ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল

ঋণ করে ২২ কোটির ঘি

আধুনিকায়ন ও সংস্কারের জন্য ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বন্ধ ছিল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (তৎকালীন রূপসী বাংলা)। বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের (বিএসএল) ব্যবস্থাপনাধীন পাঁচ তারকা মানের এই হোটেলের সংস্কারকাজের জন্য ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছিল ৫৭৪ কোটি টাকা ঋণ। সেই ঋণের টাকা থেকে বিএসএল ও হোটেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সার্ভিস চার্জের নামে দেওয়া হয়েছে প্রায় ২২ কোটি টাকা। বন্ধ হোটেলে সার্ভিস (সেবা) না দিয়েও সার্ভিস চার্জ দিতে বাধ্য করা হয়েছে কর্তৃপক্ষকে। ঋণের টাকা থেকে এই কথিত সার্ভিস চার্জ প্রদানে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

আরেক পাঁচ তারকা হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে সার্ভিসের ওপর উৎস কর কর্তন না করায় সরকারের ২ কোটি ৫২ লাখ ৯৯ হাজার ৪৫৯ টাকা ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারি মালিকানাধীন এই দুটি হোটেলে ২৪ কোটি ৪৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৫৭ টাকার অনিয়ম হয়েছে। যাকে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অর্থ ফেরত এনে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের রিপোর্টে।

এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদনটি জাতীয় সংসদের হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপনের জন্য চলতি বছরের জুলাই মাসে পাঠানো হয়েছিল রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে।

জানা গেছে, ২০২১ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান বিএসএল এবং হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ২০১৮-১৯ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরের কার্যক্রমের ওপর অডিট পরিচালনা করে বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের একটি দল। দলটি এর আগে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত হোটেল ইন্টারন্যাশনালের আওতাধীন হোটেল প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ের কার্যক্রমের ওপর অডিট পরিচালনা করে।

ওই অডিটে উঠে আসে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সার্ভিস চার্জ দেওয়ার নামে ২১ কোটি ৯১ লাখ ৭৪ হাজার ৬৯৮ টাকা এবং প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে উৎস কর কর্তন না করায় ২ কোটি ৫২ লাখ ৯৯ হাজার ৪৫৯ টাকাসহ ২৪ কোটি ৪৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৫৭ টাকার ক্ষতির বিষয়টি। অডিট দল এসব আর্থিক অনিয়ম মীমাংসার জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বিএসএলে একাধিকবার চিঠি দেয়।

কিন্তু কোনো দপ্তরই আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়নি। পরে অডিট রিপোর্ট মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে পাঠানো হয় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে। এটি সেখান থেকে জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর কথা ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় সংশ্লিষ্ট কমিটি এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করত।

অডিট রিপোর্টে বলা হয়, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল একটি বৈশ্বিক চেইন হোটেল। হোটেলটির মূল মালিকানায় আছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড (বিএসএল)। আর হোটেল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ইন্টারকন্টিনেন্টাল গ্রুপ। বিএসএলের হিসাব শাখার রেজিস্ট্রার ও বিল-ভাউচার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল সংস্কারকাজে ৫৭৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। সংস্কারকাজ চলমান থাকায় ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত হোটেল বন্ধ ছিল। তখন কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়নি। হোটেল বন্ধ থাকায় ওই সময় কোনো অতিথি হোটেলে অবস্থান করেননি।

নিয়ম অনুযায়ী অতিথির কাছ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ আদায় করা হয়, সেই অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়। কিন্তু সংস্কারকাজের জন্য হোটেল বন্ধ থাকায় কোনো সার্ভিস চার্জ আদায় করা হয়নি। এ কারণে হোটেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সার্ভিস চার্জ প্রাপ্য হবেন না। কিন্তু বিএসএল কর্তৃপক্ষ হোটেল সংস্কারকাজের বাজেট থেকে সার্ভিস চার্জ বাবদ ২১ কোটি ৯১ লাখ ৭৪ হাজার ৬৯৮ টাকা দিয়েছে। এটি বিধিবিধান না মেনে করা হয়েছে। ফলে সার্ভিস চার্জের নামে প্রদেয় অর্থ ফিরিয়ে এনে তহবিলে জমা করতে হবে।

রিপোর্টে আরও বলা হয়, অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য বিএসএলের কাছে জবাব চেয়ে ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ও ২২ মার্চ নিরীক্ষিত প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীকে চিঠি দেওয়া হয়। বিএসএল তাদের জবাবে জানায়, দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অন্যত্র যোগ দিলে হোটেলে অভিজ্ঞ জনবলের জোগান দেওয়া কঠিন। বাংলাদেশের হসপিটালিটি সেক্টরে দক্ষ জনবলের সংখ্যা বেশি নয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির নিশ্চয়তাসহ বেতন-ভাতা ও সার্ভিস চার্জ দেওয়ার বিষয়টি বিএসএলের ৪১তম সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। এ কারণে তাদের সার্ভিস চার্জ দেওয়া হয়েছে।

বিএসএল যে জবাব দিয়েছে, তা নিষ্পত্তির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। পরে এ বিষয়ে ২০২২ সালের ২৩ জানুয়ারি বেসামরিক ও বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয় থেকে ২০২২ সালের ৪ এপ্রিল অডিট দলের কাছে পাঠানো জবাবে বলা হয়, বিএসএল কর্তৃক প্রদেয় সার্ভিস চার্জের অর্থ ফিরিয়ে আনা হবে। তবে এসব অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফেরত দিতে হবে না।

তবে বিএসএল ও মন্ত্রণালয় থেকে যে জবাব দেওয়া হয়েছে, তা অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য সহায়ক নয় উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়, ২০১৫ সালের ১০ মে থেকে ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে ৫৭৪ কোটি বাণিজ্যিক ঋণ নিয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের আধুনিকায়ন ও সংস্কার করা হয়। এই ঋণের টাকা অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের সুযোগ নেই। এই আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রদেয় অর্থ আদায় করতে বলা হয়। কিন্তু অর্থ আদায় না হওয়ায় এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অডিট প্রতিবেদন চলতি বছরের ৩ জুলাই রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসএলের কোম্পানি সেক্রেটারি এসএম তারিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএসএল পরিচালনায় ৯ সদস্যের একটি বোর্ড রয়েছে। বোর্ডের অনুমোদনক্রমেই সার্ভিস চার্জ দেওয়া হয়েছে। বোর্ড যেহেতু অনুমোদন দিয়েছে, সেহেতু এটা তছরুপ বলা যাবে না।’

সার্ভিস চার্জ গ্রহণের বিষয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন সভাপতি মো. মহসিনের বক্তব্য জানতে হোটেলে গিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে জুলাই বিপ্লবের কারণে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ব্যবসা প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। ফলে বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছে সরকারি মালিকানাধীন ঐতিহ্যবাহী এই হোটেল। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের অবস্থান রাজধানী ঢাকার শাহবাগে। গত জুলাই মাসে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের কোটা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগ এলাকা ছিল উত্তাল।

পরে এই আন্দোলন সহিংস ও গণ-আন্দোলনে রূপ নিলে শাহবাগ এবং এর আশপাশের এলাকা জুড়ে ব্যাপক ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলও এ সময় হামলার শিকার হয়। জুলাই-আগস্টে হোটেলটির ব্যবসায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। ফলে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের মালিকানা প্রতিষ্ঠান বিএসএল শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। তাই নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি তিন মাস পর প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়সহ আর্থিক প্রতিবেদন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে দাখিল করতে হয়। সে অনুযায়ী গত নভেম্বর মাসের শেষ দিকে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রতিষ্ঠানটি তাদের জুলাই-সেপ্টেম্বরের আর্থিক প্রতিবেদন পাঠায়।

সেই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল ৩০ কোটি টাকা লোকসান করেছে। গত বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ২০ কোটি টাকা। তবে ব্যাংকের সুদ আয় এবং হোটেলের আশপাশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া অফিস ভাড়ার আয় যুক্ত হওয়ায় লোকসান কিছুটা কমে।

আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোটেলটির মূল ব্যবসা থেকে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে আয় কমলেও খরচ কমেনি। এই তিন মাসে ২৩ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে পরিচালন খরচ হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রশাসনিক, ব্যাংকঋণের সুদ ও অন্যান্য খাতে খরচ হয়েছে ৪৪ কোটি টাকা।

পরিচালন, প্রশাসনিক, সুদ ও অন্যান্য খরচ বাবদ সব মিলিয়ে গত জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে হোটেলটির খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৫৮ কোটি টাকা। ফলে উল্লিখিত সময়ে পরিচালন লোকসান দাঁড়ায় ৩৫ কোটি টাকা, যা গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে ছিল ২৪ কোটি টাকা।