এরপর কী হবে ফ্রান্সে

ফ্রান্সে হঠাৎ সরকার পতনের পর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এরপর কী করবেন ইমানুয়েল মাখোঁ। লিখেছেন হোসাইন জাকির

ফ্রান্সে হঠাৎ সরকারের পতন ঘটেছে। অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রী মিশেল বার্নিয়ে সরে গেছেন। যে কারণে দেশটিতে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। গত বুধবার পার্লামেন্টে আনা অনাস্থা ভোটে মাত্র তিন মাসের মাথায় বার্নিয়ের সরকারের পতন হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, সোমবার দেশটির সামাজিক নিরাপত্তা বাজেট নিয়ে বিশেষ ক্ষমতা খাটিয়েছিলেন। মোট ৫৭৭ জনের মধ্যে বাম ও ডানপন্থি দলগুলোর ৩৩১ ফরাসি আইনপ্রণেতা তার বিপক্ষে ভোট দেন। ৭৩ বছর বয়সী বার্নিয়ের বৃহস্পতিবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। দেশটির ইতিহাসে অনাস্থা প্রস্তাবের পর কোনো প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা ঘটে ১৯৬২ সালে। তখন প্রধানমন্ত্রী মিশেল ডেব্রে প্রেসিডেন্ট চার্লস ডি গলের অধীনে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আলজেরিয়া সংকটের কারণে তিনি পদত্যাগ করেন। বিশ্লেষকরা বলেছেন, বার্নিয়েরের পদত্যাগ শুধু প্যারিসকে এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে ফেলে দেয়নি বরং ২০২৫ সালের বাজেটও ঘোষণা হয়নি।

তবে মিশেল বার্নিয়ের পদত্যাগের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট মাখোঁ কয়েক দিনের মধ্যে নতুন প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করবেন বলে জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বার্নিয়েরের পদত্যাগের পর মাখোঁর পদত্যাগের দাবিও ওঠে। কারণ মাখোঁর বিরোধীরা মনে করেন তার পদত্যাগ দেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটাবে। মাখোঁ অবশ্য এমন দাবিকে পাত্তাই দেননি। তিনি ২০২৭ সালে মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পদে থাকবেন বলে জানান। বিবিসি জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে ১০ মিনিটের ভাষণে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ আগাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, জনগণ তাদের স্বার্থরক্ষায় সেবা পেতে তাকে ভোট দিয়ে জয়ী করেছে। তিনি ধন্যবাদ জানান মাত্র তিন মাসের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী বার্নিয়েকেও।

বাম-ডান এক

আলজাজিরা জানিয়েছে, দেশটির বামপন্থি জোট নিউ পপুলার ফ্রন্টের (এনএফপি) সংসদ সদস্যরা বার্নিয়েরের সাম্প্রতিক বাজেটের বিরোধিতা করে ভোট দিয়েছেন। পরে ডানপন্থি জাতীয় সমাবেশও (আরএন) একে সমর্থন দেয়। অভিযোগ ছিল, বার্নিয়ের ভোট ছাড়া সংসদের মাধ্যমে বাজেট পাস করানোর চেষ্টায় ছিলেন। তার বাজেটে ৬০ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের কর বৃদ্ধি এবং দেশের ঘাটতি মোকাবিলায় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের সামাজিক নিরাপত্তা এবং কল্যাণে সরকারি ব্যয় হ্রাসের প্রস্তাব ছিল। বার্নিয়ের জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়মের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করার অভিপ্রায় তার ছিল। অনাস্থা ভোটের পর বুধবার একটি ফরাসি সম্প্রচারকে তিনি বলেন, আমার ইচ্ছা ছিল ফরাসিদের রক্ষা করা। আরএন চেয়েছিল বার্নিয়েরের বাজেটে রাষ্ট্রীয় পেনশন বৃদ্ধি এবং অন্যান্য বাজেট ছাড়ের দাবির মধ্যে চিকিৎসায় সরকারি কাটছাঁট করা হোক। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী প্রধান ব্যক্তি হলেন ইমানুয়েল মাখোঁ। বিলুপ্তি এবং সেন্সরশিপ তার নীতির ফলাফল এবং এই বিচ্ছেদ আজ ফরাসিদের মধ্যে বিদ্যমান। বামপন্থি ম্যাথিল্ড প্যানোট বলেছেন, এই ঐতিহাসিক ঘটনা একটি শক্তিশালী সংকেত; যা ঘটুক না কেন, মানুষ ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। এখন মাখোঁকে যেতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ফ্রান্সে এ বিষয়ে ডান ও বামদের ঐক্য বর্তমান সরকারের প্রতি গভীর অসন্তোষের ইঙ্গিত দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জার্মান মার্শাল ফান্ডের প্যারিস অফিসের রিসার্চ ফেলো গেসিন ওয়েবার আলজাজিরাকে বলেন, আমি অবাক হয়েছি যে, এটি অনাস্থা ভোট দিয়ে হয়েছে। আমি আশা করিনি যে আরএন পার্টি এমন কিছু সমর্থন করবে, যা বামশক্তি থেকে আনা হয়েছিল। কিন্তু অন্যদিকে, আমি মনে করি এটি আপনাকে এ রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল সম্পর্কেও অনেক কিছু বলে, যাদের মূল উচ্চাকাক্সক্ষা হলো এ সরকারের পতন দেখা এবং রাজনৈতিক পরিবেশকে ধীরে ধীরে এমনভাবে বিষাক্ত করা যেন মাখোঁ অফিস থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়।

মাখোঁর ভাগ্য

২০১৭ সাল থেকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাখোঁ। ২০২৭ সাল পর্যন্ত ম্যান্ডেট রয়েছে তার। যদিও আরএন উপদেষ্টা ফিলিপ অলিভিয়ারের মতো বেশ কয়েকজন বিরোধী ব্যক্তি তাকে দ্রুত পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তিনি পদত্যাগ করবেন এমন কোনো বাধ্যবাধকতা বা এমন প্রত্যাশা নেই। এটি শুধু বিরোধী দলের কেউ কেউ অনুরোধ/পরামর্শ করছেন। যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির প্রভাষক মার্টা লরিমার আলজাজিরাকে বলেন, ফ্রান্স একটি আধা-প্রেসিডেন্ট ব্যবস্থা। এখানে সরকার এবং প্রেসিডেন্ট দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠান। ওয়েবার উল্লেখ করেন, মাখোঁ চাইলে তাড়াতাড়ি পদত্যাগ করতে পারেন, তবে এর সম্ভাবনা খুব কম। লে পেনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মুলতবি মামলা রয়েছে, যা আগামী বসন্তে চালু হবে। এ মামলার একটি সম্ভাব্য ফলাফল হলো তাকে আবার অফিসের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনুমতি দেওয়া হবে না, বা কোনো রাজনৈতিক অফিসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনুমতি দেওয়া হবে না। মাখোঁ এ সুবিধা ব্যবহার করতে যাচ্ছেন। ইইউ তহবিল আত্মসাতের অভিযোগে লি পেন বর্তমানে তার দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে বিচারাধীন রয়েছেন। যদিও তারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ইমানুয়েল মাখোঁ ফ্রান্সের গত ২০ বছরের ইতিহাসে প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হন। ফ্রান্সের জনগণ বিষয়ে একটি কথা বলা হয়, তাদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক কখনো সুবিধার না। কারণ ফরাসিরা নাকি হর্ষধ্বনি দিয়ে কোনো সরকারকে ক্ষমতায় এনে বসায়, তারপর সেটাকে আবার প্রথম সুযোগে ছুড়ে ফেলে দেয়। তারপরও মাখোঁ দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। বিবিসি জানায়, ফ্রান্সের রাজনীতিতে উগ্র ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী প্রার্থীকে ঠেকানোর জন্য মাখোঁকে ভোট দেয় ভোটাররা। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নতুন কিছু নয়। মাখোঁকে পছন্দ করেন না, এমন বহু প্রার্থী সেবার মেরিন লা পেনকে ভোট দেন, যিনি রেকর্ড ৪০ শতাংশ ভোট পান। আবার লাখ লাখ লোক তাদের ভোট নষ্ট করেছেন এমনকি ভোট দিতেও যাননি। আর মাখোঁ ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। এর পেছনে তার সমর্থকরা তো ছিলেনই, আরও ছিলেন যারা মেরিন লা পেন প্রেসিডেন্ট হন এটা কোনোমতে দেখতে চাননি। ফরাসি রাজনীতিতে রক্ষণশীল আর সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের চিরাচরিত প্রাধান্য ভেঙে দিয়েছেন মাখোঁ। তার বিরোধীরা এখন বাম ও ডান এই দুই মেরুতে চলে গেছে। তারপরও মাখোঁকে তারা কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারছে না। তবে এবার উল্টো ঘটনাই ঘটল দেশটির সংসদে। বিবিসি জানিয়েছে, ফ্রান্সে সমাজ যে শুধু দলীয় কারণে বিভক্ত তা নয়, এখানে আরও নানা মেরুকরণ আছে। বিভক্তি আছে প্যারিসের মতো ধনী শহুরে শ্রেণি আর অবহেলিত শহর ও গ্রামের মধ্যে, জাতীয়তাবাদী আর আন্তর্জাতিকতাবাদীদের মধ্যে, ধনী আর দরিদ্র ও প্রান্তিকদের মধ্যেও। মাখোঁ এসব দূর করবেন বললেও বাস্তবে কিছু হয়নি। তবে মাখোঁ ইউরোপীয় ইউনিয়নে জনপ্রিয়। তার নির্বাচনী প্রচারাভিযানে ফ্রান্সের পতাকার সঙ্গে ছিল ইইউর পতাকাও। তিনি চান খাদ্য, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ইউরোপকে স্বনির্ভর করে তুলতে। বিশেষ করে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর এসব নীতি ইইউর নেতাদের কাছে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ব্রিটেন বেরিয়ে যাওয়ার পর ফ্রান্স এ জোটের একমাত্র বড় সামরিক শক্তি।  মাখোঁর মতো খেলোয়াড় নাকি ফ্রান্সে আগে আসেনি।

নতুন প্রধানমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বলেছে, এ মুহূর্তে এটি বলা খুব কঠিন যে, কে নতুন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। মাখোঁ ডানপন্থিদের সন্তুষ্ট করার জন্য বার্নিয়েরকে বেছে নিয়েছিলেন। ডানপন্থিরা প্রথম রাউন্ডের ভোটে সর্বাধিক ভোট পায়। কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ডে হেরে যায়। কেন্দ্রীয় এবং বামপন্থি দলগুলো দ্বিতীয় রাউন্ডে জয়ী হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাখোঁ যাকে বেছে নেবেন তাকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুঁজে পেতে লড়াই করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি তিনি বাম থেকে কাউকে নিয়োগ করেন তবে তাকে কেন্দ্র থেকে চুক্তি করে আসতে হবে এবং তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবে ভোট না দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে আসতে হবে। তিনি একটি টেকনোক্র্যাটিক প্রোফাইলের দিকেও নজর দিতে পারেন এবং মোটামুটি কম ম্যান্ডেটসহ কাউকে নিয়োগ করতে পারেন। অবশেষে তিনি আবারও একটি বিস্তৃত জোট গঠনের চেষ্টা করতে পারেন এবং সুবিধা দিতে পারেন।

এদিকে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁকে নিয়ে সাধারণ ভোটারদের অসন্তোষ রয়েছে। তারা মনে করেন মাখোঁ দীর্ঘদিন প্রেসিডেন্ট থাকার কারণে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তিনি ফ্রান্সের অভিজাতদের মতো শুধু সুবিধা ভোগ করেছেন। সাধারণের উন্নতি সেভাবে হয়নি। এর আগে তারা বিভিন্ন সময়ে বাম ও উদারপন্থিদের ভোট দিয়েছেন। কিন্তু কোনো সুবিধা করতে পারেনি কেউ। তার বিরোধী হিসেবে পরিচিতরা এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে। ফ্রান্সে কট্টরপন্থিদের বিপরীতে সোশ্যালিস্ট (সমাজতান্ত্রিক), পরিবেশবাদী, কমিউনিস্ট ও কট্টর বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবোয়েড পার্টি (এলএফআই) মিলে নতুন জোট নির্বাচনে বিজয় হয়। এই দলগুলো আগে একে অপরের সমালোচনা করত এবং তাদের আদর্শ ও কর্মপদ্ধতির মধ্যেও বেশ ব্যবধান রয়েছে। তারপরও তারা জোট গঠন করেছে যেন কট্টর ডানপন্থিরা কোনোভাবেই রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে না পারে। বস্তুত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কট্টর ডানপন্থি কোনো দল ফ্রান্সের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসতে পারেনি। নিউ পপুলার ফ্রন্টের পক্ষ থেকে বর্তমান সরকারের পাস করা পেনশন ও অভিবাসনবিষয়ক সংশোধিত আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে অবৈধ অভিবাসীদের ব্যবস্থাপনা এবং ভিসা আবেদনের বন্দোবস্ত করার জন্য একটি সহায়তাকারী সংস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জীবনযাপনের ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নির্ধারণ করা এবং ন্যূনতম বেতন বাড়ানোরও ঘোষণাও দিয়েছে বামপন্থিদের নতুন এই জোট। তারা এখন মাখোঁ ইস্যুতে ডানপন্থিদের সমর্থনও পাচ্ছে। ফলে জটিল হয়ে উঠছে ফ্রান্সের রাজনীতি।