চৈ চৈ

বিশ্বজিৎ দাস ‘আয় চৈ চৈ।’ ছাদে উঠে জোরে জোরে ডাক দিলেন মাসুদ হোসেন।

কোনো সাড়া পেলেন না। কয়েকদিন বাসায় ছিলেন না। ঢাকায় গিয়েছিলেন একটা কাজে।

দূরে গেলেও মন পড়েছিল বাসার ছাদে। সেখানে ছোট্ট বাসায় গাদাগাদি করে থাকে বারোটা কবুতর।

প্রথমে এনেছিলেন দুটো। সেই কবুতর বাড়তে বাড়তে এখন বারোটা।

প্রতিদিন সকাল-বিকাল নিয়ম করে কবুতরগুলোকে খাবার খেতে দেন তিনি।

ঢাকায় গিয়েও তাই মন পড়েছিল বাসার ছাদে। ওরা ঠিকমতো খাবার পাচ্ছে তো?

‘আয় আয়। চৈ চৈ।’ আবার ডাকলেন তিনি।

কোনো কবুতর খেতে এলো না।

ব্যাপার কী!

আশপাশে খুঁজলেন তিনি। পেলেন না। ছাদে কোনো কবুতরই নেই!

‘আয় চৈ চৈ।’ একটু জোরে ডাকলেন তিনি। পাশের বাসায় হয়তো বেড়াতে গেছে কবুতরগুলো ভাবলেন।

নিচে নেমে এলেন মাসুদ হোসেন।

‘চুমকির মা, চুমকির মা! কবুতরগুলো দেখছি না যে! কোথায় ওরা?’

চুমকির মা রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিলেন। কোনো কথা বললেন না।

‘চুমকি তুই কিছু জানিস?’ মেয়ের কাছে জানতে চাইলেন মাসুদ।

চুমকিও কোনো কথা বলল না।

‘কীরে! কথা বলছিস না কেন?’

ধমক খেয়ে কাজ হলো মনে হয়। চোখের ইশারায় মাকে দেখিয়ে দিল মেয়ে।

‘কী গো কথা বলছ না কেন? কবুতরগুলো

কোথায়?’

‘সব বিক্রি করে দিয়েছি।’ মুখ ঝামটি দিয়ে বললেন চুমকির মা।

‘বিক্রি করে দিয়েছ! কেন?’

‘ওরা খালি যন্ত্রণা দেয়।’

‘যন্ত্রণা! ওই নিরীহ পাখিগুলো তোমাকে আবার কী যন্ত্রণা দিল? খামচে দিয়েছে, ঠোকর দিয়েছে?’

‘খামচেও দেয়নি, ঠোকরও দেয়নি। ঘরের মধ্যে এসে ঘোরাঘুরি করেছে। বিছানায় পায়খানা করেছে। সে জন্যই একেবারে ওদের বিদায় করে দিয়েছি।’

ভীষণ মন খারাপ হলো মাসুদ হোসেনের। ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। একরাশ অভিমান জমা হলো মনের ভেতরে।

‘বাবা।’ ফিসফিস করে ডাকল কে যেন।

ফিরে তাকালেন মাসুদ।

চুমকি।

‘কী রে মা, কিছু বলবি?’

জবাবে মুখে আঙুল দিয়ে চুপ থাকার ইশারা করল মেয়ে।

হাতছানি দিয়ে ডাকল।

কৌতূহল হলো মাসুদের। চুমকির পিছু পিছু গেলেন তিনি।

বাসার পেছনে একটা বসার জায়গা আছে। ওপরে ছাউনি।

সেখান থেকে একটা খাঁচা নামাল চুমকি।

মাসুদ হোসেন অবাক হয়ে দেখলেন একজোড়া কবুতর।

‘কোথায় পেলি?’

‘কিনেছি।’

‘টাকা কোথায় পেয়েছিস?’

‘মা কবুতর বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছিল, সেই টাকা থেকে কিছু টাকা চুপ করে নিয়েছি। মা টের পায়নি।’

‘শাবাশ!’ মুখ ফসকে বলে ফেললেন মাসুদ।

খাঁচাসহ হাঁটতে শুরু করলেন তিনি।

‘কই যাও বাবা?’

‘ছাদে যাই। কবুতরের ঘর তো ওখানেই।’

‘মা দেখবে কিন্তু।’

‘দেখুক।’

চুমকির মা কবুতরের খাঁচা দেখামাত্র রেগে গেলেন।

‘আবার কবুতর! আজই বাবা-মেয়েকে কবুতর জবাই করে খাওয়াব।’

‘আচ্ছা, কবুতর দেখে রাগ করার কী আছে! যখন ছোট ছিলে তখন কি তুমি কোনো প্রাণীকে পোষোনি?’

গজগজ করছিলেন, স্বামীর কথা শুনে থমকে গেলেন চুমকির মা।

‘চুপ করে রইলে কেন?’

‘আমি এই রকম অপরিষ্কার প্রাণী পুষতাম না।’ গলার স্বর নরম করে বললেন চুমকির মা।

‘কোন প্রাণী পুষতে?’

‘বিড়াল। আমার একটা সাদা রঙের বিড়াল ছিল। খুব সুন্দর।’

মাসুদ হোসেন হাসতে শুরু করলেন।

‘হাসছ কেন?’

‘এইবার বুঝলাম, কেন তুমি কবুতরকে সহ্য করতে পার না।’

‘মানে!’

‘বুঝলি চুমকি, তোর মায়ের কাছে কেন কবুতর দুচোখের বিষ? তোর মায়ের প্রিয় প্রাণী বিড়াল। আর বিড়াল তো কবুতর দেখলেই ধরে খেয়ে ফেলে। এখন বিড়াল নেই। কিন্তু বিড়াল তার স্বভাব রেখে গেছে তোর মায়ের মধ্যে।’

হাততালি দিল চুমকি।

চুমকির মা হেসে দিলেন।

‘আচ্ছা যাও, বাপ-বেটি মিলে বেশি করে চৈ চৈ পালন করো। আর কিছু বলব না।’