গ্রাহকের স্বস্তি ব্যবসায় অস্থিরতা

ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই অংশ হিসেবে সর্বশেষ টাকা ছাপিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দিয়েছে। যদিও গভর্নরের সিদ্ধান্ত ছিল টাকা না ছাপানোর। এতে নতুন টাকা সরবরাহের পর দুর্বল ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরছে। তবে অস্বস্তি কাটেনি ব্যবসায়ীদের। উচ্চ—সুদহারের কারণে অস্থিরতা বিরাজ করছে শিল্প মালিকদের মধ্যে।

মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে কয়েক দফা নীতি সুদহার বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্প্রতি বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ক্রেডিট কার্ডের সুদও। যেটি কার্যকর হবে আগামী ১ জানুয়ারি থেকে। এতে চাপ বাড়বে ব্যবহারকারীদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুদহার বাড়িয়ে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সরকারকে নিত্যপণ্যের বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে মনোযোগ দিতে হবে।

ব্যাংকগুলোতে দেখা যায়, চাহিদা মতো টাকা না পেলেও আগের মতো ফেরত যেতে হচ্ছে না অধিকাংশ গ্রাহককে। গত নভেম্বর মাসের শেষ দিকে টাকা ছাপিয়ে দুর্বল ছয় ব্যাংকে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা ধার দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর নিশ্চিত করে বলেছিলেন, ছয়টি দুর্বল ব্যাংককে ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সহায়তা দেওয়া হয়েছে, প্রয়োজনে আরও দেওয়া হবে। ডিসেম্বর থেকে কোনো গ্রাহক ব্যাংক থেকে টাকা না পেয়ে ফেরত যাবেন না।

গভর্নরের বক্তব্যের প্রতিফলন গত রবিবার খুব একটা পাওয়া না গেলেও গত সোম ও মঙ্গলবার দুর্বল ব্যাংকগুলোতে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। বন্ধ থাকা এটিএম বুথ থেকে স্বল্প পরিমাণে হলেও টাকা তুলতে পারছেন গ্রাহকরা। মঙ্গলবার তারল্য সহায়তা পাওয়া রাজধানীর মতিঝিল, দিলকুশা, পল্টনের বিভিন্ন শাখায় গিয়ে গ্রাহকদের টাকা তুলতে দেখা যায়।

গ্রাহককে টাকা দিতে না পারায় বেশ চাপে ছিল ফাস্টর্ সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। রাজধানীর তোপখানা রোডে ব্যাংকটির একটি শাখায় দেখা যায় লেনদেনে কিছুটা ছন্দ ফিরেছে। এ ব্যাংকে টাকা তুলতে আসা গ্রাহক তোফাজ্জল বলেন, ১০ হাজার টাকা তুলতে পেরেছি। এর আগে পাঁচ হাজারের বেশি তোলা যাচ্ছিল না। আরেক গ্রাহক জামান বলেন, দুটো চেকে ২০ হাজার টাকা তুলেছি। কয়েকজনকে ৩০—৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত তুলতে দেখলাম।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, শাখাগুলোতে লেনদেন এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। যাদের বেশি সমস্যা তাদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ৫০ লাখ টাকারও চেকে আমরা দিয়েছি। আবার আমানত সংগ্রহও চলছে। স¤প্রতি আমরা ২ হাজার ১০০ কোটি টাকার ডিপোজিট সংগ্রহ করেছি। ব্যাংকটির চাপে থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, মূলত গ্রাহকদের মধ্যে একটা ভয় সৃষ্টি হয়েছিল। এখন তা কাটছে। সব গ্রাহক যদি এক সঙ্গে টাকা তুলতে আসেন কোনো ব্যাংকই এক সঙ্গে টাকা দিতে পারবে না। তাই গ্রাহকদের অনুরোধ অপ্রয়োজনে যেন টাকা না তোলেন।

এক্সিম ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় দেখা যায়, বেশ কিছু গ্রাহক লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। জমার কাউন্টারে খুব একটা গ্রাহক না থাকলেও টাকা তোলার জন্য অপেক্ষা করছেন অনেকে। টাকার পরিমাণ বেশি হলে যাচ্ছেন ম্যানেজারের কাছে। টাকা তুলতে আসা জাহিদ বলেন, ২০ হাজার টাকা তুলেছি। কোনো সমস্যা হয়নি। আনিসুর নামে আরেক গ্রাহক বলেন, ১ লাখ টাকা তোলার জন্য এসেছি। কাউন্টার থেকে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতে বলল। তাই আরেকজনকে পাঠিয়েছি ম্যানেজারের কাছে।

এই শাখার ম্যানেজার আজহার উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের লেনদেন স্বাভাবিক আছে। আমরা আমাদের নিজেদের শাখার পাশাপাশি অন্যান্য শাখায় যাদের অ্যাকাউন্ট তাদেরও টাকা দিচ্ছি। ১ লাখ টাকার ওপরেও টাকা তুলে নিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। কয়েক দিন আগে গ্রাহকদের মধ্যে একটা প্যানিক তৈরি হয়েছিল। অনেক গ্রাহক একসঙ্গে টাকা তুলতে আসায় তারল্য সংকট দেখা দিয়েছিল। এখন সেটা স্বাভাবিক হচ্ছে। আমাদের এটিএম বুথগুলোতেও ১০ হাজার করে টাকা তোলা যাচ্ছে।

এদিকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে গত ২২ অক্টোবর নীতি সুদহার বা রেপো রেট আরও ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২২ সালের মে মাসের পর থেকে এই নিয়ে এগারো বারের মতো নীতি সুদহার বাড়ানো হলো। এতে ব্যাংকঋণের সুদহার বাড়ছে। ইতিমধ্যে সুদের হার প্রায় ১৬ শতাংশে উঠেছে।

সুদের হার বাড়ায় ছোট—বড় সব খাতের ব্যবসায়ীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ সুদের হার বৃদ্ধি মানে ঋণের কিস্তির অঙ্কও বেড়ে যাওয়া। এমনিতেই ডলার ও গ্যাস—বিদ্যুতের সংকটসহ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শিল্পোৎপাদন ও ব্যবসা—বাণিজ্য কমে গেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা স¤প্রসারণে আস্থা পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থায় ক্রমাগত সুদহার বৃদ্ধিতে নিদারুণ চাপে পড়েছেন তারা। সব মিলিয়ে এরই মধ্যে কমে গেছে শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলা। বেসরকারি ঋণে চলছে ধীরগতি, বিনিয়োগে নেমে এসেছে এক প্রকার স্থবিরতা। এর প্রভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলারের উচ্চমূল্য ও গ্যাস—বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে এমনিতেই ব্যবসার খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া গত কয়েক মাসের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে গত দুই মাস সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী ও গাজীপুরের পুরো শিল্পাঞ্চলে চরম অস্থিরতা ছিল। এর মধ্যেই দফায় দফায় সুদের হার বৃদ্ধি সংকট আরও বাড়িয়েছে। এভাবে সুদহার বাড়তে থাকলে অনেকের পক্ষে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে বিনিয়োগ কমে শিল্পায়নও বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়বে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মো. হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুদের হার যেভাবে বাড়ছে তাতে ব্যবসায় টিকে থাকা অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও ডলার সংকট, গ্যাস সংকট তো রয়েছেই। ১৫—১৬ শতাংশ সুদ দিয়ে নতুন করে কেউ বিনিয়োগ করতে চাইবে না। অনেকেই আছেন যাদের ২০ শতাংশ সুদ হলেও কোনো সমস্যা নেই। কারণ তাদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে লোন নিয়ে আর ফেরত না দেওয়া। আমরা গভর্নরের সঙ্গে একাধিকবার বসেছি। তিনি আমাদের কাছে ৬ মাস সময় চেয়েছেন।

এদিকে প্রায় চার বছর পর ক্রেডিট কার্ডেরও সুদহার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন বছর থেকে কোনো ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশের বেশি সুদ নিতে পারবে। এর আগে যেটা ২০ শতাংশ ছিল আর ক্রেডিট কার্ডে সুদ আরোপ শুরু হবে ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত সময়ের পর। সাধারণত ক্রেডিট কার্ডকে সচ্ছলদের কার্ড হিসেবেই দেখা হয়। এতে ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটায় চাপ আরও বাড়বে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে এটি বড় ধাক্কা।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ব্যাংকগুলোর ঋণযোগ্য তহবিল নিশ্চিত করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ক্রেডিট কার্ডের সুদহার বাড়ানো নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। রাজধানীর মুগদা এলাকার একজন ব্যবসায়ী সোহরাব হাসান। তিনি বলেন, আমি নিয়মিত ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কিছু পেমেন্ট করি। এমনিতেই বিভিন্ন চার্জ দেখিয়ে বিভিন্ন সময় টাকা কেটে নেয়। তার ওপর সুদহার বাড়াল। এটা আমাদের জন্য বাড়তি বোঝা।

বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মাইদুল। তার ভাষ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা দিতে দেরি-আমাদের কাছে ২৫ শতাংশ সুদের মেসেজ আসতে দেরি নেই। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে সর্বোচ্চ ২৫ পার্সেন্ট নিতে পারবে। কিন্তু তারা সর্বোচ্চটাই নিতে মেসেজ দিচ্ছে।      
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এজন্য দরকার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আবদুল আউয়াল সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশের যে মূল্যস্ফীতি সেটা সুদহার বাড়িয়ে বা টাকার প্রবাহ কমিয়ে বন্ধ করা যাবে না। কারণ সুদহার বাড়িয়ে ঋণের প্রবাহ আসলে খুব একটা কমে না। আমাদের মূল সমস্যা বাজার ব্যবস্থাপনা। সব জায়গায় অসাধু সিন্ডিকেট চক্র। আমাদের মূল সমস্যা সমাধান করতে হবে।