শেখ হাসিনা ও ঘনিষ্ঠদের পাচার ৩০ লাখ কোটি

যখন যেখানে যা দেখানো প্রয়োজন পড়েছে, তা দেখিয়েই লুটপাট করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠরা। গত ১৫ বছরে নজিরবিহীন লুটপাটের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ। ১৫ বছরের শাসনামলে শেখ হাসিনা ও তার পরিবার এবং তাদের সরাসরি প্রশ্রয়ে রাজনীতিবিদ, আমলা, এমপি, মন্ত্রী, পুলিশসহ বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিরা শুধু পাচারই করেছেন ৩০ লাখ কোটি টাকারও বেশি। গড়ে প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। টাকার অঙ্কে যা প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। সে হিসাবে ১৫ বছরে পাচারের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ লাখ কোটি টাকা। ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা নিয়ে শে^তপত্র’ শিরোনামের প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। দেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শে^তপত্র প্রণয়ন কমিটি তাদের এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন গতকাল রবিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করে।

তিন মাসের অনুসন্ধান শেষে প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রতিবেদন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে কমিটির প্রধান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ছাড়াও অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ভারসাম্য, ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি, সরকারের ঋণ, পরিসংখ্যানের মান, বাণিজ্য, রাজস্ব, ব্যয়, মেগা প্রকল্প, ব্যবসার পরিবেশ, দারিদ্র্য ও সমতা, পুঁজিবাজার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারী, জলবায়ু ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে কমিটি। পদ্মা সেতু, রেল সংযোগ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র ও কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর ওপর তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। কমিটির পর্যবেক্ষণ বলছে, রাষ্ট্রীয় ভুলনীতি ও ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সীমাহীন লুটপাট এবং অনিয়ম হয়েছে।

প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এই প্রতিবেদন আমাদের জন্য একটা ঐতিহাসিক দলিল। আর্থিক খাতে যে ধরনের ঘটনা ঘটেছে, তা ছিল একটা আতঙ্কিত বিষয়। আমাদের সামনে এ ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কেউ এটা নিয়ে কথা বলেননি।’

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কমিটির প্রতিবেদন ওয়েবসাইটে আপলোড করা হবে। প্রতিবেদন জমার সময় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে তিনি অর্থনীতি সংস্কারে সব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে পূর্ণাঙ্গ উপস্থাপনের সুপারিশ করেছেন।

শে^তপত্র কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে যেসব ঋণ দেওয়া হয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট ছিল। আর এই প্রভাব ব্যাংক খাতের সংকটকে আরও গভীর করেছে। আলোচ্য সময়ে যে পরিমাণ ঋণ মন্দ বা বিপর্যস্ত হয়েছে, তা ১৪টি ঢাকা মেট্রো সিস্টেম অথবা ২৪টি পদ্মা সেতু নির্মাণের খরচের সমতুল্য। ক্রমাগত ঋণখেলাপি এবং হাইপ্রোফাইল কেলেঙ্কারি আর্থিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করেছে এবং মূলধনকে উৎপাদনশীল খাত থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

লুট করা অর্থ এফডিআইর দ্বিগুণ : ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যা কি না এ সময়ের বার্ষিক প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ও প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগের দ্বিগুণেরও বেশি। এ ছাড়া যেসব কর অব্যাহতির সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেগুলো অর্ধেক কমানো গেলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়েছে অর্থনীতির শ্বেতপত্রে।   

সামাজিক নিরাপত্তার ৭৩ শতাংশ সচ্ছল : সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ভুল ব্যক্তিদের বরাদ্দ দেওয়ায় লাখ লাখ মানুষ বঞ্চিত হয়েছে। ২০২২ সাল পর্যন্ত, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের ৭৩ শতাংশ দরিদ্র-নন বলে চিহ্নিত করা হয়, ২০১৬ সালে যাদের হার ছিল ৬৬ শতাংশ।

উন্নয়ন কর্মসূচির ৪০ শতাংশ আমলাদের পকেটে : প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হওয়ার তথ্য। পাশাপাশি সাতটি বড় প্রকল্পে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হওয়া এবং বিদ্যুতে কমপক্ষে ৩ বিলিয়ন ডলার অবৈধ লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ব্যয় হওয়া অর্থের ৪০ শতাংশ আমলারা লুটপাট করেছে বলেও প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে।

খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমরা দেশের আর্থিক খাতের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছি। সামনে খেলাপি ঋণ ২৫-৩০ শতাংশে পৌঁছে যাবে। এখন যা সাড়ে ১২ শতাংশ। আগামী মাসে তা ১৫ শতাংশ, এরপর ১৭ শতাংশ হয়ে ধীরে ধীরে ৩০ শতাংশে পৌঁছে যেতে পারে। এই খেলাপি আগেই হয়ে আছে। এখন হিসাবে তা আসবে। এটা কমিয়ে আনতে আমরা কাজ শুরু করেছি।’ তিনি বলেন, সামনে খেলাপি ঋণ যেটা দাঁড়াবে তার অর্ধেক বা আড়াই লাখ কোটি টাকা হবে এস আলম, সাইফুজ্জামানসহ (সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী) বড় কয়েকটি গ্রুপ ও ব্যবসায়ীর। ২০১৭ সালের পরে এসব ঋণ নেওয়া হয়। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পাচার করা হয়।

বড় প্রকল্প বড় দুর্নীতি : কমিটির সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান জানান, তারা ২৯টি প্রকল্পের মধ্যে সাতটি বড় প্রকল্প পরীক্ষা করে দেখেছেন প্রতিটিতে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। ২৯টি বড় প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ৮৭ বিলিয়ন ডলার বা ৭ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। পরীক্ষা করা সাতটি প্রকল্পের আনুমানিক প্রাথমিক ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। অতিরিক্ত উপাদান যোগ করে, জমির দাম বেশি দেখিয়ে এবং ক্রয়ের ক্ষেত্রে হেরফের করে প্রকল্পের ব্যয় সংশোধিত করে ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়। তিনি বলেন, ব্যয়ের সুবিধা বিশ্লেষণ না করেই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অর্থ পাচারে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে বিচারকাজ শুরুর পরামর্শও দেন তিনি।

কমিটির আরেক সদস্য অধ্যাপক এ কে এনামুল হক বলেন, গত ১৫ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৭ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে এবং এর ৪০ শতাংশ অর্থ আমলারা লুটপাট করেছে।

কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আবু ইউসুফ জানান, বিগত শাসনামলে কর অব্যাহতির পরিমাণ ছিল দেশের মোট জিডিপির ৬ শতাংশ। এটি অর্ধেকে নামিয়ে আনা গেলে শিক্ষা বাজেট দ্বিগুণ এবং স্বাস্থ্য বাজেট তিনগুণ করা যেতে পারত বলে জানান তিনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্বেতপত্র কমিটির সদস্যরা পরীক্ষা করে দেখেছেন দেশের বড় ২৯টি উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সাতটি বড় প্রকল্পের প্রতিটিতে ১০ হাজার কোটি টাকা করে বেশি ব্যয় হয়েছে। ২৯টি বড় প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ৮৭ বিলিয়ন ডলার বা ৭ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। পরীক্ষা করা সাতটি প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। অতিরিক্ত উপাদান যোগ করে, জমির দাম বেশি দেখিয়ে এবং ক্রয়ের ক্ষেত্রে হেরফের করে প্রকল্পের ব্যয় সংশোধন করে ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়। ব্যয়ের সুবিধা বিশ্লেষণ না করেই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ১৫ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ১৭ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে এবং এর ৪০ শতাংশ বা প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে।

কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আবু ইউসুফ জানান, বিগত শাসনামলে কর অব্যাহতির পরিমাণ ছিল দেশের মোট জিডিপির ৬ শতাংশ। এটি অর্ধেকে নামিয়ে আনা গেলে শিক্ষা বাজেট দ্বিগুণ এবং স্বাস্থ্য বাজেট তিনগুণ করা যেতে পারত।

অর্থনীতির শ্বেতপত্র কমিটি বলছে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ঋণ প্রদান প্রক্রিয়া দেশের ব্যাংক খাতকে আরও গভীর সংকটে ফেলেছে। চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ দিয়ে ১৪টি মেট্রোরেল ব্যবস্থা ও ২৪টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যেত।

কমিটি আরও জানায়, ব্যাংক খাতই সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। এরপর রয়েছে ভৌত অবকাঠামো এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত। একের পর এক ঋণখেলাপি এবং শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কেলেঙ্কারির কারণে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে।

কমিটির আরেক সদস্য এম তামিম বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। ১০ শতাংশ যদি অবৈধ লেনদেন ধরা হয়, তাহলে এর পরিমাণ হবে কমপক্ষে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

প্রতিবেদনে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত ব্যাংক খাতে ঋণ জালিয়াতি; ব্যাংক ঋণ জারির ক্ষেত্রে জালিয়াতি, অনিয়ম ও ঋণের অপব্যবহার ইত্যাদি চিত্র উঠে এসেছে। রাষ্ট্রীয় শক্তির অন্যায্য ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের মালিকানা দখল নেওয়া হয়েছিল।

এ ছাড়া, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নেওয়া অবাস্তব প্রকল্প; অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয় এমন সব প্রকল্প গ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় করা হয়েছে, এসব প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়ও বারবার বাড়ানো হয়েছে।

১০ ব্যাংক দেউলিয়া : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আমরা ১০টি দুর্বল ব্যাংককে তাদের সলভেন্সি ও তারল্য পর্যালোচনা করার জন্য বেছে নিয়েছি। ১০টি ব্যাংকের মধ্যে দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, যেগুলো গত দশকে কেলেঙ্কারির শিকার হয়েছে। বাকি আটটি অত্যন্ত দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও প্রচলিত বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক।’ গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্য ব্যাংকগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা, গণমাধ্যম ও জনসাধারণের কাছে এই ১০টি ব্যাংকই ‘দুর্বল’ হিসেবে আগেই চিহ্নিত হয়েছে। এই ১০টি ব্যাংকের সমন্বিত ঋণ ও আমানত মোট ঋণের ৩৩ শতাংশ এবং ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ৩২ শতাংশ। এতে বলা হয়, সম্পদের সম্মিলিত সমন্বয়কৃত মূল্য ছিল প্রদর্শিত মূল্যের ৫২ শতাংশ। ফলে নিট মূল্য ঋণাত্মক।

ব্যয় বাড়িয়ে দেখানো; প্রকল্পের বরাদ্দ আত্মসাৎ করে তা পাচারের জন্য নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদনের পর কৃত্রিমভাবে ব্যয় বাড়িয়ে দেখানো হয়, যাতে নতুন বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ করা যায়। একচেটিয়া দরপত্র প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক সমর্থক, অনুগত ও তোষণকারীরা যেন দরপত্র পায় তা নিশ্চিত করা হয়, এতে বাদ পড়ে যান যোগ্য ঠিকাদাররা।