রুশ বিপ্লবের একশো বছর পর কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর মধ্যে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। এমন এক বিবর্তন, যা বিশ্বের সকল বামপন্থী আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে কমিউনিস্ট পার্টি এবং তাদের বিবর্তনের প্রভাব তেমনই একটি বিষয়। যদিও অঞ্চলটিতে কয়েক দশক ধরে তাদের প্রাধান্য অনেক কমেছে; তবে দলগুলো শ্রমিকদের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আদর্শের পক্ষে আন্দোলনের ক্ষেত্রে মূল খেলোয়াড় হিসেবে রয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে দুটি প্রধান মডেল হচ্ছে বামপন্থী ও ইসলামপন্থী। গত শতাব্দীর ত্রিশের দশক থেকেই ইরাক-ইরান-সিরিয়া-মিসরের মতো দেশে বামপন্থী আন্দোলন জোরদার হয়। এসব দেশে রাজতান্ত্রিক ও ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে সাংবিধানিক গণতন্ত্রের জন্য জীবন দেয় অসংখ্য কমিউনিস্ট। তাদের প্রভাবেই বাথ পার্টি সিরিয়াতে ক্ষমতাসীন হয়। কিন্তু একসময় সেই বাথ পার্টি স্বৈরশাসকে পরিণত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে বামপন্থী আন্দোলনের উৎপত্তি মূলত বিশ শতকের গোড়ার দিকে, যা বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট এবং সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত। ইরাকি কমিউনিস্ট পার্টি (আইসিপি), ইরানের তুদেহ পার্টি এবং আরব সোশ্যালিস্ট বাথ পার্টির মতো দলগুলো উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিক বিরোধী সংগ্রাম থেকে শুরু করে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী এবং স্নায়ুযুদ্ধের সময় ছিল এসব বামপন্থীদের সুবর্ণযুগ। তবে একসময় কর্তৃত্ববাদী শাসনের উত্থান, সোভিয়েত সমর্থনের পতন এবং ইসলামপন্থীদের আধিপত্য বাম রাজনীতির পতন ঘটায়।
মধ্যপ্রাচ্যে বামপন্থী দলের সংখ্যা দেশ অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। বিভিন্ন দেশে এসব দল ক্ষুদ্র পরিসরে বিদ্যমান। তাদের মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য দলের কথা তুলে ধরা হলো:
সিরিয়া
১৯৪৭ সালের ৭ এপ্রিল জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী স্বার্থকে এক করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আরব সোশ্যালিস্ট বাথ পার্টি। দলটি সিরিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে মিলিত হয়ে ১৯৫৮ সালে ইউনাইটেড আরব রিপাবলিক গঠন করে। যা পরবর্তীতে পার্শ্ববর্তী আরব দেশগুলোতে দলটির আঞ্চলিক শাখা প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৭০ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাথ পার্টির নেতা হিসেবে ক্ষমতা নেন হাফেজ আল-আসাদ। ২০০০ সালে তার মৃত্যুর পর ছেলে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতায় আসেন। এ দীর্ঘ শাসনকালে বাবা-ছেলে বাথ পার্টি মূল চেতনার বাইরে গিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
ইরাক
দেশটির অন্যতম বামপন্থী দল আরব বাথ সোশ্যালিস্ট পার্টি। দলটির অধীনে ইরাক দীর্ঘদিন শাসিত হয়। ১৯৪০-এর দশকে বৈপ্লবিক, জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদী দলটি একীভূত আরব রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতা ও সমাজতন্ত্রের পথে আন্দোলন করে। আরব বাথ সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতৃত্বেই পরিচালিত ১৯৬৮ সালের ‘১৭ জুলাইয়ের বিপ্লব’। এই আন্দোলন ইরাকের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ইরাকের সমাজ-জীবনে ভিত্তিগত অর্থনৈতিক পরিবর্তন এনে দেয়। এ আন্দোলনে আব্দুল সালাম আরিফ ক্ষমতাচ্যুত হন এবং আহমেদ হাসান আল-বাকর বাথ পার্টি নেতা হিসেবে প্রসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত হন। কিন্তু বিদ্রোহ ক্রমশ বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিলের (আরসিসি) প্রধান কর্ণধার সাদ্দাম হোসেনের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ১৯৭৯ সালের জুলাই মাসে তিনি ইরাকের সর্বোচ্চ কার্যনির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী হন। এরপর থেকেই খেই হারিয়ে ফেলে ইরাকের বামপন্থীরা। বর্তমানে ইরাকি কমিউনিস্ট পার্টি সক্রিয় থাকলেও জাতীয় রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা নেই। প্রায়শই প্রাসঙ্গিক থাকার জন্য অন্যান্য গোষ্ঠীর সাথে জোট গঠন করে দলটি।
ইরান
১৯৪১ সালে কমিউনিস্ট আদর্শ নিয়ে গঠিত হয়েছিল তুদেহ পার্টি। কিন্তু দলটি ইরানে সোভিয়েত ইউনিয়নের এজেন্ট ও ভাড়াটে শক্তি হিসেবে কাজ করায় শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে। বিংশ শতাব্দীতে এই পার্টির সদস্যরা ইরানে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবৈধ স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। এমনও হয়েছিল, তেহরানে নিযুক্ত সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত তুদেহ পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তগুলোকে চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করতো। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের পর, শাহের শাসনামলে নিষিদ্ধ করা তুদেহ পার্টির কার্যক্রম ত্রিশ বছর পর আবার শুরু হয়। তবে বর্তমান শাসকদের কর্তৃত্ববাদী প্রকৃতির কারণে তুদেহ পার্টি অনেকটা গোপনে কাজ করে।
লেবানন
লেবাননের কমিউনিস্ট পার্টি দৃশ্যমান উপস্থিতি বজায় রেখে বিক্ষোভ ও জোটে অংশগ্রহণ করে। দলটি বলশেভিক কার্যকলাপের ওপর নিষেধাজ্ঞা এড়াতে প্রথমে লেবানিজ পিপলস পার্টি নামটি ব্যবহার করেছিল। দলটিকে প্রথমে বাধ্যতামূলক কর্তৃপক্ষ দ্বারা অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিল, কিন্তু ফরাসি ফ্রন্ট পপুলায়ার সরকারের অধীনে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। দলটি কয়েকটি লেবানিজ পার্টির মধ্যে একটি, যাদের বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং অঞ্চলজুড়ে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এটি বেশিরভাগ লেবাননের জেলায় উপস্থিত, তবে দক্ষিণ লেবাননে এর শক্তি সবচেয়ে বেশি।
প্যালেস্টাইন
পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ ফিলিস্তিন (পিএফএলপি) একটি ধর্মনিরপেক্ষ ফিলিস্তিনি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী এবং বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল। ১৯৬৭ সালে জর্জ হাবাশ এ দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। পিএফএলপি মার্কসবাদী নীতির কারণে প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে জড়িত।
তুরস্ক
পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (এইচডিপি) তুরস্কের বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে একটি। এছাড়াও রয়েছে ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক শক্তি পার্টি। ২০০১ সালে দলটি তার নাম পরিবর্তন করে হয় তুরস্ক কমিউনিস্ট পার্টি (টিকেপি)।
এছাড়া মিশর, তিউনিসিয়া, জর্ডান ও লিবিয়ার মতো দেশগুলোতে ছোট ছোট বামপন্থী দল বিদ্যমান। তবে তারা প্রায়শই শাসকগোষ্ঠীর দমনপীড়নের শিকার হয়।