সামরিক প্রভাব এ বৈশ্বিক পরিবর্তনের অংশ।
বাইরের প্রভাব
থাইল্যান্ডের নরেসুয়ান ইউনিভার্সিটির প্রভাষক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা পল চেম্বার্স যুক্তি দেন যে, এই অঞ্চলের কর্র্তৃত্ববাদের দিকে পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামরিকীকরণ ২০১৪ সাল থেকে ত্বরান্বিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালে হঠাৎ সামরিকীকরণের উপস্থিতি একটি প্রতারণা কারণ রাজনীতিতে সামরিক শক্তি সর্বদা বিদ্যমান, হয়তো কখনো কখনো তারা ছায়ার মধ্যে রয়েছে। ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগ, বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক বাহিনীর প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান দৃঢ়তা উত্তেজনা বাড়িয়েছে, ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে নীতিনির্ধারণে সামরিক বাহিনী আরও বেশি প্রভাব ফেলেছে। তবে ফিলিপাইন বেইজিংয়ের রাজনীতি প্রশ্নে সামরিকীকরণকে প্রতিহত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দুই গবেষক জনাথান পাওয়েল এবং ক্লেটন থাইন জানিয়েছেন, ১৯৫০-এর পর থেকে আফ্রিকার দেশগুলোতে ২০০ বারেরও বেশি ক্যুর প্রচেষ্টা ঘটেছে। এদের মধ্যে অর্ধেক সফল হয়েছে, অর্থাৎ এসব প্রচেষ্টা অন্তত সাতদিন স্থায়ী ছিল। এর মধ্যে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বারকিনা ফাসোতে সবচেয়ে বেশি সফল অভ্যুত্থান ঘটেছে। সে দেশে সাতটি ক্যুর মধ্যে মাত্র একটি ব্যর্থ হয়েছে। জিম্বাবুয়েতে ২০১৭ সালে যে সেনা অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তার মাধ্যমে রবার্ট মুগাবের ৩৭ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। নেসরিন মাল্লিক জানাচ্ছেন, ২০২০ সাল থেকে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে একের পর এক অভ্যুত্থানের কারণ ভাগনার গ্রুপ ও রাশিয়ার প্রভাব। রাশিয়া ও ভাগনার গ্রুপের উপস্থিতির কারণে ওই অঞ্চলে বরং যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে একটা ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যে, বিদেশি শক্তিগুলোর মধ্যকার প্রক্সি সংঘাতের ফল হচ্ছে আফ্রিকার অভ্যুত্থান। আবার সাহেল অঞ্চলের জিহাদি গোষ্ঠীর উত্থানকে পশ্চিমা শক্তি তাদের চিরাচরিত সংকীর্ণ সামরিক পন্থায় সমাধানের চেষ্টা করেছে। এর অংশ হিসেবে পশ্চিমারা নাইজার ও বৃহত্তর পশ্চিম আফ্রিকায় সেনা মোতায়েন করে। কিন্তু এটি কোনো সমাধান আনেনি। বাস্তবতা হলো, ওই অঞ্চলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড উল্টো বেড়েছে।
বাজেট
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মিলিটারি এক্সপেন্ডিচার ডাটাবেজ অনুসারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক ব্যয় ২০০০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। যা ১৯ দশমিক দুই বিলিয়ন পাউন্ড থেকে ৪২ বিলিয়ন পাউন্ড হয়েছে। যাই হোক, জিডিপির শতাংশ হিসেবে এ অঞ্চলে প্রতিরক্ষায় সর্বোচ্চ ব্যয় করে সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই এবং মালয়েশিয়াসহ সেসব দেশ যেখানে সামরিক বাহিনী রাজনীতিবিদদের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করেনি। প-িতরা কারণ হিসেবে ঘরোয়া রাজনীতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তারা বলছেন, কোনো দেশকে সামরিকীকরণের বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে। কখনো কখনো সক্রিয় বা অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলদের নেতৃত্বে এমনটা ঘটে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ১৯৬২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে শাসন করেছে এবং ২০২১ সালে আবার ক্ষমতা দখল করে। আবার কম্বোডিয়ায় ক্ষমতাসীন পিপলস পার্টি (সিপিপি) সেনাবাহিনীর ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। যা প্রভাবশালী হুন পরিবারের জন্য হিংসাত্মক শক্তির হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি ক্রমবর্ধমানভাবে বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে। যে দলের সবচেয়ে শক্তিশালী সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা ১৮ সদস্যের পলিটব্যুরোর দুই-তৃতীয়াংশ পুলিশ বা সামরিক পটভূমি থেকে এসেছে।
টাকার রাজনীতি
সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস-ইউসুফ ইশাক ইনস্টিটিউটের ভিয়েতনাম স্টাডিজ প্রোগ্রামের একজন সিনিয়র ফেলো লে হং হিপ যুক্তি দেন যে, সামরিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকে ব্যবসা। ভিয়েতনামের পিপলস আর্মি দেশের বৃহত্তম টেলিকম কোম্পানি ভিয়েটেল এবং বৃহত্তম কন্টেইনার টার্মিনাল অপারেটর সাই গন নিউ পোর্টসহ দেশের কিছু বড় কোম্পানি পরিচালনা করে। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস অগাস্টের এক প্রতিবেদনে, সশস্ত্র বাহিনী, রাষ্ট্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং ব্যক্তিগত খাতের মধ্যে ক্ষমতার গতিশীলতার দ্বারা চালিত সামরিক প্রভাবের একটি বৈশ্বিক প্রবণতা তুলে ধরে। যাই হোক, প্রতিবেদনে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে সামরিক-ব্যবসায়িক সম্পর্ক প্রায়শই গণতন্ত্রীকরণকে স্তব্ধ করে দেয় এবং কখনো কখনো বেসরকারি খাতের স্বার্থরক্ষার জন্য রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের কারণ হয়, বিশেষ করে যখন এটি শক্তিশালী অলিগার্কদের দ্বারা প্রভাবিত হয়, যেমনটি কয়েকটি দেশে হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও দেশটির সবচেয়ে ধনী উদ্যোক্তা হাশিম জোজো হাদিকুসুমোর ভাই। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতে আধিপত্য বিস্তার করে। কুরলান্টজিক বলেন, সত্য এই যে সামরিক বাহিনী ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা চালাচ্ছে, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই, গণতন্ত্র এবং অধিকারের জন্য এটি নেতিবাচক। এটি প্রায়শই এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে সামরিক বাহিনী অলিগার্ক এবং ইচ্ছুক রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনকে ক্ষুন্ন করে। একটি ব্যতিক্রম হলো তিমুর-লেস্তে, এ অঞ্চলের সবচেয়ে ছোট এবং কনিষ্ঠ দেশ। যেটি ২০০২ সালে স্বাধীনতার পর থেকে প্রাক্তন গেরিলা এবং সামরিক নেতাদের নেতৃত্বে রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রধানমন্ত্রী জানানা গুসমাও দেশটির উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা বিদ্রোহী সামরিক ফালিনটিলের প্রধান ছিলেন। তিমুর-লেস্তে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একমাত্র দেশ যা ফ্রিডম হাউজের মতো অলাভজনক গোষ্ঠী দ্বারা নিয়মিতভাবে মুক্ত হিসেবে স্থান পেয়েছে।
তবে বিশ্বব্যবস্থা এখন অনেকটাই অলিগার্ক আর রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে। তাদের মধ্যকার ব্যবসায়িক লেনদেন এবং বুঝাপড়ার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ পরিচালিত হচ্ছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ইলন মাস্কের ভূমিকা নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যবসায়িক গ্রুপের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা চলছে। অলিগার্কদের আদিনিবাস রাশিয়াতেও একই অবস্থা। চীন একদলীয় শাসনের অধীনে থাকলেও, তাদের বিজনেস টাইকুনরা রাষ্ট্রীয় সুবিধা যে পেয়ে আসছেন, তা নিয়ে আলাপ চলছে। নিরঙ্কুশ গণতন্ত্র কোথায় আছে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইউরোপের অনেক দেশ জনস্বার্থ রক্ষা করে আসছে। তাদের জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র বলা হয়। তবে যত দিন যাচ্ছে সেসব দেশে রাজনৈতিক বিভেদ বাড়ছে। গণতন্ত্র দুর্বল হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন তারা। ইউরোপে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবও একটি চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা, গাজায় ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞের ভেতর ইউরোপ তার গণতান্ত্রিকব্যবস্থা আগের মতো কতটা টিকিয়ে রাখতে পারবে তা নিশ্চিত না। যুক্তরাষ্ট্রে যদিও এখনো ট্রাম্প তার ক্ষমতা বুঝে নেননি। তিনি কী ভূমিকা পালন করেন, সেটিও দেখার বিষয়। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব গণতন্ত্র কোনদিকে যাবে তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। এ সংশয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব কেবল গণতান্ত্রিক মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে।