মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে আসুক

খাদ্যপণ্যের উচ্চ দামে দরিদ্র, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিগত সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ মূল্যস্ফীতিকে বাগে আনতে পারেনি। দেশে দুই বছরের বেশি সময় ধরে টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি রয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ সরকারের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল, বাজারে পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করতে না পারা। মুদ্রাস্ফীতির ফলে মুদ্রার মূল্য কমে যায় এবং স্থির আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান নিচে  নেমে আসে। ২০২৩ সালের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি। আবার ২০২৪ সালে যে নতুন বাজেট পেশ হয়েছিল, সেখানেও মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। গত অর্থবছর চূড়ান্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। করোনাকালের সময় বাদে গত ১৫ বছরের মধ্যে এ অর্জন সবচেয়ে কম। যদিও সরকার বলেছিল, এ প্রবৃদ্ধি অর্জনের হার হবে সাড়ে ৭ শতাংশ।

শ্রীলঙ্কায় নিকট অতীতেও মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেখানে মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেপ্টেম্বরে দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ঋণাত্মক দশমিক ৫ শতাংশ। আমাদের দেশে একটানা দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ দিশেহারা।  অর্থনীতির নীরব ঘাতক মূল্যস্ফীতি কতটা নির্মম হতে পারে, তা মানুষ দেখেছে গত দুই বছরের  বেশি সময় ধরে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শুক্রবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে আনতে অন্তত এক বছর সময় লাগবে। জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ব্র্যাক ইপিএল আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। তিনি জানিয়েছেন  গত চার মাসে অতিরিক্ত ৩ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসী কর্মীরা, যা অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে বলেন, মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে অন্তত এক বছর সময় লাগবে। জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামবে। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। 

আমাদের অর্থনীতির মূল শক্তি ছিল উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও পরিমিত মূল্যস্ফীতির মতো সূচক। কিন্তু এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বর্তমানে লাগামহীনভাবে বাড়ছেই নিত্যপণ্যের দাম। কিন্তু সেই হারে সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ শুধু নয়, মধ্যবিত্তরাও সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। অর্থনৈতিক অঙ্গনে আয় এবং সম্পদের অসমতা সর্বজনবিদিত। হাজার হাজার কোটি টাকার  খেলাপি ঋণ কিংবা অর্থ পাচারের দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে, অর্থ ও বিত্ত কয়েকটি মানুষ এবং পরিবারের কুক্ষিগত। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা  সেভাবে না থাকায় বাংলাদেশে উন্নত বিশ্বের মতো কেবল সুদহার বাড়ানোর পদক্ষেপে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধের মাধ্যমে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা এবং রাজস্বনীতির পরিবর্তনের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে এর সমাধান হবে না। বাজারে পণ্যের প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করে পর্যাপ্ত সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনা এই তিনের যথাযথ সমন্বয় ঘটাতে হবে। শুল্ক কমানোর পরও কেন বাজারে তার প্রভাব পড়ছে না, তার কারণ খুঁজে বের করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বিগত সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে দেশের ব্যাংক খাত থেকে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে। বঞ্চিত হয়েছে বেসরকারি খাত এবং এক ধরনের কোণঠাসা অবস্থায় পড়তে হয়েছে তাদের। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়িয়ে কীভাবে এই নীরব ঘাতককে বাগে নিয়ে আসা যায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না, এটাই মানুষের সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ। ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। বিগত সরকার বলেছিল, কয়েক বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনবে। কিন্তু গভর্নর বলছেন ১ বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে আসবে। ফলে আমরা কিছুটা হলেও আশ্বস্ত হতে পারি।