‘পাগলা মসজিদ’ নামটি শোনার সঙ্গেই অবচেতন মনে মানুষের সামনে আসে বস্তা-বস্তা টাকা পাওয়ার বিষয়টি। শুধু টাকাই নয় সঙ্গে সোনা-রূপার অলঙ্কারসহ থাকে বিদেশি মুদ্রাও। প্রতি তিনমাস অন্তর পাগলা মসজিদের সিন্দুক খোলা হয়। সেই সিন্দুকে দানকৃত অর্থ গণনা করে মিলে কোটি কোটি টাকা। পাগলা মসজিদে কেন কোটি কোটি টাকা জমা পড়ে তা নিয়ে মানুষের মনে আগ্রহের শেষ নেই। তাই সিন্দুক খুললেই টাকার অঙ্ক জানতে উদগ্রীব হয়ে থাকে মানুষ।
কিশোরগঞ্জ শহরের হারুয়া এলাকায় অবস্থিত মসজিদটি ইতিহাস-ঐতিহ্যের এক অনবদ্য স্মারক। যার খ্যাতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও সমাদৃত। এই মসজিদটির নাম কেন ‘পাগলা মসজিদ’ হয়েছে তা নিয়ে নানা জনশ্রুতি রয়েছে। জনশ্রুতি মতে, প্রায় ১৫০ বছর আগে প্রমত্তা নরসুন্দা নদীর পানিতে ধ্যানরত এক ভাসমান দরবেশের আবির্ভাব হয়। তার কল্যাণেই নদীর মধ্যে জেগে ওঠে চর। নদীর তীরবর্তী রাখুয়াইল গ্রামের এক গৃহস্থের গাভি নিয়মিত নদী সাঁতরে ওই দরবেশের ভাণ্ডে ওলানের দুধ দিয়ে আসত। এতেই গাভির দরিদ্র মালিক ও স্থানীয় লোকজনের অনেক বৈষয়িক উন্নতি হয়। এমন আরও অসংখ্য কেরামতিতে বিমুগ্ধ মানুষজন ওই দরবেশের খেদমতে হুজরাখানা তৈরি করে। দরবেশের মৃত্যুর পর তার হুজরাখানার পাশেই পাগলা সাধকের স্মৃতিতে নির্মিত হয় এই পাগলা মসজিদ।
আরেক জনশ্রুতি হলো-হয়বতনগর দেওয়ানবাড়ির এক নিঃসন্তান মহিলাকে জনগণ পাগলা বিবি বলে ডাকত। এ মহিলা নরসুন্দার তীরে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে একটি মসজিদ নির্মাণ করলে তা পাগলা বিবির মসজিদ নামে পরিচিতি পায়। এসব জনশ্রুতি ও বিশ্বাস থেকেই মানুষ পাগলা মসজিদে দান করেন বলে জানা গেছে। এই মসজিদে শুধু যে মুসলামান ধর্মালম্বীরাই দান করেন তা কিন্তু নয়। প্রায় সব ধর্মাবলম্বী মানুষ নিজের মনের অব্যক্ত বিষয়গুলো চিঠি ও দান করার মাধ্যমে সেখানে প্রকাশ করেন। দানবাক্স খুললেই যার প্রমাণ মিলে। প্রতি তিনমাস পর দান বাক্স খুললেই টাকার সঙ্গে মিলে চিঠি। যেসব চিঠিতে মানুষ তাদের জীবনে প্রাপ্তির আনন্দ, না-পাওয়ার বিরহ বেদনা, আয়-উন্নতির ফরিয়াদ, চাকরির প্রত্যাশা, পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের আশা ও রোগব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে আকুতি প্রকাশ করেন। এসবের জন্যই মানুষ এই মসজিদে এত দান করেন বলে জানা গেছে।
গত ১২ মাসে দানবাক্সে কত টাকা মিলেছে?
প্রতি তিন মাস পরপর পাগলা মসজিদের দানবাক্স খোলা হয়। দানবাক্স খোলার পর দিনভর তা গণনার পর রাতে টাকার হিসেব জানানো হয়। আজ শনিবার( ৩০ নভেম্বর) পাগলা মসজিদের ১১টি সিন্দুক খোলা হয়েছে। যেখানে ২৯ বস্তা টাকার সঙ্গে পাওয়া গেছে স্বর্ণালঙ্কারসহ বিদেশি মুদ্রাও। দুটি মাদ্রাসার প্রায় আড়াইশ শিক্ষার্থী, ব্যাংকের ৭০ জন কর্মী, মসজিদ কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় ৪৫০ লোক টাকা গণনার কাজ করছেন। সন্ধ্যার পর জানা যাবে কত কোটি টাকা গত তিনমাসে দানবাক্সে জমা হয়েছে।
তবে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর মসজিদটির দানবাক্স খুলে পাওয়া যায় ৬ কোটি ৩২ লাখ ৫১ হাজার ৪২৩ টাকা। এদিকে এ বছরের গত ১৭ আগস্ট দানবাক্স খুলে ৭ কোটি ২২ লাখ ১৩ হাজার ৪৬ টাকা এবং গত ২০ এপ্রিল সিন্দুক খুলে পাওয়া গিয়েছিল ৭ কোটি ৭৮ লাখ ৬৭ হাজার ৫৩৭ টাকা। সবমিলিয়ে গত ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ২১ কোটি ৩২ লাখ টাকা দানবাক্স পাওয়া গেছে। এদিকে এই টাকা কোথায়-কীভাবে ব্যয় হয় তা নিয়েও মানুষের মনে কৌতুহলের শেষ নেই। ২০২৩ সালে চারবার খোলা হয়েছিল পাগলা মসজিদের দানবাক্স। চারবারে মোট ২১ কোটি ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার ১৮১ টাকা পাওয়া যায়।
কোথায় যায় পাগলা মসজিদের দানবাক্সের টাকা, খরচ হয় কীভাবে?
১৯৭৯ সাল থেকে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে পাগলা মসজিদের কার্যক্রম চলে আসছে। সেই থেকে পদাধিকার বলে পাগলা মসজিদ কমিটির সভাপতির দায়িত্বপালন করেন কিশোরগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক। তার তদারকিতেই হয় মসজিদের অর্থনৈতিক হিসাবনিকাশ। পাগলা মসজিদের বর্তমান কমিটিতে ৩১ সদস্য রয়েছেন। এই মসজিদের দানবাক্সের টাকাতে হয় এলাকার অন্যান্য প্রাচীন মসজিদের সংস্কার ও উন্নয়ন। এলাকার দরিদ্র, অসহায়, অসুস্থ ও অসচ্ছল পরিবারের জন্যও মসজিদ থেকে দেওয়া হয় অনুদান। লেখাপড়া, চিকিৎসা, অভাবী নারীর বিয়ের সময় সাহায্য করা এই মসজিদের গণমুখী কার্যক্রমের অংশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ রূপালী ব্যাংকে পাগলা মসজিদের নামে একটি হিসাব রয়েছে। সেখানেই জমা রাখা হয় মসজিদের আয়ের সব টাকা। তবে বর্তমানে কত টাকা ওই অ্যাকাউন্টে আছে, এ ব্যাপারে কেউই মুখ খুলতে রাজি হননি। মসজিদ কমিটির দাবি, স্বচ্ছতার সঙ্গে হিসাব রাখা হলেও কৌশলগত কারণে জমা টাকার পরিমাণটি গোপন রাখা হয়। এরপরও ধারণা করা হচ্ছে, বর্তমানে শতকোটি টাকার ওপরে জমা রয়েছে পাগলা মসজিদের ব্যাংক হিসাবে।
পাগলা মসজিদের আয়-ব্যয়ের অডিট করা হয় ওয়াক্ফ এস্টেটের অডিটর দ্বারা। অডিটের পর প্রতি অর্থবছরে আয়ের ওপর ৫ শতাংশ চাঁদা আদায় করে ওয়াক্ফ প্রশাসন। আর ব্যাংকে রাখা দানের টাকা থেকে মসজিদ-মাদরাসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, আনসারের বেতন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল বাবদ ব্যয় হয়। এ ছাড়া আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ বছরে প্রায় ৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়।
মসজিদ কমপ্লেক্সে প্রতিষ্ঠিত নুরুল কোরআন হাফিজিয়া মাদরাসায় অসহায় পিতৃ-মাতৃহীন শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করে। প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা শুধু এ শিক্ষার্থীদের খাবারের পেছনে ব্যয় হয়। শিক্ষার্থীদের যাবতীয় ভরণপোষণের ব্যয়ও নির্বাহ করা হয় মসজিদের দানবাক্স থেকে পাওয়া অর্থে। প্রতিবছরই মসজিদের অর্থায়নে নতুন জামাকাপড় দেওয়া হয় তাদের।
দানবাক্স থেকে প্রাপ্ত অর্থের লভ্যাংশের একটি বিশেষ অংশ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সহায়তা প্রদানের জন্য অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়। ২০২১ অর্থবছরে ১২৪ জন দুরারোগ্য ব্যাধিতে (ক্যানসার, ব্রেন স্ট্রোক, হার্ট স্ট্রোক, কিডনি রোগ, প্যারালাইসিস ইত্যাদি) আক্রান্ত দরিদ্র ও অসহায়কে চিকিৎসা এবং দরিদ্র ও দুস্থ মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়ার খরচ বাবদ ১৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকা পাগলা অনুদান দেওয়া হয় মসজিদের ফান্ড থেকে। এছাড়া করোনাকালে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে দেওয়া হয় ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।