এ যুগে সন্তান লালন-পালন করা মা-বাবাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েরা এখন মা-বাবার কোনো কথা মানছে না। তারা সারাক্ষণ ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিতে আসক্ত হয়ে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ঠিকমতো পড়ালেখা করতে চাইছে না। শুধু সারাক্ষণ বাইরে ঘোরাফেরা করতে চাইছে। আবার কর্মব্যস্ত মা-বাবারা চাইলেও সন্তানের পেছনে যথেষ্ট সময় দিতে পারছেন না। এতে অনেক ছেলে-মেয়ে বখে যাচ্ছে। অনেকে কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অন্যায় ও অসামাজিক কার্যকলাপেও জড়িয়ে পড়ছে। এতে মা-বাবারই সুনাম নষ্ট হচ্ছে। এমনকি সন্তানই তার আপন মাকে হত্যা করতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। ছাড়ছে না জন্মদাতা বাবাকে হত্যা করতেও। এমনই এক ভয়াবহ দুঃসময়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমাদের। গবেষকদের মতে, পারিবারিক শিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষা না থাকার কারণেই আমাদের সন্তানরা বখে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে আমাদের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! জাহান্নামের আগুন থেকে তোমরা নিজেরা বাঁচো এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে বাঁচাও।’ (সুরা তাহরিম ৬)
এ আয়াতটি অবতীর্ণ হলে ওমর (রা.) বললেন, আমরা তো নিজেরা বাঁচতে পারি। কিন্তু আমাদের পরিবার-পরিজনকে কীভাবে বাঁচাব? রাসুল (সা.) বললেন, আল্লাহতায়ালা তোমাদের যেসব বিষয়ে নিষেধ করেছেন, তোমরা তাদের সেসব বিষয়ে নিষেধ করো এবং যেসব বিষয়ে আদেশ করেছেন, তোমরা তাদের সেসব বিষয়ে আদেশ করো, যা তাদের ও জাহান্নামের মাঝে প্রতিবন্ধক হবে। (তাফসিরে রুহুল মাআনি ২৮/৪৯৬) আলী (রা.) এ আয়াতের তাফসিরে বলেন, তোমরা নিজেরা উত্তম বিষয় শিক্ষা করো এবং তাদের (পরিবার-পরিজন) উত্তম বিষয় শিক্ষা দাও। (মুসতাদরাকে হাকিম ৩৮৬২)
উল্লিখিত আয়াত, হাদিস ও তাফসির থেকে এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, পরিবারের লোকদের প্রয়োজনীয় দ্বীনি জ্ঞান এবং নৈতিক শিক্ষা দান করা প্রত্যেক অভিভাবকের কর্তব্য। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেককে তার নিজ অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পুরুষ তার পরিবার-পরিজনদের দায়িত্বশীল। কাজেই সে তাদের বিষয়ে (তার দায়িত্ব পালন সম্পর্কে) জিজ্ঞাসিত হবে। একজন স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের এবং তার সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল। কাজেই তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি)
বিখ্যাত মুহাদ্দিস, মোল্লা আলী কারী (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, একজন স্ত্রীকেও হাশরের দিন তার স্বামী-সন্তানের অধিকারের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে। অতএব এ হাদিসের দাবি হলো, সন্তানাদি ও পরিবার-পরিজনের অধিকার আদায়ে সচেতনতা অবলম্বন করা। আর হাদিসে একজন বাবার জন্য তার সন্তানকে শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া বড় উপহার স্বরূপ এবং আল্লাহর রাস্তায় দান-সদকা করার চেয়ে উত্তম বলা হয়েছে।
ইমাম বাইহাকি তার শুআবুল ইমান কিতাবে উল্লেখ করেছেন, রাসুল (সা.) বলেন, যার কোনো সন্তান হলো সে যেন তার সুন্দর নাম রাখে এবং উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়। সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাকে বিয়ে দেবে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সন্তানকে যদি বিয়ে না দেয় এবং সে পাপে লিপ্ত হয়, তাহলে বাবা গুনাহগার হবে।
এ হাদিস থেকেও বোঝা গেল, সন্তানের ওপর তার অভিভাবকের দায়িত্ব ও কর্তব্য মূলত কী? এখান থেকেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া থেকে নিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক পর্যন্ত এবং যথাসময়ে ছেলে-মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করানো একজন অভিভাবকের দায়িত্ব ও আবশ্যকীয় কর্তব্য। সুতরাং অশান্তি থেকে মুক্তি, পরকালীন জবাবদিহি থেকে বাঁচতে এবং জান্নাতের পথ সুগম করতে সন্তানের জন্য আদর্শ ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা, তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা একজন অভিভাবকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আল্লাহতায়ালা আমাদের সেই দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে আদায় করার তওফিক দান করুন। আমিন।