খাদ্যাভ্যাসে পরিমিতিবোধ জরুরি

খাবার মানবজীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় নেয়ামত। পরিমিত খাবার গ্রহণ এবং এর অপচয় রোধ করা কৃতজ্ঞতার অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কোরআনে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা অপব্যয় করে, তারা তো শয়তানের ভাই।’ (সুরা বনি ইসরাইল ২৭) অপচয়কারীকে আল্লাহতায়ালা অপছন্দ করেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা খাও এবং পান করো, কিন্তু অপব্যয় করো না। আল্লাহ অপব্যয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ ৩১)

অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ অনুচিত : খাবারের ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ বজায় রাখা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। এটা স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। মানবদেহে যত রোগ সৃষ্টি হয়, সেসবের অধিকাংশই অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে। এজন্য মহানবী (সা.) খাবার গ্রহণের উপকারী ও সুন্দরতম পদ্ধতি সম্পর্কে বলে দিয়েছেন। মিকদাম ইবনে মাদি কারিব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দেহের শক্তি জোগায় এমন কয়েক লোকমা খাবারই মানুষের জন্য যথেষ্ট। অবশ্য অধিক যদি খেতেই হয়, তাহলে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবার দিয়ে, এক-তৃতীয়াংশ পানি দিয়ে পূর্ণ করবে। আর এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখবে।’ (তিরমিজি) আবু জুহাইফা (রা.) বলেন, ‘আমি একবার ছারিদ (রুটির টুকরা এবং গোশতের ঝোল মিশ্রিত খাবার) খেয়ে মহানবী (সা.)-এর কাছে গেলাম এবং ঢেকুর তুলতে লাগলাম। নবীজি (সা.) বললেন, এটা কী? তোমার ঢেকুর বন্ধ করো। যারা দুনিয়াতে বেশি পেটপুরে খায়, তারা আখেরাতে বেশি ক্ষুধার্ত থাকবে।’ (মুসতাদরাকে হাকেম)

খাবারের অপচয় : রিজিকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার কথা বলেছে ইসলাম। এজন্যই মূলত হাত ধুয়ে দস্তরখানায় খাবার খাওয়া সুন্নত। যেন এতে পতিত খাবার উঠানো যায় এবং হাতে লেগে থাকা খাবার জিহ্বার সাহায্যে পরিষ্কার করে খাওয়া যায়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, সে যেন হাত না মুছে (ধৌত না করে) যতক্ষণ না সে তা চেটে খায়।’ (সহিহ বুখারি) জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শয়তান তোমাদের প্রতিটা কাজে উপস্থিত হয়। এমনকি খাবারের সময়ও। তোমাদের কারও যদি লোকমা পড়ে যায়, সে যেন লেগে যাওয়া ময়লা পরিষ্কার করে তা খেয়ে ফেলে। শয়তানের জন্য রেখে না দেয়। আহার শেষে সে যেন আঙুলগুলো চেটে খায়। কেননা সে জানে না খাবারের কোন অংশে বরকত রয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসরা লিখেন, পতিত খাবার উঠানোর মাধ্যমে একদিকে যেমন আল্লাহর নেয়ামতের শোকর আদায় করা হয়, অন্যদিকে শয়তানকেও লাঞ্ছিত করা হয়। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে অহংকারী লোকরা পতিত খাবার উঠিয়ে খেতে চায় না। আর অহংকার শয়তানের বৈশিষ্ট্য। এজন্য এর দ্বারা অহংকার দমন করার মাধ্যমে শয়তানকে লাঞ্ছিত করা হয়। অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি পতিত খাবার উঠিয়ে খায়, আল্লাহতায়ালা তাকে ক্ষমা করে দেন।’ (শামায়েলে কুবরা) কোনো কোনো মাশায়েখ থেকে বর্ণিত আছে, ‘যে ব্যক্তি পতিত খাবার উঠিয়ে খাবে, আল্লাহতায়ালা তাকে দারিদ্র্য ও মরণব্যাধি থেকে রক্ষা করবেন।’ (শামায়েলে কুবরা)

খাবার পাত্রের দোয়া : মহানবী (সা.) খাবারপাত্র পরিষ্কার করে খাওয়ার ব্যাপারে ক্ষমার সুসংবাদ দিয়েছেন। নুবাইশ খাইর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি পাত্রে খাবার পর তা পরিষ্কার করে খেলে পাত্রটি তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে।’ (জামে তিরমিজি)

আমাদের দেশের দাওয়াত-অনুষ্ঠান এবং হোটেলগুলোতে যে পরিমাণ খাবার নষ্ট হয়, নিঃসন্দেহে তা খাবারের অপচয় এবং আল্লাহর নেয়ামতের অবমূল্যায়ন। এ থেকে বেঁচে থাকা সবার জন্য অপরিহার্য। অন্যথায় আল্লাহতায়ালা স্বীয় নেয়ামত থেকে আমাদের বঞ্চিত করে দেবেন। এমনটাই মহান রবের ঘোষণা। তিনি বলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে আমি তোমাদের আরও বেশি দেব। যদি অকৃতজ্ঞ হও, তাহলে আমার শাস্তি অবশ্যই কঠিন।’ (সুরা ইবরাহিম ০৭)