যেভাবে যুদ্ধের হাতিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক

জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কারের কাহিনি খুব বেশি মানুষ জানে না। মানবসভ্যতার ইতিহাসের অনন্য সেই আবিষ্কার নিয়ে লিখেছেন জান্নাতুল ফেরদৌস অনন্যা

অ্যান্টিবায়োটিককে বলা হয় পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী। অস্ত্র যেখানে মানুষকে হত্যা করে, অ্যান্টিবায়োটিক সেখানে মানুষের প্রাণ বাঁচায়। আজ থেকে প্রায় ৭৫ বছর আগে অ্যান্টিবায়োটিক পরীক্ষায় সাফল্য পেতে শুরু করেন বিজ্ঞানীরা। ১৯২৮ সালে স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের হাত ধরে পেনিসিলিন আবিষ্কার হলেও অ্যান্টিবায়োটিকের আরও পুরনো ইতিহাস রয়েছে। গবেষকরা বলছেন, ২০০০ বছর আগে মিসর, গ্রিস, চীন ও সার্বিয়া অঞ্চলে সংক্রামক রোগ সারাতে অ্যান্টিবায়োটিকের উপাদান ব্যবহৃত হতো। জানা যায়, প্রাচীন মিসরীয়রা নানান সংক্রামক ব্যাধি সারাতে, ছত্রাক আক্রান্ত পাউরুটি ও রোগ নিরাময়ের জন্য এক ধরনের বিশেষ মাটি ব্যবহার করত। বিভিন্ন গবেষণায় আরও জানা যায়, প্রাচীন মিসরীয়রা এক ধরনের পুরনো বিয়ার পান করত, যাতে থাকত টেট্রাসাইক্লিন। অর্থাৎ ব্যাপারটি যা দাঁড়াচ্ছে, নিজেদের অজান্তেই প্রাচীন মিসরীয়রা অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করত।

অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকর ব্যবহারের পেছনে রয়েছে যুদ্ধের ইতিহাস। কারণ যুদ্ধে সৈনিকরা আহত হবে এটা স্বাভাবিক। শরীরের বিভিন্ন স্থানে কাটা-ছেঁড়া হবে। সেখান থেকে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সুচিকিৎসা না পেয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সংক্রামক ব্যাধিতে সৈন্যদের মৃত্যু হতো। কিন্তু যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হলে সৈন্যদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে, তাদের সুস্থ করে তুলতে হবে। যা আবার যুদ্ধজয়ের পূর্বশর্ত। যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়টি বুঝতে সময় লাগেনি। তারা পেনিসিলিনকে দ্রুতই যুদ্ধ জয়ের হাতিয়ার করে তুলল। তাদের হাত ধরে ক্ষতস্থান শুকানোর কাজ শুরু হয়। ফলে সৈন্যরা মৃত্যুর হাত থেকে যেমন বেঁচে যায়, তেমনি আবার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে পুনরায়।

সর্বপ্রথম ইঁদুরে

২৫ মে, ১৯৪০ সালে তারা সর্বপ্রথম ৮টি ইঁদুরের ওপর অ্যান্টিবায়োটিকের পরীক্ষা চালায়। এই পরীক্ষাটি করা হয় কয়েক দফায়। প্রথমে ইঁদুরগুলোর শরীরে স্ট্রেপটোকোকি ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করিয়ে তাদের দুভাগে ভাগ করা হয়। তারপর এক ভাগের ওপর গবেষক দল পেনিসিলিন প্রয়োগ করেন, অন্য ভাগের ওপর করেন না। এর ফলে পরদিন সকালে অর্থাৎ প্রায় ১৮ ঘণ্টা পরে দেখা যায় যেসব ইঁদুরগুলোর ওপর পেনিসিলিন প্রয়োগ করা হয়নি তারা সবাই মারা গেছে। উপরন্তু পেনিসিলিন পাওয়া ইঁদুরগুলো তখন অবধি জীবিত ছিল, এমনকি পরবর্তী সময় তারা অনেক দিন পর্যন্ত সুস্থভাবেই বেঁচেছিল। এ রকম ফলাফলের পরে, ফ্লোরে ভাবলেন এখনই সময় পেনিসিলিন মানুষের ওপর পরীক্ষা করার। কেননা ইঁদুরের চেয়ে মানুষ যেহেতু ৩০০০ গুণ বড় সেহেতু ফ্লোরে খুব ভালোভাবেই জানতেন শুধু ইঁদুরের ওপর এর পরীক্ষা চালিয়ে নিশ্চিন্ত থাকাটা বোকামি। 

এদিকে ১৯৪১ সালে তাদের কাছে খবর আসে অ্যালবার্ট আলেকজান্ডার নামে একজন পুলিশ সদস্য গুরুতর অবস্থায় ভর্তি আছেন হাসপাতালে। যদিও প্রথমদিকে তিনি ভর্তি হন সামান্য কাটা-ছেঁড়া নিয়ে কিন্তু পরবর্তী সময় তা মারাত্মক আকার ধারণ করে। অনেকের মতে, আলেকজান্ডারের মুখে গোলাপের কাঁটা ঢুকে পড়ে। আবার অনেকে মনে করেন, নাৎসি বাহিনীর বোমার আঘাতেই আহত হয়েছিলেন আলেকজান্ডার। সে যাই হোক, কেউ অনুমানই করতে পারেনি, তার এই সামান্য জখম একসময় ছড়িয়ে পড়বে পুরো শরীরে, এমনকি একপর্যায়ে তা প্রাণসংহার করে নেওয়ার পর্যায়ে চলে যাবে।

ফ্লোরে সিদ্ধান্ত নেন অ্যালবার্ট আলেকজান্ডারই হবেন প্রথম মানুষ, যার ওপর প্রয়োগ করা হবে এই অ্যান্টিবায়োটিক। সে মোতাবেক, ৪ দিন অন্তর অন্তর প্রতিনিয়ত আলেকজান্ডারের শরীরে পেনিসিলিন প্রবেশ করানো হয়। এতে দেখা যায়, প্রথম ২৪ ঘণ্টায় মরণাপন্ন আলেকজান্ডার কিছুটা সুস্থবোধ করেন এবং আস্তে আস্তে সেরে উঠতে থাকেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন গবেষক দল পেনিসিলিনের অপ্রতুল উৎপাদন ও ব্যাপক চাহিদার মাঝে সমন্বয় সাধন করতে ব্যর্থ হলেন। তারা আলেকজান্ডারের মূত্র থেকে পেনিসিলিন পুনরায় ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছিলেন। কিন্তু এভাবেও খুব বেশি দিন চালানো গেল না। পেনিসিলিনের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেল। আর তার ঠিক এক মাস পরেই অ্যালবার্ট আলেকজান্ডারও মারা গেলেন।

অনুসন্ধান

এই ঘটনার পর, ফ্লোরে পেনিসিলিনের প্রচুর উৎপাদন ও তার সঙ্গে ব্যাপক পরিসরে হিউম্যান ট্রায়ালের জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্টনারশিপ খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠলেন।  মিত্র বাহিনীকে যুদ্ধে জেতাতে অক্সফোর্ডের এই গবেষক দল পেনিসিলিনের ব্যাপক পরিসরে উৎপাদন চালু করার চেয়ে ভিন্ন কোনো উপায় সামনে দেখলেন না। কিন্তু তাদের এই উদ্যোগে বাদ সাধে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সমস্যা। কেননা এমনিতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছিল যুক্তরাজ্যের জন্য, তার ওপর পেনিসিলিনের ব্যাপক উৎপাদনের সম্ভাব্য খরচ! সব মিলিয়ে ব্রিটিশ কোনো কোম্পানি এগিয়ে এলো না তাদের কাছে। উপরন্তু গবেষক দলের ভয় ছিল এ ভেবে যে, পেনিসিলিন উৎপাদনের প্রজেক্ট না জানি কখন নাৎসিদের হাতে চলে যায়। এই ভয়টা এতই প্রকট ছিল অক্সফোর্ড গবেষকদের মধ্যে, পরবর্তী সময় যখন বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়, ফ্লোরে তাদের দলের সে সময়কার একটা ওর্স্ট কেস স্ট্র্যাটেজি প্রকাশ করেন। যাতে তিনি উল্লেখ করেন, নাৎসি আক্রমণের আতঙ্কে সর্বদা নিজেদের প্রস্তুত রাখতে তারা পেনিসিলিয়াম নোটাটামের রেণু জামা কাপড়ে ঘষে রাখতেন, যেন নাৎসিরা আক্রমণ করলে যে যার মতো যেকোনো জায়গায় পালিয়ে গিয়ে এই রেণুর সাহায্যে যেকোনো অবস্থাতেই গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।

উৎপাদন

ফ্লোরে সিদ্ধান্ত নিলেন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে পেনিসিলিনের গুরুত্ব অনুধাবন করাবেন ও সমর্থন আদায় করে ব্যাপক পরিসরে উৎপাদন কাজ পরিচালনা করবেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফ্লোরে তার দলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নরম্যান হিটলিকে নিয়ে পৌঁছলেন যুক্তরাষ্ট্রে এবং এরপর তাদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। খুব দ্রুতই তারা পেয়ে গেলেন একটি নয়, দুটি নয়, চার-চারটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল অংশীদার।

প্রকৃতপক্ষে তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, সে সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিজেও চেয়েছিল পেনিসিলিনকে ব্যবহারোপযোগী করে তুলতে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশ করার পর থেকেই উদ্বিগ্ন ছিল এবং চাচ্ছিল যেকোনো উপায়ে এই যুদ্ধে আমেরিকান সৈন্য ও বেসামরিক নাগরিকদের হতাহতের সংখ্যা কমাতে। আর এ কারণে তারা শুরুতেই পেনিসিলিনের উৎপাদনের ওপর জোর দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্র সরকার সে দেশের ২০টিরও বেশি কোম্পানিকে নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে পেনিসিলিন উৎপাদনের জন্য অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায়, ১৯৪২ সালের জানুয়ারি থেকে মে অবধি ৪০০ মিলিয়ন ইউনিট পেনিসিলিন উৎপাদন হয় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যালসের।

যুদ্ধে ব্যবহার

উৎপাদন আরও বেড়ে গেল ১৯৪৪ সালে যখন মিত্র বাহিনী নরম্যান্ডিতে আক্রমণ করল। সে সময় প্রতি মাসে ১০০ বিলিয়ন ইউনিট পেনিসিলিন উৎপাদিত হতে থাকল। ১৯৪৪ সালে উৎপাদিত এই পরিমাণ পেনিসিলিন আসলে শুধু যুদ্ধাহত সেনাদের জন্যই নয়, বরং যুদ্ধাহত সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার জন্যও যথেষ্ট ছিল। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ নাগাদ, যুক্তরাষ্ট্র প্রতি মাসে ৬৫০ বিলিয়ন ইউনিট পেনিসিলিন উৎপাদনে সক্ষম হয়েছিল। যা সে সময় মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের মৃত্যুহার ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করে। 

তবে পেনিসিলিন উৎপাদনের কথা উঠলে, নরম্যান হিটলির নাম উল্লেখ করতেই হবে। তারই তত্ত্বাবধানে প্রথমদিকে পেনিসিলিন তৈরি হতো সমতল ও প্রশস্ত কালচার ডিশে। প্রথমদিকে হাসপাতালের বেডপ্যানগুলোও ব্যবহৃত হতো পেনিসিলিন উৎপাদনের কাজে। তারপর ধীরে ধীরে হিটলির কল্যাণে ডিপ কালচার পদ্ধতিতে উৎপাদিত হতে থাকল পেনিসিলিন। প্রথম অবস্থায়, উৎপাদন স্বল্পতার কারণে পেনিসিলিন এয়ারমার্কড অবস্থায় থাকত ও তা কেবল সামরিক উদ্দেশ্যে সৈন্যদের ওপরই ব্যবহৃত হতো। পেনিসিলিনের সবচেয়ে বড় পরিসরে যে হিউম্যান ট্রায়াল হয় সেটিও ছিল একটা মিলিটারি ফিল্ড হাসপাতাল। 

জনপরিসরে

সে যাই হোক, যেখানে বিভিন্ন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে প্রথম বিশ^যুদ্ধেই মাত্র ৪ শতাংশ সৈনিক বেঁচেছিল, সেখানে ‘দ্য ব্লাডিয়েস্ট কনফ্লিক্ট’ খ্যাত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধাহত ৫০ শতাংশ সৈনিকই বেঁচে গিয়েছিল! সেই সময়কালের জন্য এটা আসলেই অকল্পনীয় একটি ব্যাপার। পেনিসিলিন আবিষ্কারের আগে অর্থাৎ ১৯০০ শতকের পূর্বে, পুরুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র ৪৬ বছর, যেখানে নারীদের ছিল মাত্র ৪৮ বছর। সে সময় বিভিন্ন অসুখ যেমন স্মল পক্স, টাইফয়েড, যক্ষ্মা, কলেরা, ডিপথেরিয়া, প্লেগ, সিফিলিস, টাইপাসের মতো বিভিন্ন সংক্রামক ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েই লোকালয় থেকে লোকালয় উজাড় হয়ে যেত।

 ১৯৪০-এর দশক থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত সময়কালকে অ্যান্টিবায়োটিকের স্বর্ণালি যুগ হিসেবে ধরা হয়। ১৯৭০ সালের পর অ্যান্টিবায়োটিকের নতুন আর কোনো ক্লাস তৈরি হয়নি বরং আবিষ্কৃত অ্যান্টিবায়োটিকগুলোকেই মডিফাই করা হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পর, রোগাক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যুর কারণেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আগে যেমন বিভিন্ন সংক্রামণ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যু হতো, এই আশ্চর্য প্রতিষেধকটি আসার পর মানুষের মৃত্যু হতে থাকল বিভিন্ন অ-সংক্রামক ব্যাধিতে যেমন- স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, ক্যানসারের মতো রোগে। যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের গড় আয়ুষ্কাল ৭৮.৮ বছর পর্যন্ত বেড়ে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। আবার অ্যান্টিবায়োটিকের কল্যাণেই ১৯৪৪ থেকে ১৯৭২ সালে মধ্যে মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ুষ্কাল বেড়েছিল ৮ বছর।