চিন্ময় কৃষ্ণ কারাগারে আইনজীবী নিহত

বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) সাবেক নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে কারাগারে নেওয়ার সময় চট্টগ্রামে আদালত এলাকায় সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার চিন্ময় দাসের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়ার পর বিক্ষোভ করে সনাতনী সম্প্রদায়ের লোকজন। তকে বহন করা প্রিজন ভ্যান কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখেন তারা। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে পুলিশ। এ সময় দফায় দফায় চিন্ময় অনুসারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে সাইফুল ইসলাম আলিফ (৩৫) নামে এক আইনজীবী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২০ জন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধসহ আট দফা দাবি আদায়ের নেতৃত্ব দিয়ে আসা চট্টগ্রাম পুণ্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে গত সোমবার ঢাকা বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর রাত থেকে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তার মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। গতকালও দেশের অনেক জায়গায় তার মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল বেলা পৌনে ১১টার দিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে তাকে চট্টগ্রাম আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়ার পর বিক্ষোভ শুরু করেন তার অনুসারীরা।

এদিকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে গ্রেপ্তার ও জামিন না দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত সরকার। গতকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ জানিয়ে বলা হয়, বিষয়টি তারা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে। এ ছাড়া দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপির এক নেতাও এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।

আমাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, গতকাল দুপুর ১২টায় রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগের মামলায় চট্টগ্রাম ষষ্ঠ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শরীফুল ইসলামের আদালতে জামিন আবেদন নামঞ্জুর হলে চিন্ময় কৃষ্ণর অনুসারীরা আদালত প্রাঙ্গণে তাকে বহন করা প্রিজন ভ্যান আটকে দিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। অনুসারীরা প্রিজন ভ্যানের আশপাশে অবস্থান নেন। অনেকে মাটিতে শুয়ে পড়েন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বোঝানোর পরও সরে না দাঁড়ানোর কারণে দুপুর ২টা ৫০ মিনিটের দিকে অনুসারীদের পুলিশ ও বিজিবি লাঠিপেটা শুরু করে। পরপর কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়। এতে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান অবস্থানকারীরা। এরই মধ্যে পুলিশ প্রিজন ভ্যানে করে নিয়ে যেতে চাইলে সেটির চাকার হাওয়া ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে পুলিশের গাড়িতে করে চিন্ময় কৃষ্ণকে চট্টগ্রাম কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

চিন্ময় কৃষ্ণের অনুসারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে আদালত চত্বর ত্যাগ করার সময় জেলা পরিষদের সামনে দাঁড়ানো সেনাবাহিনীর জিপ, সরকারি গাড়ি, গণমাধ্যমকর্মীদের মোটরসাইকেলসহ অন্তত ২০টি গাড়ি এবং আদালত চত্বরের বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করে তারা। এ সময় চিন্ময়ের অনুসারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। অনুসারীদের ছোড়া ইটের আঘাতে আহত হন কোতোয়ালি থানার ওসি কাজী রফিক। পুলিশের সঙ্গে চিন্ময় অনুসারীদের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে রঙ্গম টাওয়ার, লালদীঘি, আন্দরকিল্লা এলাকায়। বেলা সাড়ে ৩টার দিকেও তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এ সময় লালদীঘি, আন্দরকিল্লা ও কোতোয়ালি এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

চিন্ময় অনুসারীদের ভাঙচুরের প্রতিবাদে আইনজীবী ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে থাকেন। অনুসারীদের ছত্রভঙ্গ করার সময় পুলিশের সঙ্গে যোগ দেন মহল মার্কেট, জেলা পরিষদ মার্কেট, টেরিবাজার এলাকার ব্যবসায়ীরাও। এ সময় আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ সংঘাতের মধ্যে পড়ে গুরুতর আহত হন। উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক নিবেদিতা ঘোষ বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহত ওই আইনজীবী চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি এলাকার জামাল উদ্দিনের ছেলে।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) হুমায়ুন কবীর বলেন, প্রায় তিন ঘণ্টা চিন্ময় অনুসারীরা প্রিজন ভ্যান আটকে রাখে। তাদের দাবি, আবার শুনানি হতে হবে। তবে আসামিপক্ষের আবেদন সাপেক্ষে বুধবার (আজ) মহানগর দায়রা জজ আদালতে চিন্ময় কৃষ্ণের জামিন শুনানি হবে।

এদিকে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সরেজমিন নগরের আন্দরকিল্লা, লালদীঘি, নিউ মার্কেট, জামাল খান, হাজারিগলি, চেরাগি, রহমতগঞ্জ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এলাকাগুলোয় পরিস্থিতি থমথমে। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ। অলিগলিতে বিচ্ছিন্নভাবে যুবকদের জটলা। এসব এলাকায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিশেষ ইউনিট সোয়াতের সদস্যরা অবস্থান করছেন। নিউ মার্কেট মোড়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়কদের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক ছাত্রকে অবস্থান নিতে দেখা গেছে।

সাইফুলকে সহকর্মী উল্লেখ করে বিচার দাবি জামায়াতের : চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম হত্যার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। নিহত আইনজীবীকে ‘প্রিয় দলীয় সহকর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করে জামায়াতের আমির এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ঢাবিতে বিক্ষোভ-গায়েবানা জানাজা : আইনজীবী সাইফুল হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে একদল শিক্ষার্থী। এ সময় তারা গায়েবানা জানাজাও করে। গতকাল রাত ১০টার দিকে টিএসসি এলাকায় এ জানাজার আয়োজন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এর আগে রাত ৯টার দিকে সাইফুল হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন তারা।

এ ছাড়া আইনজীবী সাইফুল হত্যার প্রতিবাদে ঢাবি ক্যাম্পাসে মশাল মিছিল বের করে ইনকিলাব মঞ্চ। রাত ৯টার দিকে রাজু ভাস্কর্য থেকে মশাল মিছিলটি শুরু হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে আবার সেখানেই গিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা এবং ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরা।

এ সময় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদি বলেন, আওয়ামী লীগ এখনো অনেকভাবে ফিরে আসার চেষ্টা করছে। তারা দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করছে।