ফাইভ স্টার পলক

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক কিছুদিন আগেও ছিলেন দেশের পরিচিত ও প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি। সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে তিনিই বর্তমান ছিলেন। কিন্তু পলক ক্ষমতার বেধড়ক অপব্যবহার করেছেন। তিনি নাটোরের সিংড়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন; তৈরি করেছিলেন ফাইভ স্টার বাহিনী। দলীয় পদ-পদবি থেকে জনপ্রতিনিধির চেয়ার সবই ব্যবহার করেছিলেন আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও অনুগত ব্যক্তিদের দখলে রাখতে। আর ভিন্নমতের হলে, সে যে দলেরই হোক বা বিরোধীপক্ষের, কেউ ছাড় পেতেন না।

২০০৮ সালে নাটোর-৩ (সিংড়া) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জুনাইদ আহমেদ পলক। ২০১৪ সালে আবারও এমপি হয়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পলক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ঘনিষ্ঠজন হওয়ার সুবাদে আওয়ামী লীগ সরকারের পরের দুই মেয়াদেও, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে, একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পান তিনি।

৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা সবাই গা ঢাকা দেন। অনেক এমপি-মন্ত্রী দেশত্যাগ করেন, আবার অনেকে পালাতে গিয়ে আটক হন। সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ৬ আগস্ট বিকেলে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক হন। পলক ও তার স্ত্রী আরিফা জেসমিন কনিকার ব্যাংক হিসাব জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা (বিএফআইইউ)। এখন তিনি হত্যা মামলার আসামি হয়ে কারাগারে আছেন। নাটোরের সিংড়া থানায়ও তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়েছে।

আটক হওয়ার পর বেরিয়ে আসছে পলকের নানা দুর্নীতির খবর। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক এ প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির খবর প্রকাশ পাচ্ছে গণমাধ্যমে। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের নামে একের পর এক প্রকল্প নিয়ে শত শত কোটি টাকা লোপাট করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর তার ব্যক্তিগত সম্পদ বেড়েছে বহুগুণ। আইসিটি খাতে ডিজিটাল বাংলাদেশের নামে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বিগত সরকারের সময়ে।

পলকের দুর্নীতির অন্যতম উৎস ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি, এটুআই প্রকল্প, শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব, হাইটেক পার্ক, আইটি পার্ক প্রভৃতি।

অভিযোগ রয়েছে, এসব খাতে প্রকল্প হলেই ১৫ শতাংশ কমিশন দিতে হতো পলক সিন্ডিকেটকে।

জানা গেছে, টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি খাতে ২০১০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়; তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। গত দুই অর্থবছরে (২০১৯-২০ ও ২০২০-২১) বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ৫০ কোটি ৫৮ লাখ ২৭ হাজার টাকার অনিয়ম পায় মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষা বিভাগ।

অভিযোগ উঠেছে, পরিবারের সদস্যসহ অনুগত কর্মীদের নামে-বেনামে পলক সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। পলকের ‘ফাইভ স্টার’ বাহিনীর সদস্যরাও হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। পলকের স্ত্রী আরিফা জেসমিন কনিকা পেশায় স্কুলশিক্ষিকা হলেও ১৫ বছরে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।

ফাইভ স্টার বাহিনী : সিংড়ায় পলকের শক্তির নিয়ন্ত্রক হিসেবে ধরা হয় ফাইভ স্টার বাহিনীকে। সিংড়ায় একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করে এ বাহিনী। ফাইভ স্টার বাহিনীর সদস্যরা হলেন ইটালি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলাম, সিংড়ার সাবেক পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ডালিম আহমেদ ডন, উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি শরিফুল ইসলাম শরীফ ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি সোহেল তালুকদার।

ফাইভ স্টার বাহিনীর সদস্যরা জুনায়েদ আহমেদ পলকের সংস্পর্শে এসে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছচাষ, অবৈধভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন, সরকারি জায়গা দখল করে দোকানবাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, মহাসড়কে চাঁদাবাজি, ডিও ব্যবসা, নিয়োগ ও বদলিবাণিজ্য ছিল সদস্যদের অবৈধ আয়ের মূল উৎস।

গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নাটোরের সিংড়ার ছাতারদীঘি ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুর রাজ্জাক নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পথেই তাকে থামিয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে পিটিয়ে দুই পা ভেঙে রক্তাক্ত করে পাশের নন্দীগ্রাম উপজেলার একটি সড়কের পাশে ফেলে রেখে যায় এই বাহিনী। পলক বিমানবন্দর থেকে আটক হওয়ার খবর প্রকাশ হতেই গা-ঢাকা দেন ফাইভ স্টার বাহিনীর আলোচিত পাঁচ সদস্য।

পলকের হলফনামা : ২০০৮ সালের নির্বাচনে ধারদেনা করে খরচ জোগানো পলকের ছিল নগদ ৩০ হাজার ও তার স্ত্রীর ছিল ৫০ হাজার টাকা। ২০২৪ সালে নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় পলক উল্লেখ করেন, তার কাছে নগদ ১ কোটি ১৭ লাখ ৪১ হাজার ১১২ টাকা আছে। আর তার স্ত্রীর কাছে আছে ৪৫ লাখ ৬৫ হাজার ৯৯১ টাকা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে পলককে তার স্বজনরা দান করেছিলেন ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। আর পাঁচ স্বজনের কাছ থেকে তিনি ধার করেছিলেন ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে তার সম্পদ ছিল ৩ লাখ ১১ হাজার টাকার। আর তার স্ত্রী কনিকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকার।

দশম জাতীয় নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের হলফনামা অনুযায়ী, পাঁচ বছরে পলকের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বেড়ে হয় ৬৬ লাখ ৪৩ হাজার ২৬ ও তার স্ত্রীর ৭৭ লাখ ৫০ হাজার ৮৭৩ টাকা।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের হলফনামায় তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বেড়ে হয়েছিল ২ কোটি ৭০ লাখ আর তার স্ত্রীর ৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। গত ১৫ বছরে পলকের সম্পদ বেড়েছে ১৪০ গুণ। আর তার স্ত্রীর বেড়েছে ১৬২ গুণ। বাস্তবে তার সম্পদ রয়েছে আরও কয়েকশ গুণ বেশি।

আওয়ামী লীগ নেতারা কোণঠাসা : পরপর চারবার সংসদ সদস্য ও তিনবার মন্ত্রী হন জুনাইদ আহমেদ পলক। ক্ষমতার ক্রমবর্ধমান প্রভাবে নেতাকর্মীদের কঠোর হাতে দমন করেছেন তিনি। আওয়ামী লীগের ভেতরে তার কথার বাইরে কথা বলার চেষ্টা করলেই পদ-পদবিসহ সবক্ষেত্রে কোণঠাসা করা হতো। ২০১৯ সালের ১০ মার্চ সিংড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে যেসব নেতা নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী শফিকুল ইসলাম শফিকের ভোট করেছেন, তাদের পরে উপজেলা আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের কাউন্সিলে পদশূন্য করা হয়। শফিকই ছিলেন সিংড়া আসনে পলকের একমাত্র শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। পরের নির্বাচনে নৌকার পক্ষে ভোট করায় পদ হারান পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুল ইসলাম নিজে এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক খলিলুর রহমান, উপ-দপ্তর সম্পাদক রেজাউল করিম রেজা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক জালাল উদ্দিন, বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক আব্দুল ওয়াদুদ দুদু, উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান কামরান, পৌর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান রঞ্জু, যুগ্ম সম্পাদক আদনান মাহমুদসহ অনেকে।

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পলকের টানা মন্ত্রিত্বকালে অন্য কারোর কিছু করার সুযোগ ছিল না। তার সমালোচনা করলেই পদ-পদবি হারাতে হতো, সবাইকে কোণঠাসা হতে হতো। পলকের স্ত্রী ও শ্যালক এবং নিজস্ব বাহিনী সব নিয়ন্ত্রণ করত।’

উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব দাউদার মাহমুদ বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছত্রছায়ায় পলক এসব দুর্নীতি করেছে। পলক এখন শত শত কোটি টাকার মালিক।’

জুনাইদ আহমেদ পলক জেলে থাকায় তার এবং তার স্ত্রী ও ফাইভ স্টার বাহিনীর কারও মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।