দুই দশক ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতিতে দলীয় রাজনীতির প্রভাব, গণরুম, গেস্টরুম, আধিপত্যকে কেন্দ্র করে হানাহানি, শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি বা ব্যক্তিস্বার্থের নানা অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণা বা শিক্ষা কার্যক্রমকে হুমকির মুখে ফেলে। সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা খাত। যার ফলাফল বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় উল্লেখযোগ্য অবস্থানে ছিল না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চশিক্ষার মানদ-ে দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ায় বিদেশি শিক্ষার্থীরাও আগ্রহ হারিয়েছেন ঢাবি থেকে।
তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্র কিছুটা হলেও পাল্টেছে। দখলদারিত্বের রাজনীতি ছাপিয়ে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে ক্যাম্পাস। আবাসিক হলে ফিরেছে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ। গণরুম-গেস্টরুমের যুগ পেরিয়ে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে। যার ফলে ফিরেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ। প্রভাব পড়েছে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়েও (সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকা)। সর্বশেষ প্রকাশিত র্যাঙ্কিংয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডসের (কিউএস), এশিয়া ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১১২তম, যা গত বছর ছিল ১৪০তম। সে হিসাবে এবারের র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২৮ ধাপ এগিয়েছে। কিউএস গত ৬ নভেম্বর এই তালিকা প্রকাশ করে। কিউএস বিশ্বসেরা টেকসই বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় তৃতীয়বারের মতো বিশ্বসেরা ১ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৩৪তম স্থান লাভ করে বাংলাদেশ থেকে র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গত ১০ ডিসেম্বর ‘কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংস : সাসটেইনেবিলিটি ২০২৫’ শীর্ষক এ তালিকা প্রকাশ করা হয়। গত এক যুগের র্যাঙ্কিং পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কিউএস র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই ছয়শর ঘরে উঠতে পারিনি। ২০১৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল আটশরও পরে। চলতি বছর থেকে র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতি হচ্ছে। এর আগে গত জুনে প্রকাশিত র্যাঙ্কিংয়ে সর্বোচ্চ ৫৫৪তম স্থান অর্জন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান সম্মানজনক পর্যায়ে উন্নীতের লক্ষ্যে সব অনুষদের ডিন, সব হলের প্রাধ্যক্ষ ও হোস্টেলের ওয়ার্ডেন, সব বিভাগের চেয়ারম্যান, সব ইনস্টিটিউট ও সেন্টারের পরিচালক এবং অফিসপ্রধানদের অংশগ্রহণে গত ৮ অক্টোবর সিনেট ভবনে ‘ইউনিভার্সিটি ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিং’ বিষয়ক সমন্বয় সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে গবেষণা কার্যক্রমে উৎকর্ষ সাধন, ডাটা সংগ্রহ এবং ওয়েবসাইটে গবেষণা ডকুমেন্টেশন সংরক্ষণসহ বিভিন্ন কাজে গতিশীলতা আনতে বিভাগ ও ইনস্টিটিউট পর্যায়ে কমিটি গঠনের বিষয়ে আলোচনা করা হয়। টাইম হায়ার এডুকেশন র্যাঙ্কিং সাব-কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এম রেজাউল ইসলাম এবং ইমপ্যাক্ট র্যাঙ্কিং সাব-কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. সামসাদ মর্তুজা সভায় ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন।
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ শিক্ষা ও গবেষণা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন। সম্প্রতি ঢাবি এবং টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়সহ জাপানের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে যৌথ গবেষণা কার্যক্রম চালুর বিষয়ে ঢাবি উপ-উপাচাযের (প্রশাসন) সঙ্গে জাপানের নিউক্লিয়ার ও রেডিয়েশন বিশেষজ্ঞদলের আলোচনা হয়েছে। যৌথ সহযোগিতামূলক শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে উপাচার্যের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। এ ছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে যৌথ সহযোগিতামূলক শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম চালুর বিষয়ে চীনের ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড রিজিওনাল স্টাডিজ এবং স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ এডুকেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে উপাচার্যের আলোচনা হয়েছে। ঢাবির ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, কুইন্স ম্যারি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন, ব্রুনেল ইউনিভার্সিটি, বারানাস হিন্দু ইউনিভার্সিটি ও ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটির মধ্যে বহুদেশীয় অনলাইন গবেষণা সভার আয়োজন করা হয়েছে। যৌথ সহযোগিতামূলক শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয়। প্রতিনিধিরা উপাচার্যকে সম্ভাব্য সব সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন।
গত ২৮ আগস্ট অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান ঢাবির উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষা ও শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু উদ্যোগ নিতে দেখা যায়। আবাসিক হলগুলোতে গণরুম প্রথা বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং মেধার ভিত্তিতে আসন বণ্টন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে ১২টি, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে ২৮টি, রোকেয়া হলে ২৯টি এবং শামসুন নাহার হলে ২৪টি বাঙ্ক বেড স্থাপন করা হয়েছে। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামের সব অসচ্ছল শিক্ষার্থীকে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা করে বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরীণ চলাচলের সুবিধার্থে প্রথমবারের মতো ক্যাম্পাসে শাটল বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য ক্যাম্পাসের সাত প্রবেশপথে বেরিয়ার (প্রতিবন্ধক) ও সিকিউরিটি অ্যান্ড সার্ভিলেন্স বক্স সচল করা হয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসন ও বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদল শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ও বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল পরিদর্শন করে। জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থীদের জন্য নবনির্মিত রবীন্দ্র ভবন এবং আবাসিক শিক্ষকদের জন্য নবনির্মিত অধ্যাপক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য আবাসিক শিক্ষক ভবন উদ্বোধন করা হয়েছে। জাইকার আর্থিক সহায়তায় ছাত্রীদের জন্য একটি হল নির্মাণের ব্যাপারে কোষাধ্যক্ষের সঙ্গে জাইকা প্রতিনিধিদলের আলোচনা হয়েছে। তুরস্কের আর্থিক সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ পুনর্র্নিমাণকাজ শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া, শিক্ষার্থীদের উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের তিনটি তলায় ৩৮টি ওয়াইফাই এক্সেস পয়েন্ট স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনীতি চর্চার প্রকৃতি ও ধরন বিষয়ে প্রধান অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সুপারিশ করার জন্য খ্যাতিমান ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ডাকসু নির্বাচন, আবাসিক হলে ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী আন্তঃসম্পর্ক উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রধান অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা, মতবিনিময় ও পরামর্শ গ্রহণে উপাচার্যের অফিসে পরামর্শ বাক্স স্থাপন ও ইমেইল আইডি চালু করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ডাকসু নির্বাচন নিয়েও ইতিবাচক ভাবনা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এ প্রসঙ্গে ঢাবির উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণায় আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। আরও বেশি যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে কারিকুলামেও পরিবর্তন আনছি। বিদেশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ শিক্ষা কার্যক্রম বাড়াচ্ছি। বিদেশি শিক্ষার্থীরাও যাতে এখানে পড়তে আগ্রহী হয়, সে উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করছি।’
এ বিষয়ে ঢাবির আরেক উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা এবং শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে নজর দিচ্ছে। আবাসন সংকট আমাদের জন্য বড় বাধা, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে আমরা জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। ডাকসু নির্বাচন এবং ছাত্র রাজনীতি নিয়েও বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করছে।’
সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করার ১০০ দিনে শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ এবং কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ আমাদের সবচেয়ে বড় কনসার্নের (মনোযোগের) বিষয়। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছি। সবার সহযোগিতা পেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্মানজনক স্থানে পৌঁছে দিতে পারব।’