গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে গুমের ঘটনাগুলো নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন গত শনিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করেছে গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। গুমের এসব ঘটনার সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তার জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে কমিশন। গুম থেকে শুরু করে হত্যার ভয়াবহ সব তথ্য উঠে এসেছে অন্তর্বর্তী এ প্রতিবেদনে। এতে গুম ও হত্যার বহু ঘটনায় সম্পৃক্ততা পাওয়ায় পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট র্যাবকে বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুম হওয়া ব্যক্তিদের (যারা আর ফিরে আসেননি) হত্যা ও তাদের মৃতদেহ গুমের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী, কাঞ্চন ব্রিজ ও পোস্তগোলা ব্রিজ ব্যবহার করা হতো। গুমের শিকার খুব কম মানুষই কোনো অভিযোগ ছাড়াই মুক্তি পেয়েছেন। গুমের শিকার ব্যক্তিদের কীভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হতো, কীভাবে তাদের মোবাইল ফোন কল ট্র্যাকিং করা হতো, কোন পন্থায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হতো তাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুম হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দুটি পন্থার মধ্যে হয় তাদের হত্যা করা হতো অথবা তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দিয়ে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হতো।
গত ২৭ আগস্ট কমিশন গঠনের পর এ পর্যন্ত ১ হাজার ৬৭৬টি গুমের অভিযোগ কমিশনে জমা পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া পর্যন্ত কমিশন ৭৫৮টি অভিযোগ পর্যালোচনা করেছে। তবে, কমিটি অনুমান করেছে, গুমের প্রকৃত সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের বেশি। পর্যালোচনাকৃত অভিযোগগুলোর মধ্যে ১৩০টি (১৭ শতাংশ) গুম সংঘটিত হয়েছে ২০১৬ সালে এবং ২৭ শতাংশ ভুক্তভোগী এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। ২০১৮ সালে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮৯টি গুমের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৩ সালে ৭৩টি, ২০১৫ সালে ৭৮টি এবং ২০১৭ সালে ৮৪টি গুমের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে পর্যায়ক্রমে গুমের ঘটনা ঘটেছে। ২০০৯ সালে ৫, ২০১০ সালে ১৯, ২০১১ সালে ২৩, ২০১২ সালে ৩৬, ২০১৪ সালে ৪৫, ২০১৯ সালে ৩৬, ২০২০ সালে ১৮, ২০২১ সালে ২৫, ২০২২ সালে ৪২, ২০২৩ সালে ৩৪ এবং ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত ২১টি গুমের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে গুমের ধারাবাহিক ঘটনাকে ‘গুম কালচার’ হিসেবে উল্লেখ করেছে কমিশন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের শিকার ব্যক্তিকে শারীরিক নির্যাতন, জিজ্ঞাসাবাদ এবং আয়নাঘরের মতো ‘বন্দি শিবিরে’ দীর্ঘদিন আটকে রাখা হতো। আটক থাকার পর তারা কোনো অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত ছিলেন না বলে অনেকেই মুক্তি পেয়েছেন। তবে, বেশিরভাগ ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে গুম ও অপহরণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা মামলা ঠুকে দিত। ভুক্তভোগীদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী (বেঁচে ফেরা) ব্যক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের মামলা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা, বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলা, বিস্ফোরক মামলা ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়া হতো।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব মৃতদেহ (গুমের শিকার ব্যক্তি) উদ্ধার করা হয়েছে, সেগুলোর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মৃতদের মাথায় গুলির চিহ্ন এবং মরদেহগুলো সিমেন্টের ব্যাগের সঙ্গে বেঁধে নদীতে ফেলা হয়েছিল। এটি সামরিক কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত সাধারণ পদ্ধতি, বিশেষ করে র্যাবে যারা কর্মরত ছিলেন তারা নিশ্চিত করতেন যে, মৃতদেহগুলো যেন নদীর পানিতে ডুবে থাকে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের কার্যক্রম (মৃতদেহ গুম) চালানোর জন্য পোস্তগোলা ব্রিজের নিচে একটি নৌকা রাখা ছিল। সুন্দরবনে জলদস্যুদের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে জব্দ করা এই নৌকাটি অপহরণ ও গুমের কার্যক্রম চালাতে ব্যবহার করা হতো। আর এসব হত্যাকাণ্ডে সক্রিয় অংশীদার ছিলেন র্যাবের কর্মকর্তারা।
ঘটনার বিষয়ে কমিশন সাক্ষী হিসেবে র্যাবের একজন ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দেয়। ওই কর্মকর্তা কমিশনকে বলেছেন, তৎকালীন র্যাব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের প্রধান সে সময় একটি ‘ওরিয়েন্টেশন’ সেশন পরিচালনা করেন। সেশনের শুরুতেই দুই ব্যক্তিকে কীভাবে ব্রিজের ওপর গুলি করে হত্যা করা হয় তার বর্ণনা দেন। র্যাব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত আরেক সামরিক কর্মকর্তা কমিশনকে এক ভুক্তভোগীর পালিয়ে যাওয়ার ঘটনার বিবরণ দেন। তিনি বলেন, ওই ব্যক্তি নদীতে লাফিয়ে পড়েছিলেন। তাকে উদ্ধারের পর সেখানেই হত্যা করা হয়।
কমিশনের প্রতিবেদনে ঢাকার একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলা হয়, একজন সৈনিককে এক আটককৃতের মৃতদেহ রেললাইন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। যতক্ষণ না পর্যন্ত ট্রেন এসে তাকে ছিন্নভিন্ন করে না দিয়ে যায় ততক্ষণ সেখানে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ওই সৈনিককে। জীবিত এক ভুক্তভোগী বলেন, এক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে একটি মহাসড়কে নিয়ে গিয়ে চলন্ত গাড়ির সামনে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে সেই গাড়িটি তাকে আঘাত না করে সরে যায় এবং তিনি বেঁচে যান। পরে সেই পুলিশ কর্মকর্তা দ্বিতীয়বার তাকে হত্যার চেষ্টা করেননি। তাই ওই ব্যাক্তি প্রাণে বেঁচে যান।
কমিশন প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বলছে, হত্যার পদ্ধতিগুলোতে বৈচিত্র্য থাকলেও সব হত্যার উদ্দেশ্য একই। আর সেটি হলো ভুক্তভোগীদের নির্মূল করা এবং কিছুক্ষেত্রে এমনভাবে তাদের নিশ্চিহ্ন করা, যাতে তাদের কোনোভাবেই জীবিত বা পুনরুদ্ধার বা মৃতদেহ চিহ্নিত করা না যায়। কমিশনের মতে, এ অপরাধমূলক কার্যক্রমগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে, বিভিন্ন স্থান ও সংস্থার অংশগ্রহণে সম্মিলিতভাবে সংঘটিত হয়েছে এবং এসব অপহরণের ব্যাপকতা ও বিস্তার উন্মোচনে আরও বিস্তারিত তদন্তের প্রয়োজন বলে মনে করে কমিশন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রচলিত ফৌজদারি আইনে গুমের অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট আইন না থাকলেও ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধিতে সম্পর্কিত অপরাধের বিধান রয়েছে, এর মধ্যে বেআইনি বাধা (ধারা ৩৩৯, ৩৪১), বেআইনি আটক (ধারা ৩৪০, ৩৪২-৩৪৮), অপহরণ, দাসত্ব এবং জোরপূর্বক শ্রম (ধারা ৩৫৯-৩৭৪)।
এতে বলা হয়, গত ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে যুক্ত হয়েছে। স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে এখন গুমের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, অপরাধীদের দায়মুক্তি প্রতিরোধ এবং জাতীয় আইনে গুমকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই সনদের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটি অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া সনদের বিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশের জন্য আরও কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যেমন গুমের যথাযথ তদন্ত নিশ্চিত করা, গুমের শিকার ভুক্তভোগীর বিচার পাওয়ার অধিকার রক্ষা করা এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করা।
গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সদস্য মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রাপ্ত তথ্যউপাত্ত সরকারের কাছে দিয়েছি। সেখানে বিস্তারিত বলা আছে। তবে, আরও বিস্তারিত জানতে আরও তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।’
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘গুমের শিকার ব্যক্তি কিংবা ভুক্তভোগীদের পরিবারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দোষী ব্যক্তিদের কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় বিচারের আওতায় আনা হবে তা সরকারই সিদ্ধান্ত নেবে।’