আমরা তোমাদের ভুলব না

সুব্রত চৌধুরী বেশ ক’বছর পর স্কুলের শীতকালীন ছুটি কাটাতে শুভ দেশে বেড়াতে এসেছে। তার জন্ম সুদূর আমেরিকায় হলেও সংগীতশিল্পী মা ও আবৃত্তি শিল্পী বাবার ছায়াতলে থেকে বাঙালি সংস্কৃতির আবহেই সে সেখানে বেড়ে উঠেছে।

শুভ গতবার যখন দেশে বেড়াতে এসেছিল তখন তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল ছোট মামা। ছোট মামার স্নেহ-মায়ায় তার সময়টা বেশ ভালোই কেটেছিল। এবারও সে বাসায় পৌঁছেই ছোট মামাকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু ছোট মামার টিকিটিও মেলে না।

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে যখন সে ‘একাত্তরের দিনগুলি’ পড়ছিল তখন হন্তদন্ত হয়ে ছোট মামা বাসায় ঢোকে। শুভকে দেখে তার দিকে দুহাত বাড়িয়ে দেয়, শুভ মামার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

অভিমানী কণ্ঠে সে জানতে চায়, ‘সারা দিন তুমি কোথায় ছিলে মামা?’

‘একটু কাজ ছিল।’

‘তুমি তো জব করো না, তুমি না স্টুডেন্ট?’

‘হ্যাঁ।’

‘তাহলে কীসের কাজ?’

‘কাল বাদে পরশুদিন কী জানিস?’

‘কেন জানব না? ১৬ ডিসেম্বর, বিজয় দিবস। পাড়ার ক্লাবের সভাপতি হিসেবে এবার পাড়ায় ‘বিজয় দিবস’ উদযাপনের ভার পড়েছে আমার ওপর, তাই সবকিছু শেষ করে আসতে হয়েছে।’

শুভ বেশ ভালো করেই জানে তার মামার বাড়ির সবাই দেশ-অন্তপ্রাণ, সংস্কৃতি অনুরাগী তো বটেই। তার দাদু রাষ্ট্রীয় সম্মাননাপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা।

দাদু যখন আমেরিকায় শুভদের কাছে বেড়াতে যেতেন তখন ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা’র আয়োজন করা হতো। হলভর্তি শ্রোতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার যুদ্ধজয়ের কাহিনি শুনে যখন করতালি দিত তখন দাদুর গর্বে তার বুকের ছাতিও ফুলে উঠত। যদিও বয়সের ভারে দাদু এখন আর অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে পারেন না।

শুভর ছোট মামার আবৃত্তির গলা বেশ ভালো। ছোট মামা উঠতি আবৃত্তি শিল্পী হিসেবে ইদীনিং নামডাক কুড়াচ্ছে। তাই পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ভার মামার কাঁধেই পড়ে।

‘শুভ, তুই বাংলাদেশের বিজয় দিবস সম্পর্কে কিছু জানিস?’

‘ভিক্টোরি ডে অব বাংলাদেশ’-এর কথা বলছ?’

‘হ্যাঁ।’

‘আমরা তো আমেরিকায় বাংলাদেশ কমিউনিটি সেন্টারে বাংলাদেশের বিজয় দিবস পালন করি।’

‘তাই!’

‘হ্যাঁ।’

‘তোরা কীভাবে বিজয় দিবস পালন করিস? বিজয় র‌্যালি বের করিস?’

‘আমরা কথামালা, গান, নাচ, কবিতা আবৃত্তি, সøাইড শো, বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা প্রভৃতির মাধ্যমে বিজয় দিবস পালন করি। প্রচণ্ড শীতের কারণে আমাদের ওখানে বিজয় র‌্যালি বের হয় না।’

‘ওহ! আচ্ছা।’

বিজয় র‌্যালির কথা শুনে শুভর খুব ইচ্ছা হয় বিজয় র‌্যালিতে কী হয় তা দেখার, জানার, অংশ নেওয়ার।

‘মামা, আমাকে নিয়ে যাবে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে?’

‘অত সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারবি?’

‘অ্যালার্ম দিয়ে রাখব।’

‘ঠিক আছে, এখন ঘুমোতে যা।’

শুভ মায়ের কাছ থেকে অনুষ্ঠানে যাওয়ার অনুমতি নিয়ে বিছানায় যায়।

সকালবেলা অ্যালার্মের শব্দে শুভ ঘুম থেকে জেগে ওঠে। মুখ-হাত ধুয়ে, জামাকাপড় পরে, বের হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ছোট মামার ঘরে ঢুঁ মারে। ছোট মামাও ততক্ষণে প্রস্তুত।

ছোট মামা নিজেদের বাগানের ফুল দিয়ে রাতেই দুটি ফুলের তোড়া তৈরি করে রেখেছিল। একটা ফুলের তোড়া শুভর হাতে দিয়ে বলল, ‘চল বেরিয়ে পড়ি’।

‘আমরা কোথায় যাব মামা?’

‘জাতীয় স্মৃতিসৌধে।’

ছোট মামা গেটের বাইরে এসে উবার ডাকে, তারপর মামা-ভাগনে তাতে চেপে বসে।

স্মৃতিসৌধে পৌঁছানোর অনেক আগেই তাদের গাড়ি ছেড়ে দিতে হয়। গাড়ি থেকে নেমে মামা-ভাগনে হাঁটা শুরু করে। কিছুদূর হেঁটে যাওয়ার পর শুভর চোখে পড়ে সামনে বিশাল লাইন। ধীর পায়ে সবাই এগিয়ে যাচ্ছে স্মৃতিসৌধের দিকে। কারও হাতে ব্যানার, কারো হাতে ফুল বা ফুলের তোড়া। কণ্ঠে সবার মুক্তিযুদ্ধের কালজয়ী গান, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না...।’

শুভরাও লাইনে দাঁড়িয়ে যায়, গুটি গুটি পায়ে এগুতে থাকে।

শুভ হাঁটতে হাঁটতে সামনে পেছনে উঁকি মেরে দেখে তার বয়সী অনেক ছেলেমেয়ে ফুল হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে স্মৃতিসৌধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ভিড় ঠেলে ঠেলে শুভরা যখন স্মৃতিসৌধে এসে পৌঁছে তখন স্মৃতিসৌধের বেদি ফুলে ফুলে ঢেকে গেছে।

শুভ স্মৃতিসৌধের সামনে কিছুক্ষণ নীরবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকে ফুলের তোড়া দিয়ে শহীদদের প্রতি তার শ্রদ্ধা নিবেদন করে। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধায় তার মাথা নুয়ে আসে। অন্যরকম এক ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে তার মনপ্রাণ।

পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে শুভরা বাসায় ফিরে আসে। বিকেলে মামাদের পাড়ার মাঠে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান। শুভ মামার হাত ধরে যায় সেখানে, ঘুরে ঘুরে দেখে।

নির্ধারিত সময়ের কিছু পরেই শুরু হয় অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই ছোট কচিকাঁচাদের সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়, হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়...।’

এর পরপরই ইথারে ভেসে আসে আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে ছোট মামার নাম। ছোট মামা সুন্দর ব্যারিটোন ভয়েসে আবৃত্তি করে শামসুর রাহমানের বিখ্যাত কবিতা ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা...।’

এরপর নৃত্য, বৃন্দ আবৃত্তি, বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা, মুক্তিযুদ্ধের নাটক প্রভৃতি পরিবেশনের মাধ্যমে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানমালার সমাপ্তি ঘটে।

অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে শুভ মনে মনে পরিকল্পনা করে আমেরিকায় ফিরে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আগামী বছর থেকে বিজয় দিবস পালন উপলক্ষে কমিউনিটি সেন্টারের ভেতরে বিজয় শোভাযাত্রার আয়োজন করবে।

মনের ক্যানভাসে সে বিজয় শোভাযাত্রার কাল্পনিক ছবিও এঁকে ফেলে। প্ল্যান অনুযায়ী ওইদিন বাংলাদেশ কমিউনিটির সবাই কমিউনিটি সেন্টারে সমবেত হবে। তারপর সারিবদ্ধভাবে সবাই ফুল হাতে মুক্তিযুদ্ধের কালজয়ী গান গাইতে গাইতে অডিটোরিয়ামে রাখা অস্থায়ী স্মৃতিসৌধের দিকে এগিয়ে যাবে। স্মৃতিসৌধের সামনে পৌঁছে পুষ্পস্তবক দিয়ে নীরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাবে শহীদদের। শ্রদ্ধা জানানো শেষে সবাই বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে।

‘কী রে শুভ, ভোর হয়েছে সেই কবে? তুই এখনো ঘুমাচ্ছিস? জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাবি না?’

ছোট মামার ডাকে শুভ ধড়মড়িয়ে উঠে বসে।

দূর থেকে ইথারে ভেসে আসে মুক্তিযুদ্ধের কালজয়ী গানের সুর, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না...।’