আবারও খোলা ম্যানহোলের যুগ!

সড়কের মাঝখানে খোলা ম্যানহোলে রাখা বাঁশের খুঁটিতে ঝুলছে রঙবেরঙের পুরনো কাপড় বা বস্তা। কোথাও আবার সড়কের মধ্যে খোলা ম্যানহোলের আগে-পরে রাখা ফুলের টব, ইটের স্তূপ বা অন্য কোনো প্রতিবন্ধক। এমন চিত্র এখন রাজধানীর অধিকাংশ সড়কের। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলির সড়কে একের পর এক চুরি যাচ্ছে ম্যানহোলের ঢাকনা। এসব ম্যানহোলে পড়ে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। এর আগেও খোলা ম্যানহোলে পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সড়কে সড়কে এমন বহু খোলা ম্যানহোল ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিটি করপোরেশন। তাই বাধ্য হয়ে এলাকার লোকজন নিজ উদ্যোগে খোলা ম্যানহোলে বাঁশের খুঁটি পুঁতে চেষ্টা চালাচ্ছে দুর্ঘটনা রোধের।     

পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের খোলা পাইপে পড়ে শিশু জিহাদের মৃত্যু কিংবা জার্মান কূটনীতিকের ম্যানহোলে পড়ে আহত হওয়ার মতো ঘটনা সবাইকে নাড়া দিলেও খোলা ম্যানহোল নিয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই সিটি করপোরেশনের। সম্প্রতি গুলিস্তান, পল্টন, শাহবাগ, মগবাজার, কাকরাইল, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ডেমরা, রামপুরা, মীর হাজীরবাগ ও পুরান ঢাকার নারিন্দাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঢাকনাবিহীন শতাধিক ম্যানহোল দেখা গেছে। সড়কের মাঝখানে থাকা এসব ম্যানহোলের বড় গর্তের চারপাশ দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় মানুষ ও যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের বেলা এসব ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা যেসব এলাকায় তুলানমূলক কম, সেখানে ছিঁচকে চোর ও মাদকসেবীরা ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে বিক্রি করে দিচ্ছে। আগেও এই সমস্যা থাকলেও সম্প্রতি তা প্রকট আকার নিয়েছে। আর সিটি করপোরেশন তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এলাকাবাসী নিজ উদ্যোগে খুঁটি পুঁতে দুর্ঘটনা ঠেকানোর চেষ্টা করছে।

২০১৪ সালে রাজধানীর শাহজাহানপুরে পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের খোলা পাইপে পড়ে মারা যায় শিশু জিহাদ। সে সময় ঘটনাটি দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ২০১৭ সালের মার্চে রাজধানীর পল্টন এলাকায় খোলা ম্যানহোলে পড়ে একজনের মৃত্যু হয়। ২০২২ সালের ২১ নভেম্বর রাজধানীর অভিজাত এলাকা খ্যাত গুলশানের ৮০ নম্বর সড়কের একটি ম্যানহোলে পড়ে যান বাংলাদেশে জার্মান দূতাবাসের ডেপুটি হেড অফ মিশন জ্যান জ্যানোস্কি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তখন তার পায়ের একটি ছবি যুক্ত করে তিনি লিখেন, ‘আমি রাস্তায় অতিরিক্ত মনোযোগ দিই।’ অর্থাৎ এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ার পরও ম্যানহোলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর একটু বেখায়াল হলে তো কথাই নেই। কাকরাইলের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পাশের ফুটপাতে কথা হয় গৃহিণী শাহানা খাতুনের সঙ্গে। মূল সড়কে ম্যানহোলের ঢাকনার চারপাশে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ রড দেখিয়ে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এদিক দিয়ে প্রতিদিন মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যাই। বাচ্চারা অনেক সময় নিজেরা দৌড় দেয়। এগুলো দেখলে খুব ভয় লাগে। অনেক বড় প্রকল্পের প্রয়োজন নেই, সরকারকে বলব অন্তত মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।’

পুরান ঢাকার নারিন্দা এলাকার শাহ সাহেব লেনে সড়কের মাঝখানে খোলা ম্যানহোলে বাঁশের খুঁটিতে কাপড় টাঙিয়ে রাখতে দেখা গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত মাসের শুরুতে হঠাৎ করে ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা দেখতে পান তারা। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা নিজেরাই বাঁশের মাথায় কাপড় দিয়ে রেখেছেন। যাতে অসতর্ক অবস্থায় কেউ এলে তা দেখতে পান।

ব্যবসায়ী আহমদ হোসেন বলেন, ‘এই সড়কে বাচ্চা থেকে শুরু করে সবাই চলাচল করে। প্রতিবন্ধী নাগরিকও আছেন। একজন মানুষ পড়ে আহত হলে দায় নেবে কে?  আগে কাউন্সিলর ছিল। আমরা অভিযোগ করতে পারতাম, গালি দিতে পারতাম। কিন্তু এখন কাকে কী বলব? কোথায় গিয়ে বলতে হবে তাও জানি না।’

খোলা ম্যানহোল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. নাইম বলেন, ‘শাহবাগ থেকে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ এলাকায় বেশ কয়েক জায়গায় ম্যানহোলের ঢাকনা নেই। অথচ এটি রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাফেরা করে।’

রাজধানীর মগবাজার ও ইস্কাটন এলাকায়ও গত কয়েক মাসে একের পর এক চুরি হচ্ছে ম্যানহোলের ঢাকনা। মগবাজার এলাকার একটি মোটরপার্টস দোকানের মালিক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমার দোকানের আশপাশ থেকে গত মাসে তিনটি ঢাকনা রাতে চুরি করে নিয়ে গেছে। আমরা ব্যবসায়ীরা নিজেদের উদ্যোগে কাঠ দিয়ে ঢাকনা বানিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো ঢাকার চেষ্টা করছি। কিন্তু এগুলো তো আর আমাদের একার পক্ষ সম্ভব না। সিটি করপোরেশনের লোকগুলোকে আগের মতো তৎপর হতে দেখা যায় না। তাছাড়া এসব ঢাকনা যারা চুরি করে বিক্রি করে তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত। তাহলে আর ঢাকনা কেউ নিয়ে যেতে পারবে না।’

ডেমরা এলাকার একটি সড়কে এক কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ৭টি ম্যানহোলের ঢাকনা নেই বলে জানান সেখানকার বাসিন্দা মো. জয়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করার সময় দেখছি ম্যানহোলের ঢাকনাগুলো কারা যেন নিয়ে যাচ্ছে। আর এসব জায়গায় শুধুমাত্র বাঁশ দিয়ে চিহ্ন রাখা হয়েছে। কিন্তু রাতে চলাচল করার সময় কিন্তু বুঝা যায় না সেখানে কিছু আছে কি না। আর মাসের পর মাস চলে গেলেও এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এবং ঢাকা ওয়াসার প্রায় ৮০ হাজার ম্যানহোল ছিল। তবে ২০২০ সালে খাল ও ড্রেন সিটি করপোরেশনে হস্তান্তর করায় ঢাকা ওয়াসার ম্যানহোলগুলো এখন দুই সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে। চুরি হয়ে যাওয়া ছাড়াও কিছু কিছু জায়গায় ম্যানহোলের ঢাকনা ভেঙেও গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ম্যানহোলের ঢাকনা মূলত দুই কারণে ভেঙে যাচ্ছে। প্রথমত, ঠিকাদাররা অনেক সময় নিম্নমানের ঢাকনা সরবরাহ করেন। দ্বিতীয়ত, ঢাকার সড়কগুলোতে অতিরিক্ত গাড়ি চলাচল করছে। অনেক সময় ওভারলোড (অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি পরিমাণ মালামাল বহন) গাড়িও চলাচল করে। এতে অনেক ম্যানহোল ভেঙে পড়ে। তাছাড়া গভীর রাতে মাদকসেবীরা অনেক ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে নিয়ে যায়।

যেকোনো নগরীর জন্য খোলা ম্যানহোল একটি বড় সমস্যা বলে মনে করেন নগর বিশেষজ্ঞরা। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটাকে অনেকেই ছোট সমস্যা মনে করেন। কিন্তু এটা যেকোনো শহরের জন্য অনেক বড় সমস্যা। প্রতিনিয়ত অনেক দুর্ঘটনা ঘটে, কিন্তু সব খবরে আসে না। যে কারণে আমরাও সব জানতে পারি না।’

এই নগর বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘ম্যানহোলগুলোতে সিটি করপোরেশন কিংবা ওয়াসার মনিটরিং নেই। তারা এটাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। সিটি করপোরেশন চাইলে প্রতিদিন পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মাধ্যমে ম্যানহোলের হালনাগাদ তথ্য নিতে পারে। এই সমস্যা নিরসনে ওয়ার্ড কাউন্সিল অফিসকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। তাছাড়া কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে অনেক বড় জরিমানা করতে হবে। যাতে তারা সতর্ক থাকে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. মকবুল হোসাইন বলেন, ‘কিছুদিন আগে মোহাম্মদপুর এলাকায় একসঙ্গে অনেকগুলো ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হয়েছিল। আমরা খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো ঠিক করেছি। যেসব এলাকা থেকে খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। নতুন ঢাকনা লাগানো হচ্ছে, আবার অনেক জায়গায় মেরামতও করছি।’