১৯৬৫ সালে দৈনিক পাকিস্তানে যোগদান করেন তিনি। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দৈনিক বাংলার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ‘সুপান্থ’ ছদ্মনামে তার লেখা কলাম ‘নগর দর্পণ’ ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক এবং অবিভক্ত বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। ১৯৯৯ সালের ২৩ জুলাই মারা যান বরেণ্য সাংবাদিক আহমেদ হুমায়ূন। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতেই ছাপা হচ্ছে তার লেখা উপসম্পাদকীয়
ঐতিহাসিক ঢাকা নগরী একাধিক কারণে ট্যুরিস্টদের চোখে আকর্ষণীয়। প্রাচ্যের রহস্যময়ী নগরী ঢাকা। অনেক উত্থান-পতনের সাক্ষী। চিরকালের স্পন্দন এই নগরী। অতীতের নিদর্শনের চাইতে বর্তমানের মানুষ অনেক বেশি দৃষ্টি কাড়ে বিদেশিদের। প্রাণবন্ত, বিদ্রোহী, ইতিহাসের নায়ক... মানুষ। বিদেশি যাত্রীদের প্রলুব্ধ করার মতো যথেষ্ট গুণ আছে ঢাকা নগরীর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মানসিক সম্পদ ঢাকার প্রধান আকর্ষণ। এই সত্য সর্বজন স্বীকৃত। এ ছাড়া আরও অনেক বাড়তি গুণ এই নগরীর। একটু সচেষ্ট হলেই, ঢাকা নগরীকে বিশ্বের প্রধান ‘আনকনভেনশনাল ট্যুরিস্ট স্পট’ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। ঢাকা নগরী এক পরম বিস্ময়কর স্থান। সেই বিস্ময়গুলো ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলেই কেল্লা ফতে। ঝাঁকে ঝাঁকে বিদেশি পর্যটক আসতে শুরু করবে আমাদের দেশে। আলাদা যাদুঘর তৈরি করার দরকার নেই। সারা নগরীই এক জীবন্ত যাদুঘর। যেমন আমাদের এই বস্তিরূপী নিদর্শনগুলো। পুরাকালে মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করত তার চমৎকার বাস্তব প্রতিচ্ছবি হতে পারে এসব জনবসতি। পানি নেই, বিদ্যুৎ বাতির ঝামেলা নেই, ঘরে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হয়, রোদে ঝলসে যায়, বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় অতীত জীবনের এমন প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি আর কোথায় পাওয়া যায়। আমাদের রাস্তাঘাট, ডাস্টবিন, দোকানপাট, ময়লা নিষ্কাশন ব্যবস্থা ইত্যাদি সব কিছুই এই দৃষ্টিকোণ থেকে ট্যুরিস্টদের চোখে খুবই চিত্তরঞ্জক বলে মনে হবে। রাস্তা যে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে অথবা একটি ডাস্টবিনে যে এত ময়লা জমা করে রাখা যেতে পারে, এটা ট্যুরিস্টদের নিশ্চয়ই জানা নেই। এক একটা বাসে যাত্রী বহনের ক্ষমতা দেখিয়েও আমরা তাকে লাগিয়ে দিতে পারি বিদেশিদের। এই তেল সংকটের দিনে বাসের স্থান সুষ্ঠুভাবে ব্যবহারের ব্যাপারে বিশে^র সামনে আমরা নজির স্থাপন করতে পারি। পুরনো মডেলের বাস চালু রাখার দৌড়েও আমরা অগ্রগণ্য। হরপ্পা আর মহেঞ্জোদারোরও আগের আমলের ময়লা নিষ্কাশন ব্যবস্থা দেখতে হলে, পর্যটকদের অবশ্যই আসতে হবে এই নগরীতে। মানুষের জীবনীশক্তি যে কতখানি প্রবল, সে উপলব্ধিতে শুধু এখানেই পাওয়া যেতে পারে। খোলা আর বাসী খাবার, ধুলো আর মাছি যে আদৌ কোনো আশঙ্কাজনক ব্যাপার নয়, তা কেবল আমরাই শেখাতে পারি। বন্ধুর পথে যানবাহন চালানোর শিক্ষাও আমাদের হাতেই নিতে হবে বিদেশিদের। ঢাকা নগরীর আকর্ষণের কোনো শেষ নেই। এখানে না থাকতে পারে কোনো আকাশচুম্বী মিনার, আর্ট-গ্যালারি, পরিচ্ছন্ন জনপথ, পুষ্পময় পার্ক, ভালো সিনেমা-নাটক বা মনোহরণ বিপণিকেন্দ্র। কিন্তু ঢাকা নগরীর অন্যসব আকর্ষণগুলো পর্যটকরা কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারবেন না। এখন সেগুলো যথাযথভাবে প্রোজেক্ট করতে পারলেই হলো।
পুরুষ যেখানে প্রধান : নিজের ঘর ছাড়া পুরুষ সর্বত্রই প্রধান জীবনের যাবতীয় কর্মক্ষেত্রে। ঢাকা নগরীর রাজপথের ওপর দিয়ে প্রবাহমান জনস্রোতের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই নগরজীবনে পুরুষের প্রবল আধিপত্য অনায়াসে চোখে পড়ে। সকালে কাজে যাওয়ার সময়টিতে একশো জন পথচারীর মধ্যে মহিলার সংখ্যা পাঁচজনও থাকে কিনা সন্দেহ। ঘরমুখী জনস্রোতেরও একই চরিত্র। ব্যবসায় কেন্দ্রে সাদামাটা কেনাকাটার বাজারেও পুরুষেরই সংখ্যাধিক্য। শুধু বিকেলে ছুটির প্রহরে জনস্রোত কিছুটা বর্ণময় হয়ে ওঠে, অভিজাত বিপণিকেন্দ্রে আভা লাগে, ভিড় সম্পন্দমান হয়ে ওঠে অন্য সময় সর্বত্র শুধু গদ্যময় মুখের সমাবেশ। নগরজীবনে নারীর এই লাজুক উপস্থিতি আমাদের সামাজিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। গ্রামে শুধু গৃহকর্মই মেয়েদের প্রধান উপজীবিকা। নগরেও এই অবস্থার কিছু ইতরবিশেষ ঘটেনি। মহিলা কর্মজীবীর সংখ্যা হাতে গোনা না গেলেও কম্পিউটারের প্রয়োজন হয় না। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং একেবারে নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েরাই কাজের ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে তারা নিতান্ত সংখ্যালগিষ্ঠ। শিক্ষা ও চিকিৎসা ক্ষেত্র এবং দুয়েকটি শিল্পকারখানাই মহিলা কর্মজীবী শ্রমজীবীদের চোখে পড়ে সাধারণ চাকরিতে তাদের সংখ্যা খুবই কম। মেয়েদের পক্ষে কর্মজীবী হওয়ার মতো সামাজিক পরিবেশ পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি তেমনি সামাজিক মনোভঙ্গিও প্রতিকূল। ঘরে-বাইরে সব জায়গায় বাধা। এসব কারণে আমাদের নগরজীবনে পুরুষের আধিপত্য এখনো প্রবল। অথচ নারী-পুরুষের সমানাধিকার নাগরিকতার একটি প্রধান শর্ত। বিশে^র উন্নত নগরগুলোতে মেয়েদের দেখা যায় সর্বত্র। তারা এগিয়ে চলেছে পুরুষের পাশাপাশি, সব দুরূহ ও সহজ কাজের ভার সমানভাবে কাঁধে নিয়ে। সেখানকার রাজপথে মেয়েরা শুধু বিকেলের যাত্রী নয়, মেলা বা বিপণিকেন্দ্রের বাড়তি শোভাও নয়। ভিড় আর জনস্রোত সেখানে গদ্যেপদ্যে মেশানো ঢাকার মতো নীরব নয়।
মিনি নগরী : যত যাই বলি, ঢাকা আসলে এক মিনি-নগরী। ইন্টারকন থেকে শুরু করে মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা পর্যন্ত যার আধুনিকতার দৌড় শেষ। পর পর কোথাও দেখা যায় গ্রামের আভাস, কোথাও বা মফস্বল শহরের চেহারা। রাস্তায় দু পা না যেতেই চেনা মানুষের সাক্ষাৎ। মনে হয় সবাই সবার চেনা। এই নগরীতে নিঃসঙ্গ হয়ে, নির্জন হয়ে, নিজের হয়ে বাঁচার কোনো পথ নেই। একজনের অন্তরঙ্গ সীমায় সবার পদপাত ঘটছে অহরহ, সবার হাঁড়ির খবর সবার জানা। এখানে গুজব পল্লবিত হওয়ারও সময় পায় না। অফিসে চুটকি ছেড়ে বাসায় গিয়ে পৌঁছান যায় না, ইতিমধ্যেই সবার জানাজানি হয়ে যায়। কোনো নতুন খবর ভাঙা যায় না, সবাই জেনে ফেলে বাতাসের মুখে। সকালের ঘটনা দুপুর না পেরোতেই একদম বাসী। নগরজীবনের মূল কথা হচ্ছে তার রহস্যময়তা, দুর্জেয়তা, নৈর্ব্যক্তিকতা আর ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবোধ। অপরিচয়ের ঘোমটা যদি না থাকল, ঔদাসীন্যের আড়াল যদি না থাকল, তাহলে কীসের নগরজীবন? মশাইয়ের কী করা হয়, নিবাস কোথায়, পিতার নাম কী, কোথায় যাওয়া হবে ইত্যাদি প্রশ্ন আর কৌতূহল গ্রামীণ পটভূমিতে মানানসই, নগরীতে একটুও নয়। কিন্তু কী আর করা যাবে? মিনি নগরীতে এর চাইতে বেশি নাগরিকতা আশা করে লাভ নেই। ঢাকার চৌহদ্দি যদি আরও বড় হতো, জীবন যদি আরও দ্রুত হতো, তাহলে এসব সমস্যা কখনও দেখা দিত না। সবাই থাকত, পারত তার আপন জগৎ নিয়ে নির্ভূত হয়ে, নিঃসঙ্গ হয়ে।
পোস্টারে পরিচয় : মনে হচ্ছে, পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা অভিযানের প্রধান শিকার হবে নগরীর দেয়ালে দেয়ালে সাঁটা পোস্টার আর আলকাতরায় উৎকীর্ণ সব বাণী। পৌরসভার প্রশাসক বলেছেন, এখানে সেখানে পোস্টার লাগানোর দরুণ নগরীর সৌন্দর্যহানি ঘটে। কাজেই এখন তা বন্ধ করা হবে এবং পোস্টার সাঁটার জন্যে পৌরসভার পক্ষ থেকে বোর্ড তৈরি করে দেওয়া হবে। উত্তম পরিকল্পনা। কিন্তু লোকজন যে পৌরসভার বোর্ডেই পোস্টার লাগাবে তার নিশ্চয়তা কী? শহরের রাস্তায় আবর্জনা ফেলা নিষেধ, ফুটপাতে দোকান করা বেআইনি, কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গায় গাড়ি পার্ক করা নিষিদ্ধ, হর্ন বাজানো নিষেধ আছে কয়েক জায়গায় কজনে তা শোনে আর কে তা শোনায়? রাস্তাগুলো অন্ধকার রাখা অনুচিত, গলিগুলো মেরামত করা উচিত এই উচিত-অনুচিত বোধের কতটা প্রতিফলন ঘটে বাস্তবে? পরিচ্ছন্নতা অভিযানের প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব কম করে দেখতে চাই না। শুধু প্রশ্ন হচ্ছে, কয়েকটি বোর্ড তৈরি করে কি পোস্টার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। পৌরসভার কল্যাণে পোস্টার লেখকরা হয়তো কিছুটা বাড়তি স্পেস পেয়ে যাবেন, সেই স্পেসের জন্যে কড়াকড়ি প্রতিযোগিতাও চলবে।তার চাইতে যেমন চলছে তেমন চলতে দিলেই বা মন্দ বা মন্দ কী? পোস্টার তো ঢাকা নগরীর বাড়তি শোভায় সংযোজিত আকর্ষণ। এক কথায় বলা যায়, ঢাকা হচ্ছে পোস্টার নগরী, পোস্টারই তার পরিচয়।
কষ্ট করে যারা দেয়ালে পোস্টার সাঁটেন, আলকাতরার বড় বড় অক্ষরে নানা বাক্য লেখেন, তারা প্রচার ছাড়াও পথচারীর একঘেয়েমি দূর করে দেন। পোস্টার ছাড়া দেয়ালগুলোকে নিরস মনে হতো, পথচলার সময় চোখগুলো কাজ না পেয়ে চারদিক ভালো দৃশ্য খুঁজে হয়রান হতো এখন তা হওয়ার যো নেই। নগরীর দেয়ালগুলোকে পোস্টার কি বৈচিত্র্যময় করে রেখেছে, অনিয়ন্ত্রিত পোস্টারের এই অবদান কি উপেক্ষা করা যায়? অপারেশন ম্যানহোল ফুটপাতে ও রাস্তায় উন্মুক্ত ম্যানহোল নিয়ে লেখালেখি এখন বন্ধ হয়ে গেছে। সবাই মনে হয় এই পরম সত্যটা উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, ব্যাপারটা যখন ‘ম্যানহোল’ তখন ‘ম্যান’দের পতনের জন্যে তা উন্মুক্ত করে রেখে দেওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত কাজ। ম্যানহোলে ‘ম্যান’ যদি নাই পড়বে আর তা ম্যান হোল কেন? কাজেই প্রত্নতাত্ত্বিক কৌতূহলসম্পন্ন ব্যক্তিরা রাতে সন্তর্পণে ম্যানহোলের ছাঁকনিগুলো খুলে নিয়ে যাচ্ছেন এবং বাকি সবাই তা উন্মুক্ত থাকতে দিচ্ছেন। মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় ফুটপাতে ম্যানহোলগুলো পথিকের জন্যে সাদর আমন্ত্রণ বিছিয়ে রেখেছে মৃত্যুফাঁদ, দুর্ঘটনার আশঙ্কা? নগরীর রাজপথে কোনোভাবে কি মৃত্যু হয় না, দুর্ঘটনা ঘটে না? তাই বলে, ম্যানহোলের হা মুখ বন্ধ করতে হবে? দুর্ঘটনা ঘটে, তাই বলে যানবাহনও উঠিয়ে নিতে হবে রাজপথ থেকে। আর তাছাড়া ঢাকনি দিলেই কি অপারেশন ম্যানহোলের নায়করা তা যথাস্থানে রেখে দেবে? অন্য কোনো পন্থায় ম্যানহোল বন্ধ করা যায়? তার চাইতে সাবধানে গা বাঁচিয়ে চললেই তো সমস্যা চুকে যায়। খরচও বাঁচে।
পাদটীকা
জনৈক শিক্ষক বন্ধু বললেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে নকল একদম বন্ধ হয়ে যাবে। এত নিশ্চিত হলেন কী করে, আমার প্রশ্ন।
বন্ধু হেসে বললেন, যে হারে নকল-পাস চলছে তাতে আগামী পাঁচ বছরে বই খুঁজে পেয়ে ‘চোথা’ তৈরি করার মতো, লোকও পাওয়া যাবে না।
লেখক: আহমেদ হুমায়ূন
২৪.৩.১৯৭৪