স্বাধীনতা যুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। দেশকে হানাদারমুক্ত করতে মরণপণ লড়াইয়ে অংশ নেয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী, শিল্পী সংগ্রামী নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ ও গণহত্যা মোকাবিলার জন্য গড়ে তোলে প্রবল প্রতিরোধ। সশস্ত্র যুদ্ধের পাশাপাশি গান, নাটক, কবিতার মতো সৃষ্টিশীলতা দিয়েও যুদ্ধকে গতিশীল করা হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত গান, কবিতা দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেয় স্বাধীনতার চেতনা সারা দেশে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা ও দেশবাসীর মনোবলকে উদ্দীপ্ত করতে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছিল। তাদেরই একটি গানের দল বিভিন্ন শরণার্থীশিবির ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পগুলোতে ট্রাকে ঘুরে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের গান গেয়ে শোনাত। এসব জাগরণিয়া গানের মধ্য দিয়ে উজ্জীবিত হতেন মুক্তিসেনারা। স্বাধীনতার স্বপ্নভরা চোখে তারা খুঁজে ফিরতেন শত্রুর আস্তানা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের চেতনা জাগানিয়া গান, আবৃত্তি, খবর, চরমপত্র এসব শিল্পকর্ম শত্রুর অস্ত্রের চেয়েও অনেক শক্তিশালী ছিল।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবরে’ গানটি আজও গণজাগরণের চেতনা জাগায়, নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করে প্রচল ভাঙার নতুন লড়াইয়ে। ‘আমরা কজন নবীন মাঝি, হাল ধরেছি, শক্ত করে রে.../ তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে... এই দারুণ প্রেরণাদায়ী গানের কথা লিখেছিলেন সুরকার ও গায়ক আপেল মাহমুদ। তবে গেয়েছিলেন সমবেত সংগীত হিসেবে অনেকে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একাধিক কালজয়ী গানের গীতিকার সুরকার গায়ক তিনি। এ গান নিয়ে নানা সময়ে স্মৃতিচারণ করেছেন আপেল মাহমুদ। তবে আজ চলুন আমরা এর গল্পটা শুনি, এই গানের বিখ্যাত প্রথম লিড ভোকাল রথীন্দ্রনাথ রায়ের স্মৃতি থেকে। তিনি মাত্র ঢাকা থেকে তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গিয়েছেন, গান শুনে শুনে তার ঢাকায় বসেই মনে হচ্ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তাকে ডাকছে। তিনি যাওয়ার পর পেলেন একটা চাটাই শোয়ার জন্য, দীর্ঘ পথশ্রমে ক্লান্ত ছিলেন, বিকেলের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘুমের আগে পরিচিত হয়েছেন আপেল মাহমুদের সঙ্গে, আপেল মাহমুদ তাকে ডাকছিলেন মামা মামা বলে। ঘুমটা মাত্র লেগে এসেছে এমন সময় আপেল মাহমুদ তাকে মামা মামা বলে চিৎকার করে ঘুম ভাঙান।
রথীন্দ্রনাথ রায় বলছিলেন আমাকে ‘ধাক্কায়া ঘুম ভাঙাল, আমি ঘুমের ঘোরে জিজ্ঞেস করলাম, ধাক্কাচ্ছ কেন, আর্মি এসেছে? আপেল বলল, মামা মামা খালি একটা টান দিতে হবে, সুরটা করে ফেলেছি, খালি একটা টান দিয়ে যাও। তো আপেল আমাকে দেখাল, বৈশাখের ঐ রুদ্রঝড়ে আকাশ যখন ভেঙে পড়ে, ছেঁড়া পাল আরও ছিঁড়ে যায়... এরপর একটা দীর্ঘ ১৬ মাত্রার... টান, ও ও ও... তারপর হাতছানি দেয় বিদ্যুৎ আমার হঠাৎ কবে শঙ্খ শোনায় শোন ঐ ভোরের পাখি গায়। আমি ওই টানটা ফিট করলাম, ওই টান দিতে দিতে গানটা দাঁড় করাতে করাতেই আমি আপেলকে বললাম, শোন আপেল, এটার মুখটা কোরাস করে দাও। আপেল বলল, কোরাসের মান্নারা তো, লোক তো সব চলে গেছে, শুধু ঘোষকরা আছে। আমি বললাম ওদেরই ডাকো। তখন মোতাহার ছিল, কলেজে মিউজিকে পড়ত আমাদের সঙ্গে, অ্যানাউন্সার ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে, ওকে ডাকা হলো। আমরা তিনজনে মুখের কোরাসটা আর আমি আর আপেল আলাদা করে অন্তরাগুলি গাইলাম, এই রেকর্ড হলো তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে, স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচারের পরদিনই দেখি বাজারে হাটে মাঠে ভারতীয় বাঙালি প্রায় সবাই এই গান গাইতেছে, আর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পরে আমার কথা হয়েছে, একাধিক মুক্তিযোদ্ধা আমাকে বলেছেন, এই গান রক্ত গরম করে দেয়, গায়ের লোম খাড়া করে দেয়।’
আপেল মাহমুদও এই গানের পেছনের গল্প জানতে চাইলে বলেছিলেন (২০১৫, ইনডিপেনডেন্ট নিউজ), ‘রথীনের একটা বড় টান গানটাকে অমর করে দিল। আমি প্রথমে টানটা ছাড়াই সুর করেছিলাম। তবে রথীনদার টানটা আমার সুর আর কথায় বড় প্রভাব ফেলেছিল। ওই টানটা না হলে গানটা এত জনপ্রিয় হতো না।’
এই অমর গানের দুই স্রষ্টাই আজকালের আবর্তে প্রবাসে স্থায়ী হয়েছেন, মাঝেমধ্যে দেশে আসেন, জীবন আর কদিনের, হয়তো একদিন থাকবেন না। কিন্তু প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে থাকবে ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর, পাড়ি দেব রে/ আমরা কজন নবীন মাঝি হাল ধরেছি / শক্ত করে রে...।’