ঢাবি সিন্ডিকেটে নির্বাচিতদের বাদ দেওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে মত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট পুর্নগঠনের দাবি করছেন শিক্ষার্থীরা। ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর তারা দফায় দফায় কর্মসূচি পালন করছেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে আচার্য মনোনীত তিন সদস্য পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিদের বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত এসেছে। এটিকে বেআইনি বলছেন সাবেক-বর্তমান কয়েকজন সিন্ডিকেট সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলছেন, দাবির প্রেক্ষিতে সবকিছু ‘ল’ রিভিউ কমিটির ভিত্তিতে করা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে ১৮টি পদ রয়েছে। সিন্ডিকেটে ছয়টি ক্যাটাগরিতে (ডিন, প্রাধ্যক্ষ, অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক) শিক্ষকরা সরাসরি ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। সর্বশেষ ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ওই ছয়টি ক্যাটাগরিতে জিতেছেন আওয়ামীপন্থিরা। উপাচার্য এবং দুই উপ-উপাচার্য পদাধিকারবলে সদস্য মনোনীত হন। এ ছাড়া বাকি পদগুলোয় রেজিস্ট্রার্ড গ্র্যাজুয়েট, অ্যাকাডেমিক পরিষদ, চ্যান্সেলর, সরকার কর্তৃক মনোনীত হয়ে থাকেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বলছে, যারা শিক্ষকদের ভোটে সরাসরি নির্বাচিত, তাদের নির্ধারিত মেয়াদ দুই বছর ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তারা সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে থাকবেন। অন্যদিকে যারা মনোনীত হয়েছেন, তাদের চাইলে যেকোনো সময় পরিবর্তন করতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

গত ৮ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচিত ৬ সিন্ডিকেট সদস্য থেকে পাঁচ সদস্যকে বাদ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ।

তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ল রিভিউ কমিটির পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, বিদ্যমান বিধি মোতাবেক তারা আর সদস্য থাকার ‘যোগ্য’ নন। সিন্ডিকেট সদস্য থেকে বাদ পড়া পাঁচজন হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক মো. আব্দুস ছামাদ, হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলের সাবেক প্রভোস্ট অধ্যাপক মাসুদুর রহমান, লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ আহসান, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শরীফ উল ইসলাম ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহিন মোহিদ। তবে অধ্যাপক ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া এখনো সিন্ডিকেট সদস্য আছেন। তার আগে গত ১ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মনোনীত তিন সিন্ডিকেট সদস্য পরিবর্তন করা হয়।

নির্বাচিত এসব সদস্যকে বাদ দেওয়ায় বর্তমান ও সাবেক সিন্ডিকেট সদস্য এবং শিক্ষকদের কেউ কেউ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের পরিপন্থী। পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে এটি নজির হয়ে থাকবে।

এ বিষয়ে সিন্ডিকেট সদস্য থেকে বাদ পড়া অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ আহসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত সিন্ডিকেট মেম্বারদের সিন্ডিকেট সভায় আমন্ত্রণ না জানানো শুধুমাত্র দুইটি কারণে সম্ভব। এক, যদি পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়; দুই, নির্বাচিতদের কেউ যদি অবসর নেন, চাকরি ছেড়ে দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে যত প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে সিন্ডিকেট মেম্বার নির্বাচিত হয়েছেন তাদের প্রায় সবারই মেম্বার থাকাকালীন পদন্নোতি হয়েছে কিন্তু তারা পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবেই সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত সাদাদলের অনেক সম্মানিত শিক্ষক সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং তাদের পদন্নোতি হওয়ার পরও উনারা সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন পরবর্তী নির্বাচন হওয়া পর্যন্ত। নির্বাচিত সিন্ডিকেট সদস্যদের আমন্ত্রণ না জানানো বর্তমান প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত যা প্রতিটি পত্রিকায় এসেছে তা বেআইনি, অদূরদর্শী এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নির্বাচন ছাড়া এটা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নাই।

সাবেক সিন্ডিকেট সদস্য নীলিমা আকতার লিখেছেন, শিক্ষক প্রতিনিধিদের সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডার ১৯৭৩-এ বলা হয়েছে সিন্ডিকেট সদস‍্য হিসেবে মেয়াদ থাকার জন‍্য তাদেরকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে চাকরিরত থাকতে হবে। কোনো কারণে চাকরি ছেড়ে দিলে বা চাকরি চলে গেলে, সদস‍্যপদ বাতিল হবে। শিক্ষক প্রতিনিধিদের মূল পদ, বা অন‍্য পদে (ডিন, প্রভোস্ট) পরিবর্তন হলে, সিন্ডিকেট সদস‍্যপদ চলে যাবে, এরকম কথা আইনে নেই।

সাদা দলের একজন শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এভাবে সিন্ডিকেট সদস্য থেকে বাদ দেওয়ার নজির নেই। এটা ভালো প্রক্রিয়া নয়। তারা যদি পদত্যাগ করতো কিংবা নতুন নির্বাচন হতো তাহলে ঠিক ছিল। আগামীতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা হতে পারে। তাদের রাখা ঠিক নয় তবে এভাবে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াটা নিয়ে প্রশ্ন থাকে।

প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, যারা বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সিন্ডিকেটে নির্বাচিত হয়ে আসেন, তাদের প্রশাসন বাদ দিতে পারে না। তবে বিগত বছরগুলোতে নিপীড়ন-নির্যাতনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ছিল। এজন্য আমরা সিন্ডিকেট সদস্যদের বিষয়ে আইনি মতামতের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ল রিভিউ কমিটির কাছে পাঠাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ল রিভিউ কমিটি বেশ কিছু বিষয় পর্যালোচনা করে একটি ফল দিয়েছে। সিন্ডিকেটে ডিন ও প্রভোস্টদের প্রতিনিধি হিসেবে দুজন নির্বাচিত হয়ে আসেন। এসব প্রতিনিধিত্বশীল পদ। যেহেতু সংশ্লিষ্ট দুই সদস্য তাদের ডিন ও প্রভোস্ট থেকে পদত্যাগ করেছেন, তাই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী তারা আর বৈঠকে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা রাখেন না।

সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, এ ছাড়া অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও  প্রভাষক পদমর্যাদা থেকে একজন করে সিন্ডিকেটে নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকেন। তবে সংশ্লিষ্ট সদস্যরা পদোন্নতি পেয়ে প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক এবং সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। ফলে তারা আর নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির প্রতিনিধিত্ব করছেন না। সে কারণে তারা সিন্ডিকেট বৈঠকে অংশ নেওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

তিনি বলেন, তবে অধ্যাপক ক্যাটাগরির প্রতিনিধি এখনো যেহেতু তার স্বপদে বহাল আছেন, তাই তিনি প্রতিনিধি হিসেবে থাকবেন। শুন্যপদগুলো নির্বাচনের পর পূরণ হবে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা চেয়েছিলাম এই সিন্ডিকেট দিয়ে চালিয়ে নিতে। কিন্তু এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের তীব্র দাবি ছিল। অনেক দল-মতের পক্ষ থেকে ক্ষোভ জানানো হয়েছে। সে প্রেক্ষিতে আমরা আইনগতভাবে বিষয়টি দেখেছি। ৫ জন বিশিষ্ট আইনবিদ দিয়ে স্বাধীন প্যানেলের মাধ্যমে মতামত নিয়েছি। তারা অন্তত ৫ সপ্তাহ বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করে সবকিছু বিবেচনা করে একটা মতামত আমাদের দিয়েছেন। আমরা সেভাবেই চিন্তাভাবনা করছি। সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এর কোনো বিকল্প ছিল না, এভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। এটি শিক্ষার্থীসহ সবার গণ দাবি ছিল।

পাঁচজনকে ছাড়া কোরাম পূর্ন হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা এর আগে সরকার মনোনীতসহ যাদের পরিবর্তন করা যায় তাদের করেছি। এখানেও একজন অধ্যাপক থাকছেন। সবমিলিয়ে কোরাম পূর্ণ হবে, সেভাবেই আইনবিদদের মতামত পেয়েছি।