ঘোষণা দিয়ে কলেজে হামলা লুট

ঘোষণা দিয়ে রাজধানীর ডেমরায় ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে (ডিএমআরসি) পাল্টা হামলা চালিয়ে নির্বিচার ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। ফেসবুক গ্রুপে আগেই দেওয়া ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল দুপুরে এ দুই কলেজের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ডিএমআরসিতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট শুরু করে। ডিএমআরসির শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী মিলে হামলা প্রতিরোধের চেষ্টা করলে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয় দুপক্ষের মধ্যে। এতে শিক্ষার্থীসহ বহু মানুষ আহত হন। তাদের মধ্যে ৩৫ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে তিনজনকে অবস্থা বিবেচনায় ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং বাকিরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংঘর্ষের পর যাত্রাবাড়ী-ডেমরা এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ছয় প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে সোহরাওয়ার্দী ও কবি নজরুল কলেজ।

গতকালের এই সংঘাতকে অনেকেই আখ্যা দিয়েছেন ‘তাণ্ডব-২’ নামে। তারা বলেন, আগের দিন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল সরকারি কলেজে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীদের হামলা ছিল ‘তাণ্ডব-১’। আর এর পাল্টায় গতকাল ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে সোহরাওয়ার্দী ও কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থীদের তাণ্ডব আগের দিনকেও ছাড়িয়ে যায়। এটা যেন ‘তাণ্ডব-২’।

ছাত্রবেশে কিছু দুষ্কৃতকারী এ সংঘাতের সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ছালেহ উদ্দিন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসীরা ছাত্রবেশে হামলা চালিয়ে লুটপাট করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি করতে এ হামলা ও কোটি টাকার মালামাল লুটপাট হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে, মামলা হবে।’

পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল সকাল থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল কলেজের প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে বাহাদুরশাহ পার্কে জড়ো হতে থাকেন। পরে তারা সেখান থেকে পিকআপ ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহনে ডেমরা মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে গিয়ে হামলা চালায় এবং ভাঙচুর ও লুটপাট করে। এরপর পর দুপুর ১টার দিকে সেখানে মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনতা এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। তখন ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা দূরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্যকে দেখা গেছে। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিলেন। সংঘর্ষ থামে দুপুর দেড়টার দিকে। এরপর কলেজটির ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, ১২-তলা ভবনের সব তলায় ভাঙচুর চালানো হয়েছে। লুটপাট করা হয়েছে কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ও আসবাব।

প্রত্যক্ষদর্শী রাকিবুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুপুর ১২টার পর থেকে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করতে থাকে দুই কলেজের শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে মোল্লা কলেজের (ডিএমআরসি) শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনতা ধাওয়া দেয় তাদের (সোহরাওয়ার্দী ও কবি নজরুলের শিক্ষার্থী)। তখন অনেকেই পালিয়ে যায়। তাদের মধ্যে প্রায় একশজন পালাতে না পারায় মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা তাদের ব্যাপক মারধর করে। একজনকে কলেজের গেটের সামনে ফেলে আমি মারতে দেখেছি। তার অবস্থা সে সময় আশঙ্কাজনক মনে হয়েছে।’

হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে ডিএমআরসি কলেজের প্রায় ৭০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে কলেজ কর্র্তৃপক্ষ। গতকাল সন্ধ্যায় কলেজের অধ্যক্ষ ওবায়দুল্লাহ নয়ন সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, ‘আমাদের সব ধ্বংস করে দিয়েছে। হামলায় আমাদের ১২-তলা ভবনের কোনো কাচ আর অক্ষত নেই। পাঁচটি লিফট, কম্পিউটার ও সায়েন্স ল্যাব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হামলাকারী শিক্ষার্থীরা নগদ টাকা, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট, সার্টিফিকেট, ৩০০-এর ওপর ফ্যান, প্রায় ৩০টির মতো ল্যাপটপ, অসংখ্য কম্পিউটারসহ মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস লুট করেছে। এতে করে প্রায় ৬০-৭০ কোটির মতো ক্ষতি হয়েছে।’ শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইউসিবি নামের একটি গ্রুপ থেকে হামলার উসকানি ও ষড়যন্ত্র করা হয়েছে এবং হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ভূমিকা রাখেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

মাহবুবুর রহমান কলেজের শিক্ষার্থী সাজেদ হাসান বলেন, ‘আমরা মারামারিতে প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু তারা হঠাৎ করে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে আমাদের কলেজ ভাঙচুর ও লুটপাট করে। এখানে রাজনৈতিক মদদ আছে।’

এর আগে গত রবিবার ভুল চিকিৎসায় অভিজিৎ হালদার নামে ডিএমআরসির এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর অভিযোগের জেরে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতাল এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালান মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীরা। ওই হামলার জেরেই ডিএমআরসিতে হামলার কথা জানান ঘটনাস্থলে পাওয়া শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী বিজয় আহমেদ। তিনি বলেন, ‘গতকাল (রবিবার) মাহবুবুর রহমান কলেজের শিক্ষার্থীরা আমাদের কলেজে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। আমরা এর প্রতিশোধ নিতে এসেছি আজ (গতকাল)। মোল্লা কলেজে ঢুকে যা পেয়েছি, তা নিয়ে এসেছি।’

সংঘর্ষের সময় যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকায় ও সড়কে যান চলাচল একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে যাত্রাবাড়ী-ডেমরা রাস্তায় যানবাহন চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হয়। এর মধ্যেই বেলা ৩টার দিকে কলেজ কর্র্তৃপক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, ডিএমআরসি কলেজে সংঘর্ষের ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছে। কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফ সামীরের বরাত দিয়ে ওই বিজ্ঞপ্তিতে নিহতের ঘটনা জানানো হয়। যদিও এই মৃত্যুর বিষয়টি অপপ্রচার বলে জানিয়েছে ডিএমপি পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান। পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগে তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সকাল থেকেই রাজধানীর সূত্রাপুর ও ডেমরা এলাকায় পর্যাপ্ত জনবল মোতায়েন করা হয়। পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। তারপরও উচ্ছৃঙ্খল ও মারমুখি শিক্ষার্থীরা পুলিশের বাধা অতিক্রম করে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের দিকে অগ্রসর হয়ে হামলা চালায়। পুলিশ যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানোর জন্য অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকে।’ তিনি ঢাকার ৩৫টি কলেজের সমম্বিত গ্রুপ ইউনাইটেড কলেজ অব বাংলাদেশ (ইউসিবি) ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে হামলার উসকানির বিষয়টিও স্বীকার করেন।

আহতদের ব্যাপারে ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক বলেন, ‘যাত্রাবাড়ী থেকে আহত অবস্থায় অন্তত ৩৫ জনকে নিয়ে আসা এসেছে।’

ভাঙচুর ও গুলিভর্তি ম্যাগাজিন চুরির অভিযোগে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের আট হাজার শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে রাজধানীর সূত্রাপুর থানায় মামলা করেছে পুলিশ। গতকাল সংশ্লিষ্ট থানার উপপরিদর্শক একেএম হাসান মাহমুদুল কবীর বাদী হয়ে মামলাটি করেন। আদালতের সূত্রাপুর থানার সাধারণ নিবন্ধন (জিআর) শাখার সাব-ইন্সপেক্টর অনুপ দাস এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আগামী ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দিয়েছেন ঢাকা অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জিয়াদুর রহমান।

দুই কলেজ বন্ধ ঘোষণা ও সাত কলেজের পরীক্ষা স্থগিত : বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও কবি নজরুল সরকারি কলেজ। গতকাল পৃথক দুটি বিজ্ঞপ্তিতে অনিবার্য কারণ দেখিয়ে কলেজ দুটি বন্ধ ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের আজকের চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। গতকাল ঢাবির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. বাহালুল হক চৌধুরীর সই করা বিজ্ঞপ্তিতে পরীক্ষা স্থগিতের কথা জানানো হয়।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গতকাল সন্ধ্যায় ডিএমআরসির বাইরে অবস্থান করছিলেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে কলেজের বাইরে উৎসুক জনতার ভিড় দেখা গেছে।

এদিকে চলমান আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব নিরসনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা গতকাল রাতের বৈঠকে যাননি কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষকরা। কবি নজরুল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আলোচনায় বসার জন্য ফোন এসেছিল। কিন্তু আমরা যাচ্ছি না। এটা আলোচনার সময় নয়। শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত আছি। আলোচনার সময় নেই এখন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন আবার কীসের আলোচনা। আমরা সবাই শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত। অনেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি। এখন পর্যন্ত ৪০ জন শিক্ষার্থীর আহতের খবর পেয়েছি। সব শিক্ষার্থীর চিকিৎসা ব্যয়ভার কলেজ বহন করবে।’

অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ কাকলী মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘আমাদের পাশর্^বর্তী কলেজ কবি নজরুল কলেজ যেহেতু যাচ্ছে না, সেহেতু আমরাও যাব না। আমাদের ছাত্রদের রক্তের ওপর দিয়ে আমরা কোনো সংলাপে যাব না। মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের সঙ্গে কোনো বৈঠক করব না।’