রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রায় প্রতিদিনই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা ইস্যুতে রাজপথে আন্দোলন হচ্ছে। দাবি আদায়ের এসব আন্দোলন কোথাও কোথাও সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। কিন্তু এসব সংঘাতময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যতটা সক্রিয় থাকার কথা, তেমনটা লক্ষ করা যায়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। এর কারণ হিসেবে কেউ কেউ বলছে, বিগত সরকার পুলিশ প্রশাসনকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশের ভূমিকার কারণে বর্তমানে অনেকটা ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে পুলিশের কার্যক্রম। আর এ সুযোগে সংঘাত-সহিংসতার মাত্রা বাড়ছে। তবে পুলিশের মনোবল ফেরাতে বাহিনীর ঊর্ধ্বতনরা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। নতুন নতুন দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর কোনো সুফল এখনো মেলেনি।
ডেঙ্গুজ¦রে আক্রান্ত হয়ে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে দুদিন ধরে রণক্ষেত্র হয়ে আছে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের আশপাশের এলাকা। ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে গত রবিবার মাহবুব কলেজের শিক্ষার্থীরা ন্যাশনাল মেডিকেলে হামলা করলে বাধা দেন কবি নজরুল কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। পরে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীরা সোহরাওয়ার্দী কলেজে ব্যাপক ভাঙচুর করেন। পরে কলেজ কর্তৃপক্ষ বুঝিয়ে শিক্ষার্থীদের নিবৃত্ত করতে সক্ষম হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে এলেও সংঘর্ষ ও ভাঙচুরে জড়িতদের নিবৃত্ত করতে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। ফলে গতকাল সোমবার সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীরা ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে হামলা চালান এবং ভাঙচুর করেন। গতকালের সংঘাতটি অবধারিত হলেও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে সংঘাত-রক্তক্ষরণ হয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি আরও বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যেমন তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ, রবিবার রাতে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) ও ঢাকা পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় কোনোটিতেই পুলিশকে ততটা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ দেখা যায়নি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশে উদ্যম ফেরাতে আইজি, ডিএমপি কমিশনার, র্যাব মহাপরিচালকসহ পুলিশের সবকটি ইউনিটিতে ব্যাপক রদবদল হয়েছে। গতকালও পুলিশ সদর দপ্তরে ঊর্ধ্বতনদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক করেছেন আইজিপি। ওই বৈঠকে বলা হয়েছে, কিশোর গ্যাং আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ছাত্রদের ব্যানারে থেকে কিশোর গ্যাংরা নানা অপকর্ম করছে। রবি ও সোমবার ঢাকায় ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও সংঘাত হওয়ায় আগাম ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি ক্ষোভও জানিয়েছেন। সামনের দিনগুলোয় যাতে আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেদিকে বিশেষ নজরদারি করতে বলেছেন।
অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের কিছু কর্মকর্তা এখনো পদোন্নতি ও ভালো স্থানে পোস্টিং পেতে নানা মহলে তদবির করছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি করার দিকে মনোযোগ নেই। ১৫ বছর ধরে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ভালো অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন, এখন তাদের অবস্থা ভালো নেই। তাদের মধ্যে কেউ বাধ্যতামূলক অবসরে, কেউ ওএসডি, কেউ আছেন বদলি আতঙ্কে। আবার কারও নামে হয়েছে হত্যাসহ একাধিক মামলা। এরই মধ্যে পুলিশে যেসব কর্মকর্তা পদোন্নতিবঞ্চিত ছিলেন, তারা সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। পদোন্নতির পাশাপাশি পোস্টিং দেওয়া হচ্ছে তাদের। তারপরও নিয়ন্ত্রণে আসছে না দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। আসেনি পুলিশের মধ্যে কাজের অগ্রগতি। থানাসহ পুলিশের সবকটি ইউনিটে পুরোদমে কাজকর্ম শুরু হলেও উৎসাহ আসছে না। এ নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতনরাও আছেন অনেকটা বিব্রত অবস্থার মধ্যে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি করতে নানা পদক্ষেপ নেয় কর্তৃপক্ষ। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লাইসেন্স পাওয়া সব ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র বাতিল করা হয়। ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার, সবকটি মহানগরে পুলিশ কমিশনার ও গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটিতে বিশাল রদবদল ও সবকটি থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। ছাত্র-জনতার ওপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করাসহ আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। অপরাধ জগতের দাগি সন্ত্রাসীসহ অন্য অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা মহানগরে ঢাকার বাইরে থেকে পুলিশ সদস্যদের আনা হয়। তারপরও নিয়ন্ত্রণে আসেনি পরিস্থিতি। উল্টো গত দুদিন ঢাকায় তুলকালাম কা- ঘটেছে। ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক তান্ডব চালানো হয়। এসব ঘটনার পেছনে উসকানি আছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মনে করছে। এই নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপির হেডকোয়ার্টারে বৈঠক হয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানোসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটানোর চেষ্টার পেছনে কিশোর গ্যাং জড়িত আছে। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতারা কিশোর গ্যাংদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। ছাত্রদের ব্যানারে তারা বিশৃঙ্খলা করছে।’
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ও রাখতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো পদক্ষেপই কাজে আসছে না তা সত্য। সামনের দিনগুলোয় আরও কঠোর হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশন) রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যা যা করা দরকার, পুলিশ তাই করছে। তবে একটি মহল দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। আর এজন্য আমরা সতর্ক আছি। ওরা যাই করুক, ওদের আশা পূরণ হবে না।’
অপরাধবিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, গত দেড় দশকে পুলিশকে এতটা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে যে পুলিশের সঠিক দায়িত্ব কী, তা অনেক পুলিশই ভুলে গেছে। যে কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতা চাইলেও পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তবে অপরাধীদের বিষয়ে পুলিশকে আরও কঠোর হতে হবে। জনগণও পুলিশকে আপন করে নিতে হবে। বর্তমানে পুলিশ যেভাবে দায়িত্ব পালন করছে, তাতে মনে হচ্ছে ‘গাছাড়া ভাব’ নিয়ে চলছে তারা।