সব সময় তো অ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে সব অপারেশন করা যায় না বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। রবিবার রাজধানীর গুলশান ক্লাবে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে কনফারেন্স স্পিকার ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
শেয়ার ব্যবসায় কারসাজির অভিযোগে সম্প্রতি জাতীয় দলের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে জরিমানা করা হয়। এ প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সাকিব আল হাসানকে জরিমানা করা হয়েছে; সবার মাথাব্যথা হলো। সবাই হায় হায় করে বলছেন, এত বড় খেলোয়াড়কে জরিমানা করা হলো। আরে তাকে তো দুই বছর আগেই জরিমানা করার কথা ছিল।
তিনি বলেন, ‘সবাই জানেন, শেয়ারবাজারে কীভাবে কারসাজি হয়। আইসিবি মিউচুয়াল ফান্ডের টাকা নিয়ে চলে গেল। এটা আপনার-আমার সবার টাকা। তখন অ্যাকশন নেওয়া হলো না। এখন অ্যাকশন নিতে গেলে কথা হয়। অ্যাকশন নিতে গেলে তো কিছুটা ব্যথা লাগবেই। সব সময় তো অ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে সব অপারেশন করা যায় না।’
উপদেষ্টা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা করা খুব কঠিন কাজ; সে তুলনায় চাঁদাবাজির সমঝোতা করা খুব সহজ। সরকার আমদানি পর্যায়ে শুল্ক কমালেও- বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমছে না। এর পেছনে একটি কারণ সমঝোতার মাধ্যমে চাঁদাবাজি জারি রাখা।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, যেকোনো বাজারে গেলে দুই-তিন ধরনের চাঁদাবাজ দেখা যায়। এদের মধ্যে কিছু (চাঁদাবাজ) আছে যারা আগের সরকারের, এখন কিছু লোক এসেছে- তারা সামনে যে সরকার আসবে তাদের, আর কিছু লোক স্থানীয়। এরা পরস্পরের সাথে সমঝোতা করে চাঁদাবাজি করে।
সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমি নিজে কারওয়ান বাজারে গিয়ে দেখেছি তিন ভাগে ভাগ করে চাঁদাবাজি করা হয়। এদের সবার মাঝে এক ধরনের সমঝোতা রয়েছে। অথচ আমাকে বলা হচ্ছে সিন্ডিকেট ভাঙো।’
পণ্যের উৎপাদন খরচ ও ভোক্তার ব্যয়ের মধ্যে দাম কমানোকে সরকারের মূল উদ্বেগের বিষয় উল্লেখ করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানের বাড়তি দামটা দিতে হচ্ছে অকারণে। সরবরাহ শৃঙ্খলের মাঝে কিছু ব্যক্তি (মিডলম্যান) অবশ্যই থাকবে, যারা পণ্য সরবরাহে সহযোগিতা করে। কিন্তু, বাজারে একটা ট্রাকটা এলে তা ছুঁয়ে দিয়েই যারা বলে আমাকে ৫০০ টাকা দাও; তারা কোনও মধ্যবর্তী লোক না, এরা চাঁদাবাজ। এভাবে পাঁচ লাখ টাকার পেঁয়াজবোঝাই ট্রাক বাজারে আসলে তা এক স্থানে দাঁড়িয়েই সাত লাখ টাকা হয়ে যায়।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশে দুর্নীতির কথা তুলে ধরে অনুষ্ঠানে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘চুরি অনেক দেশেই হয়েছে। তবে বাংলাদেশে এটা এত ব্যাপক যে আপনারা চিন্তাও করতে পারবেন না। এক্ষেত্রে সরকারের রেগুলেটরি ফেইলিওর রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো সব ধ্বংস করা হয়েছে। নীতিনির্ধারক, আমলা, ব্যবসায়ী- সবাই মিলে নিয়ম ভেঙেছে।’
অনুষ্ঠানে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সঠিকভাবেই সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং নির্বাচনের আগে এসব সংস্কার শেষ করা প্রয়োজন। এ জন্য বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বল্প মেয়াদে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রাজনীতিবিদেরা একটি পথরেখা চাইছেন কীভাবে নির্বাচন করবেন। কিন্তু রাজনীতির পথরেখাকে কতখানি আমরা সুগম করতে পারব, সংস্কারকে আরও কত বেশি গভীর করতে পারব— তার পুরোটা নির্ভর করবে, আমরা কতখানি মানুষকে অর্থনৈতিক স্বস্তি দিতে পারব, তার ওপরে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, যদি মানুষকে অর্থনৈতিক স্বস্তি দিতে না পারি, আইন–শৃঙ্খলা দিয়ে সুরক্ষা দিতে না পারি, তাহলে মানুষের ওই সংস্কারের জন্য যতই ভালোবাসা থাকুক, ধৈর্য থাকবে না। এ জন্য মধ্যমেয়াদে একটি সমন্বিত, কার্যকর, আস্থা প্রবর্ধক কর্মসূচি নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।