যেমন পুলিশ চাই

পুলিশ জনগণের বন্ধু বলা হলেও, বাংলাদেশের একটা বড় অংশের মানুষের কাছেই পুলিশ যেন ত্রাসের নাম। এমনকি কেউ কেউ রসিকতা করে এও বলেন, বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা আর পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা। জনগণের রক্ষক যাদের হওয়ার কথা তারাই হয়রানিকারী এবং বিভীষিকা হিসেবে চিত্রিত হন অনেকের মনে। এই ধারার চরম প্রকাশ দেখা যায় বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে। রাজনৈতিক ফায়দার জন্য পুলিশকে রীতিমতো পেটোয়া বাহিনীতে পরিণত করা হয়। যেকোনো রাজনৈতিক হয়রানি তো বটেই, চাঁদাবাজির সঙ্গেও ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পাওয়া যায় পুলিশের নামে। অবশ্য, সব কিছু ছাপিয়ে যায় জুলাই গণ-আন্দোলনের সময়, যখন পুলিশ জনতাকে দমাতে গুলি ছোড়ে এবং বহু মানুষকে হত্যা করে। পুলিশের এই আচরণের ফলে জনতার কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

অথচ দেশের স্থিতিশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ বাহিনী লাগবেই। এমতাবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম কাজ হয়ে দাঁড়ায় পুলিশের সংস্কার। অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের লক্ষ্যে ‘পুলিশ সংস্কার কমিশন’ গঠন করেছে, যার কার্যক্রম চলমান। পুলিশ সংস্কার কমিশন সর্বসাধারণের মতামত জানতে ‘কেমন পুলিশ চাই’ শিরোনামে জনমত জরিপ পরিচালনা করে। গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য সচিব আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এই ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে, যা পুলিশ সংস্কার কমিশনের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে। জনমত জরিপে ২৪ হাজার ৪৪২ জন অংশ নিয়েছেন। যার মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী চাকরিজীবী। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অংশ নিয়েছেন ছাত্ররা, তাদের অংশগ্রহণ ২৭ দশমিক ২ শতাংশ।

জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংস্কারের মাধ্যমে কেমন পুলিশ দেখতে চান এমন প্রশ্নের উত্তরে সবচেয়ে বেশি মতামত এসেছে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ চাওয়ার ক্ষেত্রে। ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষই চেয়েছেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ। নিরপেক্ষ ও আইনের শাসনে অনুগত পুলিশ চেয়েছেন ৮৬ দশমিক ২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী এবং দুর্নীতিমুক্ত পুলিশ দাবি করেছেন ৮৪ ভাগ মানুষ। কোন কোন ক্ষেত্রে সংস্কার জরুরি মনে করেন এমন প্রশ্নে পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অবসান চান ৮৯ দশমিক ৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। ক্ষমতার অপব্যবহার করে পুলিশের দুর্নীতি বন্ধ চান ৭৭ দশমিক ৯  শতাংশ মানুষ। এ ছাড়া গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বিবেচনায় অপরাধী পুলিশকে শাস্তির আওতায় আনার পক্ষে মত দিয়েছেন ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা। এই জরিপে শতকরা ৯৫ ভাগই গায়েবি মামলা থেকে মুক্ত হওয়ার আকাক্সক্ষা পোষণ করেছেন। গায়েবি বা অজ্ঞাতনামা মামলা পুলিশের অন্যতম হয়রানির অস্ত্র। গায়েবি মামলার অপব্যবহার বন্ধে মামলা রুজুর ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ১৮৯৮ ধারা সংস্কার চান কি না এমন প্রশ্নে ৯৫ ভাগ উত্তরদাতাই সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন।

৮২ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারাকে অপব্যবহারযোগ্য বলে মনে করেন। ৪৬ শতাংশ উত্তরদাতা এই ধারাটির যুগোপযোগী সংস্কার চান। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭ ধারায় পুলিশ হেফাজতে বা রিমান্ডে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের ধারাটি সংশোধন ও সংস্কার চান প্রায় ৯২ শতাংশ উত্তরদাতা। এ ছাড়া তল্লাশির সময় পুলিশ পরিচয় দিতে অস্বীকার করলে বা বিনা ওয়ারেন্টে তল্লাশি করতে চাইলে তার প্রতিকারের একটি কার্যকর কল সার্ভিস চালুর পক্ষে মত দেন ৮৭ শতাংশ উত্তরদাতা। পুলিশের বিরুদ্ধে নানা রকমের ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভালো কাজের জন্য পুরস্কারের মতও উঠে এসেছে। মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুগত পুলিশ সদস্যদের উৎসাহিত করতে বার্ষিক কর্মমূল্যায়নের পুরস্কার এবং তিরস্কারের ব্যবস্থা রাখার পক্ষে মত দেন ৪৮ শতাংশ উত্তরদাতা। রাজধানীতে সভা-সমাবেশ আয়োজনের আগে পুলিশ কমিশনারের অনুমতি গ্রহণকে মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী বলে মনে করেন প্রায় ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা।

ঔপনিবেশিক সময়কাল থেকেই এই অঞ্চলে পুলিশকে দমনের কাজে ব্যবহার করেছে শাসকগোষ্ঠী। এর ধারা এখনো অব্যাহত। সন্দেহ নেই যে, অপরাধ দমনে পুলিশকে ক্ষমতাশালী করতে হবে। তবে পুলিশের মূল উদ্দেশ্য জনতার স্বার্থরক্ষা করা, রাজনীতিবিদদের স্বার্থে জনগণের বিরুদ্ধে যাওয়া নয়। ফলে পুলিশের আমূল সংস্কার খুবই জরুরি।