শিল্পীদের মানুষ দ্রুত ভুলে যায়

একাধারে লেখক, গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী। এর পাশাপাশি একজন চাকরিজীবীও। বলছি ‘ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো’ খ্যাত লুৎফর হাসানের কথা। শিগগিরই নতুন গান নিয়ে আসছেন। গান ও তার কল্পনার জগৎ নিয়ে কথা শুনেছেন ইমরুল নূর

এতগুলো গুণ আপনার, এর মধ্যে কোন পরিচয়টা দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

লেখক হিসেবে পরিচয় দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আমি মূলত ঢাকা শহরে লেখার জন্য এসেছিলাম, গান গাইতে আসিনি। তবে আমার কিছু গান মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গান গেয়ে অনেক কিছু পেয়েছি। কিন্তু লেখালেখি করে তা পাইনি। তবে আমার লেখা পড়ে কেউ প্রশংসা করলে নিজের কাছে বেশি আনন্দ লাগে।

আপনার গানের মূল উপজীব্য কী?

আমি গ্রামের ছেলে, নদীর পাড়ের ছেলে যে কিনা শহরের পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায়। আধুনিকতা গ্রহণ করলেও গ্রামের সেই ভাব-ভালোবাসা কখনো ছাড়তে পারিনি। গ্রাম আর শহুরে মানুষের মধ্যকার ভালোবাসাকে এক করে গান সৃষ্টি করেছি এবং আমার দর্শক তা ভালোভাবেই গ্রহণ করছে।

৭০০’র কাছাকাছি গানে কাজ করেছেন। কিন্তু সে তুলনায় শিল্পী হিসেবে গান অনেক কম। সেটা কেন?

এর দুইটা কারণ আছে। এক. এখন আগের মতো ক্যাসেট হয় না। এখন একটা গান করতে হলে সঙ্গে এর ভিডিও করতে হয়। শুটিংসহ একটা গানের আয়োজন ঘিরে বেশ ভালো খরচ আছে। প্রযোজনা সংস্থা দুই-তিন মাস পরে একটা গান রিলিজ করে। নিজে গান করলেও দুই-তিনটার বেশি কাজ করা হয় না। অপরদিকে গান লিখতে, সুর করতে আমার খরচ লাগে না। গান লিখে, সুর করে শিল্পীকে বুঝিয়ে দিলেই হয়ে যায়। তবে আমার মনে হয় অন্য শিল্পীদের তুলনায় আমার মৌলিক গানের সংখ্যাই বেশি।

রিলিজের পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গান শুধু শিল্পীর হয়ে যায়, কেন?

একটা গান মূলত তিনজন মানুষের। পৃথিবীতে যে কপিরাইট আইন আছে ওই আইন অনুযায়ী একটা গান গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী তিনজনের সম্মিলিত মালিকানা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায় গানটি শিল্পীর হয়ে যায়। মূলত এই যন্ত্রণা থেকেই লেখার পাশাপাশি গানে কণ্ঠ দেওয়া।

‘ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো’ আপনাকে তুমুল পরিচিতি দিয়েছে। এক যুগেও সেটিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো কোনো গান এলো না কেন?

প্রথমত, আমি কখনো চাইনি কোনো গান ওই গানটিকে ছাড়িয়ে যাক। এটি এত জনপ্রিয় গান যাকে প্রতিযোগিতা করে অন্য একটি ক্রস করে যাক, এই নিয়তে কোনো গান করিনি। দ্বিতীয়ত, আমাদের সময় যে ধরনের গানগুলো দর্শক পছন্দ করত তা এখনো মানুষের মুখে মুখে। বর্তমানে যে গানগুলো জনপ্রিয় হয়, তার স্থায়িত্ব কম। আমি বিশ্বাস করি আমাদের সময়ের সব থেকে গুণী গীতিকার ছিলেন সোমেশ্বর অলি। তাই আমার ক্ষমতা নেই ওই গানটিকে ক্রস করে কোনো গান তৈরি করব। ফলে ওই গানটি ছাপিয়ে যেতে পারেনি কোনো গান আর আগামীতেও পারব না।

গান জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, আগের মতো মানুষের মনে গেঁথে থাকে না কেন?

এতে শিল্পী বা শ্রোতা কারোরই দোষ নেই। কারণ এত এত রিলস, দেশি-বিদেশি ভিডিও আমাদের সামনে আসে। মানুষ কোনটাকে মাথায় নেবে? তখন একাধিক সুযোগ ছিল না। অনেক কষ্ট করে একটা ক্যাসেট সংগ্রহ করতে হতো। সেটা সব সময় বাজাত। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সব কয়টি গান মুখস্ত হয়ে যেত। এখন ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়াতে প্রচুর কনটেন্ট হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ নতুন নতুন কনটেন্ট খুঁজে একটা জিনিসের ওপর পড়ে থাকে না। যার ফলে স্থায়িত্ব পায় না। গত বছর তুমুল হিট হওয়া গান কিন্তু এ বছর নেই। এখন একটা গানকে নতুন আরেকটা গান অতিক্রম করে যাচ্ছে। আমাদের সময় এই অতিক্রম করে যাওয়ার সিস্টেম ছিল না।

গানে বিরতি ও ফেরা

একজন শিল্পীর নিজস্ব শ্রোতা তৈরি হয়ে গেলে তারা অনুপ্রেরণা দিতে থাকে। সে ভালোবাসার ধারা অব্যাহত রাখতে গান গাইতে হয়। তবে বাংলাদেশে কোন শিল্পী কাজ থেকে বিরতি নিলে, সেখান থেকে ফিরে আসতে অনেক কষ্ট হয়। কারণ শিল্পীদেরকে মানুষ দ্রুত ভুলে যায়। সেই ভয়ের জায়গা থেকে বিরতি নেওয়া হয়নি। এখন পুরোদমে গানে কন্ঠ দেওয়া হচ্ছে।

শাহরিয়ার মার্সেলের সঙ্গে ১৫-২০টি গান করা হচ্ছে। এরমধ্যে ৭টি গান একদম প্রস্তুত আছে। এগুলো একটা একটা করে সামনে রিলিজ দেব।

নতুন বছরে বইমেলায় কোনো বই নিয়ে সুখবর আছে কি?

হ্যাঁ। অন্যপ্রকাশ প্রকাশনী থেকে আমার একটি উপন্যাস আসবে। তবে এটা সম্পর্কে বিস্তারিত এখনই নয়। আরও পরে জানাব।