বিদেশি জলদস্যুর সঙ্গে সক্রিয় দেশের ডাকাতরা

বছর পাঁচেক আগে ঢাকঢোল পিটিয়ে অন্তত সহস্রাধিক জলদস্যু সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তখন ইউনেসকো ঘোষিত পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত ঘোষণা করে সরকার। এরপর কিছুদিন ভালোই কেটেছে সুন্দরবন ও আশপাশ এলাকার বাসিন্দাদের। কিন্তু এ অবস্থা বেশিদিন টেকেনি। জলদস্যুরা আবার ফিরে এসেছে। গভীর সাগর ও জঙ্গলে তারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

শুধু দেশি দস্যুরাই নয়, বিদেশি দস্যুরাও বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কখনো কখনো দেশি ও বিদেশি দস্যুরা মিলে গভীর সাগরে গিয়ে ‘অপারেশন’ চালাচ্ছে। মুক্তিপণও আদায় করছে। এতে সুন্দরবন ও আশপাশের বাসিন্দারা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সম্প্রতি সুন্দরবন ঘুরে জলদস্যুদের সক্রিয়তার বিষয়ে নানা তথ্য মিলেছে।

সুন্দরবনের দুবলারচরসহ আরও কয়েকটি স্পটে গিয়ে ব্যস্ত জনপথের দেখা মেলে। কেউ নদী থেকে মাছ আহরণ করে নৌকায় করে নিয়ে আসছেন। আবার কেউবা মাছ জাল থেকে ছাড়িয়ে সাগরের পানিতে ধোয়ার কাজে ব্যস্ত। আরেক গ্রুপ মাছের ঝুড়ি কাঁধে তুলে ডাঙায় এনে শুঁটকি তৈরি করছেন। এভাবেই দিনভর চলে জেলেদের কর্মযজ্ঞ। দিনভর কর্মব্যস্ত থাকলেও তাদের মধ্যে আছে ডাকাত আতঙ্ক।

বন বিভাগ বলছে, সুন্দরবন ঘিরে মাছ ধরা, মধু আহরণ, কাঁকড়া শিকার, রেণু শিকার, শণকাটাসহ বিভিন্ন কাজে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ যুক্ত। এক সময় সুন্দরবন ছিল জলদস্যুদের অভয়ারণ্য। আতঙ্ক ছিল খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বনরক্ষীদের মধ্যেও। ট্রলারে হামলা চালিয়ে জাল ও মাছ লুট এবং বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিতদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা দস্যুদের কাছে ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। মুক্তিপণ না দিলে দস্যুদের আস্তানা থেকে কোনো পেশার মানুষেরই মুক্তি মেলেনি। দস্যুদের অত্যাচারে জেলে, মৌয়ালি, বাওয়ালিসহ সব পেশার মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। শুধু তা-ই নয়, জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি হরিণ-বাঘও। বিগত সরকারের আমলে অন্তত সহস্রাধিক জলদস্যু র‌্যাব ও পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হয় ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর। ওই সময় ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেছিল। এ ছাড়া পরে বিভিন্ন সময়ে হাজারের মতো দস্যু আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই পুরনো পেশায় চলে গেছেন।

নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন মৎস্যজীবী দেশ রূপান্তরকে জানান, মৎস্যসমৃদ্ধ উপকূলের একেকটি পয়েন্টে একেক নামে বাহিনী ত্রাসের রাজত্ব করছে এখনো। গভীর সমুদ্রে গিয়ে আতঙ্কে থাকছেন জেলেরা। আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে অনেকেই পুরনো পেশায় জড়িয়ে পড়েছে। দেশের দস্যুরা বিদেশিদের সঙ্গে আঁতাত করে সাগরে অপকর্ম করছে। দীর্ঘদিন ধরেই সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে জলদস্যুরা মাছ লুটপাট ও জেলেদের মারধর করে ট্রলার ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তারা আরও বলেন, প্রতিদিনই র‌্যাব, কোস্ট গার্ড ও বনরক্ষীরা নজরদারি করছে তা সত্য। তারপরও জলদস্যুরা সক্রিয়।

পুলিশ সূত্র জানায়, সম্প্রতি তাদের একটি বিশেষ ইউনিট জলদস্যুদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দস্যুরা সাগরে আগের চেয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা বিদেশি দস্যুদের সঙ্গে আঁতাত করে অপকর্ম করছে। তারা মাঝেমধ্যে বাংলাদেশের জেলেদের ওপর হামলা চালিয়ে মাছ ও ট্রলার লুট করে নিয়ে যায়। একটি প্রভাবশালী চক্র প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা মূল্যের ইলিশসহ অন্য সামুদ্রিক মাছ পাচার করছে ভারত ও মিয়ানমারে।

সাগরপাড় এলাকায় অন্তত দেড়শ দস্যু গ্রুপ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তাদের কাছে সবসময় থাকছে আগ্নেয়াস্ত্র। গ্রুপের সদস্যরা অপহরণ, দেশি-বিদেশি জাহাজে ডাকাতি, জেলে-বাওয়ালিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, বনাঞ্চলের কাঠ পাচার, হরিণ শিকারের সঙ্গে জড়িত।

জানা গেছে, সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের কপিলমুনি, বড়শিয়ালা খাল, অরমলখাল, ভেরিখাল; খুলনা রেঞ্জের পাটাকাটা খাল, আলকি, নিশানখালি, ভোমরখালি, পাটকোস্টা; সাতক্ষীরা রেঞ্জের কালিরচর, পুষ্পকাটি, নোটাবেকি, হলদিবুনিয়া, মান্দারবাড়ি, কোপানচি; শরণখোলা রেঞ্জের পাথুরিয়া, দুধমুখী, সুপতি এবং শাপলা খাল এলাকায় অপরাধ কর্মকাণ্ড চলছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুন্দরবনে এখনো জলদস্যুরা সক্রিয় আছে তা সত্য। বিদেশি জলদুস্যরাও মাঝেমধ্যে এসে অপকর্ম করছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হওয়ায় সেভাবে নজরদারি করা হচ্ছে না। তরপরও আমরা দস্যুদের প্রতিরোধ করতে কাজ করছি।