‘টোকেন বাণিজ্য’ ফেরাতে গণপরিবহনে গণমামলা!

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রাষ্ট্রক্ষমতার পটপরিবর্তনের আগে রাজধানীর গণপরিবহনে টোকেন বাণিজ্যসহ (মাসিক নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে সড়কে অবৈধ যান চলাচলের সুযোগ) নানা অনিয়মের অভিযোগ ছিল ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজধানীতে ট্রাফিক পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা টোকেন দিয়ে চাঁদা তুলতেন। বিশেষ করে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ফিটনেসবিহীন বাস ও রুট পারমিটবিহীন সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে তারা মাসিক হিসেবে টাকা নিতেন। তবে সরকার পরিবর্তনের পর তিন মাসের বেশি সময় ধরে বেশিরভাগ জায়গায় বন্ধ আছে এই টাকা তোলা। অবশ্য দিন যত যাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ফের ‘টোকেন বাণিজ্য’ চালুর জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যার অংশ হিসেবে ভীতি ছড়াতে গণপরিবহনের বিরুদ্ধে গণহারে মামলা দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছেন পরিবহন খাত-সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, আগে ছোটখাটো অনেক ত্রুটির বিষয়ে ছাড় দেওয়া হলেও এখন ঘটছে তার উল্টোটা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হতো। এই চাঁদার ভাগ যেত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কর্মকর্তা-কর্মচারী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশের সদস্য, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতা, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পকেটে। গত মার্চ মাসে ‘ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস পরিবহন ব্যবসায় শুদ্ধাচার’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল টিআইবি।

গত বছরের মে থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩২টি জেলার বাসকর্মী, শ্রমিক, মালিক ও যাত্রীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করে টিআইবি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কিছুদিন পরিবহন খাতে এই চাঁদাবাজি বন্ধ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ফের আগের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। তারা বলেন, গত ৫ আগস্টের আগে রাজধানীতে বিভিন্ন কোম্পানির ব্যানারে চলা বাসের জন্য ২ থেকে ৩ হাজার টাকা করে দিতে হতো ট্রাফিক পুলিশকে। আর জেলায় চলাচলের রুট পারমিট পাওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশার নগরীতে চলার অনুমতি নেই। এ ছাড়া ব্যক্তিগত ব্যবহারের (প্রাইভেট) সিএনজিচালিত অটোরিকশারও ভাড়ায় যাত্রী বহনের নিয়ম নেই। কিন্তু এসব সিএনজিচালিত অটোরিকশা ট্রাফিক পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তার দেওয়া টোকেনের মাধ্যমে (৫-৬ হাজার টাকা চাঁদা বিনিময়ে সড়কে চলার সুযোগ) দাপিয়ে বেড়াত রাজধানীর সড়ক। ফিটনেসবিহীন ও রুট পারমিটবিহীন হওয়ায় মামলা এড়াতে এসব যানের মালিকরা ট্রাফিক পুলিশকে টাকা দিতেন। যে কারণে আগে ব্যক্তিগত যানের তুলনায় গণপরিবহনের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ছিল অনেক কম। কিন্তু আগের মতো টাকা না উঠানোর ফলে এখন গণপরিবহনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া বেড়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে গত ২০ নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানীতে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৬৬ হাজার ১০১টি। যার মধ্যে গণপরিবহনের সংখ্যাই বেশি বলে দাবি করেছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। এমন পরিস্থিতিতে এরই মধ্যে বাস মালিক সমিতির শীর্ষ নেতারা কয়েক দফায় মামলা জটিলতার সমাধানের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

সদরঘাট, গুলিস্তান, পল্টন, মতিঝিল, শাহবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, আগে মোটরসাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে বেশি মামলা দেওয়া হলেও এখন বাসের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে বেশি।

এ প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে মিরপুর রুটে চলা দিশারী পরিবহনের একটি বাসের চালক খাজা মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত মাসে ৩০ হাজারের মতো টাকা খরচ হয়েছে এই মামলার জন্য। কিন্তু এখন যে মামলাগুলো দেওয়া হচ্ছে, সেসব মামলা আগে ট্রাফিক পুলিশ দিত না। কারণ আগে ট্রাফিক পুলিশদের টাকা দেওয়া হতো। যার জন্য তারা সে সময় পার্কিং মামলা ও অন্য আরও কিছু ধারার মামলা দিত না। কিন্তু এখন টাকা দেওয়া বন্ধ থাকায় চলছে মামলা দেওয়া।’

গুলিস্তান থেকে গাজীপুর রুটে চলা একটি বাস কোম্পানির মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছু কিছু ট্রাফিক পুলিশ আছে, তারা আগের মতো সড়ক থেকে বাসপ্রতি টাকা না পাওয়ায় ইচ্ছেমতো মামলা দিচ্ছে। এই রুটে চলা আমার বেশিরভাগ গাড়ির কাগজ এখন পুলিশের কাছে। প্রায় সব গাড়ির নামে মামলা দেওয়া। এখন সড়ক থেকে যে টাকা আয় হয়, তার বেশিরভাগই মামলায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে তো আর পরিবহন ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারব না।’

বর্তমানে যেসব মামলা দেওয়া হচ্ছে, তার বেশিরভাগই সার্জেন্টরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন পরিবহন শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ হানিফ খোকন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়ক থেকে গাড়িপ্রতি বিভিন্ন পয়েন্টে টাকা তোলা বন্ধ আছে। যার জন্য ট্রাফিক পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের আয় বন্ধ আছে। বেশিরভাগ বাস চুক্তি হিসেবে মালিকের কাছ থেকে নিয়ে থাকেন শ্রমিকরা। কিন্তু যে হারে মামলা দেওয়া হচ্ছে তাতে আয়ের পুরো টাকা শ্রমিককে মামলার পেছনেই দিয়ে দিতে হচ্ছে। শ্রমিকদের এখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা দশা হয়েছে।’

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, ‘মামলা দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশের কাছে আমরা সহমর্মী আচরণ প্রত্যাশা করি। কারণ সড়কে অনেক বছর ধরে বন্ধ আছে নতুন গাড়ি নামানো। আর পুরনো গাড়ি থাকায় অনেকে গণহারে মামলার শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে অবৈধ ছোট যানের জন্য নির্ধারিত স্ট্যান্ডে অনেক সময় গাড়ি পার্কিং করা যায় না, কিন্তু সে ক্ষেত্রেও ট্রাফিক পুলিশ মামলা দিচ্ছে। আর নতুন আইনে যেসব মামলা হয়, তার টাকার পরিমাণ কিন্তু অনেক বেশি।’

গণহারে মামলা দেওয়া বন্ধের দাবি জানিয়ে পরিবহন মালিক সমিতির এই নেতা আরও বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমাদের সমিতির পক্ষ থেকেও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। আশা করছি, বিষয়টি সমাধান হবে। সেই সঙ্গে চালকদেরও বলা আছে গাড়ির ফিটনেসের কাগজপত্র ঠিক করে তারপর গাড়ি চালাতে।’

গণহারে মামলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) খোন্দকার নাজমুল হাসান বলেন, ‘সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য মূলত মামলা দেওয়া হয়। সড়কে শৃঙ্খলার জন্য আমাদের নানা পদক্ষেপ নিতে হয়। আমরা চেষ্টা করি যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার। তবে ট্রাফিকের কোনো সদস্য যদি ইচ্ছেকৃতভাবে মামলা দেন, আর সেটির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’