জ্যামাইকার সাবিনা পার্কে যখন উৎসব চলছে, বাংলাদেশে তখন গভীর রাত। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘুমোতে গেছে মানুষ। আজকাল ভালো খবরের বড্ড অভাব। দিন শুরু হয় নানাবিধ শঙ্কা নিয়ে। কিন্তু বুধবারের সকালটা ঠিক প্রতিদিনের মতো হলো না। মেহেদী হাসান মিরাজদের সৌজন্যে শীতের সকাল হয়ে উঠল ক্রিকেটময়। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সবাই জেনে গেল, ওয়েস্ট ইন্ডিজে ১৫ বছর পর টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ। সেটাও দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখিয়ে ১০১ রানের বড় ব্যবধানে। কুয়াশাছন্ন অরুণ প্রাতে টেস্ট জয়ী তরুণ দলকে অভিবাদন জানিয়েই দিন শুরু হলো বাংলাদেশে।
হাল আমলে ‘বিকল্প দেখান’ শব্দ দুটি বাংলাদেশে বেশ আলোচিত। বিকল্প না পাওয়ার ভয়ে পুরনোকে আঁকড়ে ধরে থাকার স্বভাবটাও হয়তো জাতিগত। ক্রিকেট দলও এর বাইরে নয়। এমন ক্রিকেটারও আছেন, স্রেফ ‘বিকল্প নেই’ বলে তাকে ম্যাচের পর ম্যাচ খেলিয়ে যেতে হয়। তিনিও দলকে ডোবাতে থাকেন। আসলে প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। তাই বিকল্প তৈরি হয়েই যায়। প্রয়োজন স্রেফ সুযোগের। একটু পিছিয়ে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে যাওয়া যাক। আইসিসি কর্তৃক দুর্নীতিকাণ্ডে নিষিদ্ধ সাকিব আল হাসানের শাসনামল শেষে বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক তখন মুমিনুল হক। তার নেতৃত্বেই নিউজিল্যান্ডে নিয়মিত সফরে গেল বাংলাদেশ। যেখানে কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়ানোই সম্ভব হয়নি, সেই মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে মুমিনুলরা জিতে গেলেন ৮ উইকেটে! দলে একমাত্র সিনিয়র ক্রিকেটার ছিলেন মুশফিকুরর রহিম, বাকিরা সবাই তরুণ। মুমিনুল শুধু মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টই জেতাননি, বাংলাদেশের ক্রিকেটে যুগান্তকারী এক পরিবর্তনও এনেছেন। আজীবনের স্পিননির্ভরতা কমিয়ে দলের বোলিং লাইন-আপে পেসারদের রাজত্ব কায়েম করেছেন। জাতীয় দলে এখন যে পেসারদের ছড়াছড়ি, তার সিংহভাগ কৃতিত্বই মুমিনুলের।
এরপর এলো কিছু ব্যর্থ সময়। তৎকালীন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের গ্যারেজে বদলে গেল নেতৃত্ব। মুমিনুলকে সরিয়ে ফের দায়িত্ব দেওয়া হলো সাকিবকে। এরপর ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে শোচনীয় ব্যর্থতা দলের জন্য বয়ে আনল কলঙ্ক। ক্রিকেটবোদ্ধারাও হতবাক হয়ে গেলেন, বাংলাদেশ তো এতটাও খারাপ দল নয়। বিশেষ করে ওয়ানডেতে। তাই আবারও ইতি ঘটল সাকিব যুগের। তিন ফরম্যাটের অধিনায়ক হয়ে গেলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। তার নেতৃত্বেই গত বছরের নভেম্বরে সিলেটের মাটিতে লাল বলে হার মানল নিউজিল্যান্ড। প্রমাণ হয়ে গেল, দুই বছর আগের মাউন্ট মঙ্গানুইয়ের জয়টা মোটেও অঘটন ছিল না। মজার ব্যাপার হলো, সিলেট টেস্টের বাংলাদেশ দলে সিনিয়র বলতে সেই মুশফিকুর রহিমই ছিলেন। বাকিরা ছিলেন পরবর্তী প্রজন্মের।
অধিনায়ক শান্ত আরও বিস্ময় জমিয়ে রেখেছিলেন দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য। দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের মাঝে শান্তর নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল গেল পাকিস্তান সফরে। যাদের বিপক্ষে কখনই টেস্ট জেতা হয়নি বাংলাদেশের, তাছাড়া পাকিস্তানের মাটিতে কোনো ফরম্যাটেই জয় ছিল না। এমন বিরুদ্ধ রেকর্ড নিয়েও রাওয়ালপিন্ডিতে পরপর দুই টেস্ট জিতে পাকিস্তানকে ধবলধোলাইয়ের লজ্জা দিল বাংলাদেশ! দুই সিনিয়র সাকিব-মুশফিকের মাঝে পারফর্ম করলেন কেবল মুশফিকই। অবশ্য দুই টেস্টে তার সংগৃহীত ২১৬ রানের মাঝে ১৯১ রানেরও একটা ইনিংস ছিল। তখন গণআন্দোলনে সদ্য সংসদ সদস্য পদ খোয়ানো সাকিব সিরিজুড়েই ছিলেন নিষ্প্রভ।
পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের আনন্দ বিরক্তিতে রূপ নিতে অবশ্য খুব একটা সময় লাগল না। পরের সিরিজেই ভারতের মাটিতে অসহায় আত্মসমর্পণ। এরপর দেশের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হোয়াইটওয়াশের লজ্জা। তীব্র সমালোচনা সইতে না পেরে নাজমুল হোসেন শান্ত নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু বিসিবি সভাপতি তাকে সেই সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে আনলেন। সমস্যার এখানেই শেষ নয়, আফগানিস্তানের কাছে ওয়ানডে সিরিজ হারে কপালে পড়ল চিন্তার ভাঁজ। হচ্ছেটা কী এসব? ওই সিরিজে শান্ত-মুশফিক-হৃদয়রা পড়লেন চোটে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর সামনে রেখে বিপদ আরও বেড়ে গেল। ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের নেতৃত্বে একেবারেই তরুণদের নিয়ে গড়া দল উড়াল দিল ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে। যে দেশে গত ১৫ বছরে টেস্ট জিততে পারেনি বাংলাদেশ, সেখানে এই দল নিয়ে কেউই হয়তো আশা করেনি। অ্যান্টিগায় প্রথম টেস্টে শোচনীয় পরাজয়টাও তাই অস্বাভাবিক মনে হয়নি। কিন্তু জ্যামাইকায় বদলে গেল দৃশ্যপট।
প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং ব্যর্থতার পর বোলাররা জ্বলে উঠলেন। অবশ্য দলের বোলাররা নিয়মিতই ভালো করে যাচ্ছেন, আর ডোবাচ্ছেন ব্যাটাররা। জ্যামাইকায় বাংলাদেশের ব্যাটারদের কেউ কেউ হয়তো পণ করলেন রুখে দাঁড়ানোর। তাই দ্বিতীয় ইনিংসে জাকের আলীরা ওয়ানডে স্টাইলে স্কোর বড় করার মিশনে নামলেন। লিড বড় হওয়ায় বেড়ে গেল বোলারদের আত্মবিশ্বাস। পনের বছর পর দেশের মাটিতে বাংলাদেশের কাছে লাল বলে ধরাশায়ী হলো পূর্ণশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বাংলাদেশে এলো অন্যরকম এক ভোর। বিজয়ের আনন্দে হাসিমুখে কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়ল মানুষ।