রাজবাড়ীতে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত মেডিকেল ক্যাম্প সংরক্ষণের দাবি

মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধে আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য সারাদেশের অনেক স্থানেই গড়ে উঠেছিল অস্থায়ী চিকিৎসা ক্যাম্প। যুদ্ধের সময় এই মেডিকেল ক্যাম্পগুলোর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধে আহতদের চিকিৎসার জন্য রাজবাড়ীতেও গড়ে ওঠে একটি মেডিকেল ক্যাম্প। প্রায় তিনমাস এই ক্যাম্পে যুদ্ধে আহতদের চিকিৎসা প্রদান করা হয়। তবে যুদ্ধে চিকিৎসা ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত এই ক্যাম্পটির কথা এখন অজানাই রয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে ক্যাম্পটি সংরক্ষণ করা।

জানা যায়, রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তুপুর ইউনিয়নের বেথুলিয়া গ্রামে ১৯৪৭ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি হয়। যুদ্ধের সময় বিদ্যালয়টি একটি টিনের চারচালা ঘর ছিল। এরপর সেটাকে আধাপাকা ঘরে উন্নতি করা হয়। ২০২২ সাল পর্যন্ত এই বিদ্যালয়ে পাঠদান করা হতো। নতুন ভবন হওয়ায় এখন সেখানে বিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম হস্তান্তর করা হয়। ভবনটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের বেথুলিয়া গ্রামে অবস্থিত ৪০ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের পাশেই মাটিপাড়া কাজী ছমিরউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করলেই হাতের বাম পাশে একটি টিনশেড পাকা ভবন। ভবনটির একটি বারান্দা রয়েছে। চালের টিনগুলো মরিচা ধরে ভঙ্গুর অবস্থায় পরে আছে। ভবনের সামনে ভ্যানে করে একটি অস্থায়ী ঝালমুড়ির দোকান দেওয়া হয়েছে। 

রাজবাড়ী জেলা যুদ্ধকালীন কমান্ডার বাকাউল আবুল হাশেম বলেন, ‘যুদ্ধের শেষের দিকে দেশের অনেক জায়গায় যুদ্ধ হচ্ছে। আমি যুদ্ধকালীন কমান্ডার হিসেবে আমার সঙ্গীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। সিদ্ধান্ত নেই রামকান্তপুর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পের পাশে একটি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করবো। সিদ্ধান্ত মোতাবেক তৎকালীন সিভিল সার্জন হুমায়ুন কবির এবং ডা. গোলাম মোস্তফা এগিয়ে আসলেন। হাসপাতালে সেবা দেওয়া দুরুহ হওয়ার কারণে প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে মাটিপাড়া  স্কুলের একটি ঘরে মেডিকেল ক্যাম্পটি স্থাপন করা হয়। ডাক্তার হিসেবে গোলাম মোস্তফা দায়িত্ব নিয়ে প্রতিদিন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিতে থাকেন। তিনি ইলিয়াস আলী নামে এক যোদ্ধার বড় অপারেশন করেন। তার মাথার মধ্যে গুলি লেগেছিল। এখানেই তার চিকিৎসা করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে জার্মানিতে নেওয়া হয়।’

হোসেন আলী মৃধা বলেন, ‘যুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ২৫ বছর। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে বিহারীদের আনাগোনা ছিল। কোনো মুক্তিযোদ্ধা ভয়ে সেখানে যেতে পারত না। মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দেওয়া হতো গোপনে। বেথুলিয়া এলাকটি নির্জন হওয়ায় এখানে নির্ভয়ে মুক্তিযোদ্ধারা চিকিৎসা নিতে আসতো। প্রতিদিনই কেউ না কেউ আহত হয়ে এখানে আসতো। ইলিয়াস আলী নামে এক মুক্তিযোদ্ধার মাথায় গুলি লাগে। বিকেলের দিকে তাকে এই ক্যাম্পে নিয়ে আসে। তাকে এখানেই চিকিৎসা দেওয়া হয়। তখন আমরা গ্রামের অনেকেই ডাক্তারদের সাহায্য করতাম। আমাদের বাড়ির তৈরি চিড়া-মুড়ি নিয়ে অনেক আহতের খেতে দিতাম। প্রায় তিনমাস এই ক্যাম্পে চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছিল।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পরে এই ক্যাম্পের কথা আর তেমন স্মরণে রাখা হয়নি। কয়েক বছর আগেও এটাকে স্কুলের ক্লাসরুম হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এখন একটি নতুন বিল্ডিং করা হয়েছে। টিনসেডের এই ভবনটি এখন পড়ে আছে। নতুন প্রজন্মের বেশির ভাগ মানুষই জানে না এই ক্যাম্পের কথা। বর্তমান সমাজকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানাতে এই ক্যাম্পটিকে সংরক্ষণ করার দাবি জানান তিনি।’

মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আব্দুস সোবাহান বলেন, ‘আমি এই স্কুলের শিক্ষক ছিলাম। রাজবাড়ী জেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের মাটি পাড়া বেথুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় চিকিৎসা ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই সেবা প্রদানকারী হাসপাতালটি এখন অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে। স্মৃতি জড়িত এই মেডিকেল ক্যাম্পটি স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।’