হাটহাজারী সার্কেলের দায়িত্ব পালনের সময় একবার শহরে এলাম মোবাইল ফোন মেরামতের জন্য। দোকানদার জানতে চাইলেন, 'আপনি কি পুলিশে চাকরি করেন?' 'হ্যাঁ।' 'কর্মস্থল?' 'হাটহাজারী।' 'বাবুল আক্তারকে চেনেন?' 'হ্যাঁ।' কিছুক্ষণ পর বিল তৈরির সময় দোকানি নাম জানতে চাইলেন। 'বাবুল আক্তার।' বিশ্বাস করতে পারলেন না। আবার জিজ্ঞেস করলেন। নিশ্চিত হওয়ার পর দোকানদার বললেন, 'স্যার, আমি টাকা নেব না, আপনি ভালো মানুষ। আমার এক আত্মীয়ের উপকার করেছিলেন।'
হাটহাজারী থেকে বিদায়ের সময় পুলিশ বিভাগ সুযোগ্য অফিসার বাবুল আক্তারকে একটি স্যুট উপহার দিল। স্যুট তৈরির জন্য টেইলার্সে গেলেন। স্যুট ডেলিভারি নেওয়া হলো না। তড়িঘড়ি চলে যেতে হলো নতুন কর্মস্থল কক্সবাজারে। কিছুদিন পর একটি পার্সেল এলো বাবুল আক্তারের ঠিকানায়। সেটা খুলে অবাক হয়ে দেখলেন, সেই স্যুটের পাশাপাশি আরো একটি স্যুট তাঁকে উপহার দেওয়া হয়েছে। হতবাক বাবুল ফোন করলেন টেইলার্সের মালিককে। তিনি বিনয়ের সঙ্গে বললেন, 'স্যার, আপনি আমাদের এলাকার অনেক উপকার করেছেন। কখনো কিছু করার সুযোগ পাইনি। ভালোবেসে এটা আমরা তৈরি করে পাঠিয়েছি। কিছু মনে করবেন না, এটা আমাদের ভালোবাসা।'
'আইকন' বাবুল আক্তারকে নিয়ে গর্ব করে বাংলাদেশ পুলিশ। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে রাজারবাগ প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরস্কার তুলে দেওয়ার আগ মুহূর্তে পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বাবুল আক্তারকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এই বলে, 'বাবুল আমাদের সবচেয়ে সাহসী অফিসার।' শুনে প্রধানমন্ত্রী বাহবা দিলেন। বাবুল আক্তার দ্বিতীয় দফা স্যালুট দিলেন প্রধানমন্ত্রীকে। প্রধানমন্ত্রী বাবুলের বুকে পরিয়ে দিলেন 'বিপিএম' মেডেল।
যদি বলা হয় বাংলাদেশের একজন ভালো পুলিশের নাম বলুন, তাহলে সবার আগে যে নামটি উচ্চারণ হয় সেটা বাবুল আক্তারের।
২০০৪ সালে মাহমুদা আক্তারের সঙ্গে সংসারজীবন শুরু করেন। দুটি সন্তান আক্তার মাহমুদ মাহির ও আক্তার তাবাচ্ছুম তানজিলা। সাহসী বাবুল আক্তার পদোন্নতি পেয়ে হয়েছেন পুলিশ সুপার। ২০১৫ সালের সকাল সোয়া ৭টায় বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানমকে চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে। এরপর নানা নাটকীয়তায় খুনি হয়ে যান বাবুল আক্তার।
আসলেই কি বাবুল আক্তার তার স্ত্রীকে খুন করেছেন? বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে মোট তিনটি মামলা ছিল। এর মধ্যে সাবেক পিবিআই প্রধান বনজ কুমারের মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন। চট্টগ্রাম মেট্রোর সাবেক প্রধান পুলিশ সুপার নাইমা সুলতানার দায়ের করা একটি মামলাতেও হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন। সবশেষ স্ত্রী হত্যা মামলাতেও হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেন। এর ফলে তার মুক্তিতে বাধা নেই বলে জানিয়েছেন আইনজীবী।
এদিকে, ২০১৬ সালের ৫ জুন চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড় এলাকায় গুলি করে ও কুপিয়ে মিতুকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তিনি বড় ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে জিইসি মোড়ে গিয়েছিলেন। এ ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় তিন ব্যক্তিকে আসামি করে দায়ের করা মামলার বাদী ছিলেন বাবুল আক্তার। ঘটনার কয়েক দিন পরেই মামলার তদন্ত নতুন মোড় নেয়। একপর্যায়ে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তার শ্বশুর মোশাররফ হোসেন। তদন্তের পর সেই মামলায় আসামি হন বাবুল আক্তার। এ ঘটনায় নতুন করেও মামলা হয়।
এরপর ২৪ জুন রাতে খিলগাঁও নওয়াপাড়ার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবুলকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন তিনি। অভিযোগ উঠে, বাবুল আক্তারকে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় চাপ প্রয়োগ করে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া হয়। ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতনের অভিযোগ এনে তৎকালীন পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদারসহ ৬ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করেন বাবুল আক্তার। মামলার আবেদনে সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা তার ওপর বিভিন্ন নির্যাতনের লিখিত বর্ণনা দেন। আদালত ১৯ সেপ্টেম্বর আদেশ দেয়া হবে বলে জানান।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন- পিবিআই চট্টগ্রাম জেলা ইউনিটের এসপি নাজমুল হাসান, চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিটের এসপি নাঈমা সুলতানা, পিবিআইয়ের সাবেক পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা ও এ কে এম মহিউদ্দিন সেলিম এবং সংস্থাটির চট্টগ্রাম জেলা ইউনিটের পরিদর্শক কাজী এনায়েত কবির। আবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের ১০ মে থেকে ১৭ মে পর্যন্ত সময়ে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো ও জেলা অফিসে বাবুল আক্তারের ওপর নির্যাতন করা হয়।
হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিতে বাবুল আক্তারকে আটকে রেখে সাদা কাগজে ও বিভিন্ন বইয়ের পাতায় বাংলা ও ইংরেজিতে বিভিন্ন কথা লিখতে বাধ্য করা; একটা রুমে অন্যায়ভাবে আটকে রেখে মানসিকভাবে নির্যাতন চালানো; সারাক্ষণ হ্যান্ডক্যাপ পরিয়ে এবং চোখ বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর আচরণ করা; দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা জাগিয়ে রাখা; গালিগালাজ ও অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করা; বারবার একই প্রশ্ন করা, যেমন ‘তোর বাপের নাম কী’; জিজ্ঞাসাবাদের সময় একজন মাথার বাম পাশে এবং সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন ডান পাশ থেকে ধাক্কা দেওয়া; খাবার জন্য অল্প অল্প পানি দেওয়া; গোসল করতে না দেওয়াসহ নানাবিধ অভিযোগ আনা হয়।
পিবিআই দাবি করেছিল, বাবুল আক্তারের পরিকল্পনা ও অর্থায়নে তার স্ত্রী মিতুকে হত্যা করা হয়। অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্কের জেরে তিনি স্ত্রী হত্যার পরিকল্পনা করেন। এজন্য সোর্সের (তথ্যদাতা) মাধ্যমে তিনি তিন লাখ টাকায় খুনি ভাড়া করেন।
কিন্তু আসলেই কি বাবুল আক্তার খুন করেছেন, নাকি খুনিরাই বাবুল আক্তারকে খুনিও বানিয়েছেন? ২০১৬ সালের ১৪ জুলাই বাবুল আক্তারের শ্যালিকা অর্থাৎ নিহত মিতুর ছোটবোন শায়লা মোশাররফ নিনজা অনলাইন গণমাধ্যম জাগোনিউজকে বলেছিলেন, ‘আজ একজন রিকশাওয়ালাও মনে করেন এসপি বাবুল আক্তার খুনি। কিন্তু এর অন্তরালে কি ঘটে যাচ্ছে তা কেউ জানতে পারছে না। মামলার তদন্তকালেই তাকে খুনি বানানো হচ্ছে। অথচ তিনি খুনি কি না তা এখনো প্রমাণ হয়নি। যদিও তা এখন অনেকের কাছে আর বড় বিষয় নয়, বড় বিষয় হচ্ছে বাবুল আক্তারকে চাকরিচ্যুত করা খুব জরুরি। যারা বাবুল আক্তারকে চায় না, ভিন্ন স্বার্থ চরিতার্থ করতে চান, তারা সবাই উঠে পড়ে লেগেছে।’
অন্যদিকে, বাবুল আক্তারের পরিবার দাবি করে, সাবেক এই পুলিশ সুপার তৎকালীন পিবিআই প্রধান বনজ কুমারের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার। চট্টগ্রামে পুলিশের একই ইউনিটে কাজ করার সময় দুইজনের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। বাবুলের স্ত্রী খুনের ঘটনা তদন্তকারী সংস্থাটির প্রধান হওয়ার সুযোগে তিনি বাবুলের ওপর প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছেন। বাবুলের পরিবার চেয়েছিল মামলার তদন্তভার যেন অন্য কোনো সংস্থাকে দেওয়া হয়।