র‌্যাব বিলুপ্তির পর কী

নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনার পর দলের নিখোঁজ এক কর্মীর বাসায় গিয়ে দশ বছর আগেই পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্তির দাবি তুলেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এরপর সময় গড়িয়েছে অনেক। কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ‘ক্রসফায়ারের’ নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও বিনা বিচারে গ্রেপ্তারের অভিযোগে দেশ-বিদেশের মানবাধিকার সংস্থা জোর গলায় র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি তুলে এসেছে। এর মধ্যেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র‌্যাবের তখনকার বর্তমান ও সাবেক মহাপরিচালকসহ সাতজনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট (রাজস্ব বিভাগ) ও পররাষ্ট্র দপ্তর। এরপর বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো র‌্যাবের কার্যক্রম অনেকটাই গুটিয়ে যায়। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর র‌্যাব নিয়ে আবার আলোচনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিএনপির মতো বড় একটি রাজনৈতিক দল র‌্যাবের বিলুপ্তি চেয়ে পুলিশ সংস্কার কমিশনে সুপারিশ করেছে।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারিও গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে র‌্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে। যদিও ২০০৪ সালে দেশের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস দমনের উদ্দেশ্যে পুলিশের এ বিশেষ ইউনিট গঠন করেছিল তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। সম্প্রতি যখন র‌্যাব বিলুপ্তির আলোচনা চলছে, তখন প্রশ্ন উঠছেÑ দেশের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস দমনে তাহলে বিশেষভাবে কাজ করবে কারা?

এমন প্রশ্নের জবাবে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এমডি আব্দুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মনে করি এখন যে চিন্তাভাবনাটা হচ্ছে, র‌্যাব বিলুপ্ত করো। র‌্যাব বিলুপ্ত করুক, কিন্তু বিলুপ্তির পর বড় একটা শূন্যতা সৃষ্টি হবে। এই শূন্যতাটা পূরণের জন্য একটা বিকল্প ফোর্স গঠন করতে হবে। তবে সেখানে থাকবে স্মার্টার (আধুনিক) লোকজন।’

তবে সন্ত্রাস দমনে নতুন কোনো বাহিনী গঠন হলে সেখানে যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় লোকজন নেওয়া হয় তাহলে কোনো সুফল আসবে না উল্লেখ করে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে পুলিশের অথরিটি দিয়ে মিলিটারির আদলে ওইরকমই একটা ফোর্স করা যেতে পারে। আমি নিশ্চিত, ঠিকমতো যদি পরিচর্যা ও প্রশিক্ষণ করানো হয় তাহলে ওইরকমই (র‌্যাবের মতো) একটা ফোর্স সরকার করতে পারবে, যদি সরকার চায়। তাদের আইনকানুনও মিলিটারি লাইনে করতে হবে। তাদের জন্য আইনও থাকবে আলাদা। যদি ফোর্সের কোনো সদস্য আইন পরিপন্থী কাজ করে, তাহলে সামরিক কোর্ট মার্শালের মতো তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। অথবা অল্প সময়ের নোটিসে তাদের চাকরিচ্যুত করা হবে। এটা খুবই সম্ভব।’

এ প্রসঙ্গে র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) একেএম শহিদুর রহমান সম্প্রতি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমরা যতদিন র‌্যাবে দায়িত্ব পালন করব, আমাদের দায়িত্ব আমরা নিষ্ঠার সঙ্গে আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করব। র‌্যাব বিলুপ্তির ব্যাপারে সরকার যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, সেটাই শিরোধার্য। আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকব। শুধু সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচারের মাধ্যমেই আমরা দায়মুক্ত হতে চাই।’

গুম কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, গত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত কমিশনে গুমের অভিযোগ জমা হয়েছে ১ হাজার ৬০০টি। এর মধ্যে ৭৫৮টি অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়েছে। তার মধ্যে ১৭২ জন গুমের ঘটনার সঙ্গে র‌্যাবের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এমন গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে একটি বাহিনীকে কোনোভাবেই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে দিতে চায় না গুম কমিশন। র‌্যাব বিলুপ্তির পক্ষে যুক্তি দিয়ে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, “বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে গুম, খুন এবং ‘ক্রসফায়ারের’ নামে হত্যাকাণ্ডে র‌্যাবের অংশগ্রহণ ব্যাপক মাত্রায় ছিল। এই বাহিনীতে জবাবদিহির অভাব ছিল। বাহিনীটি সেনাবাহিনী, আনসার ও পুলিশের সংমিশ্রণে তৈরি করা। কাজেই তাদের কার্যক্ষেত্র ছিল দেশের অভ্যন্তরে। সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় শত্রু নিধনের এবং প্রতিরোধ করার জন্য। তাদের যখন আপনি দেশের জনগণের বিষয়ে কাজে লাগাতে চান তাদের তো প্রশিক্ষণ এক বুলেটে এক প্রাণ। এজন্য আমরা মনে করি এ ধরনের বাহিনী বিলুপ্ত করা উচিত।’

বাংলাদেশের প্রতিবেশী অনেক দেশেই এলিট ফোর্স আছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই এলিট ফোর্স বাতিলের ক্ষেত্রে বিকল্প কী হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোথাও কি লেখা আছে র‌্যাব এলিট ফোর্স? র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন লেখা আছে কিন্তু কোথাও এলিট ফোর্স শব্দটা খুঁজে পাবেন না। এমন বিশেষায়িত বাহিনী আরও আছে। তাদের ক্ষেত্রে তো আমরা এভাবে প্রশ্ন করছি না। এখানে বাহিনীগুলোকে যেভাবে স্বৈরাচার ব্যবহার করেছে, এটা কল্পনার বাইরে। এ ধরনের একটা খুনি বাহিনীকে বিলুপ্ত করার বিকল্প নেই।’

সৃষ্টির পর থেকে র‌্যাব জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণসহ প্রায় দেড় লাখ মাদক কারবারি, প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, ২ হাজার ৩০০ প্রতারক এবং সাড়ে সাত হাজার জনকে হত্যা ও ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। এ ছাড়া র‌্যাব সুন্দরবন ও চট্টগ্রামে ৪৫৫ জলদস্যুকে আত্মসর্মপণ এবং ৩১৪ সর্বহারাকে আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করে তাদের আলোর পথে নিয়ে আসে। র‌্যাব প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা মূল্যমানের অবৈধ মাদক উদ্ধার করে বলে তাদের গণমাধ্যম শাখা থেকে জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে র‌্যাব বিলুপ্ত হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে এমডি আব্দুল হামিদ বলেন, “আমি মনে করি হঠাৎ করে র‌্যাব তুলে দিলে এই সময়ের পরিস্থিতিতে পুলিশের জন্য সামাল দেওয়াটা খুবই কঠিন হয়ে যাবে। আমি খুবই জোরালোভাবে মনে করি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ ও মিলিটারির একসঙ্গে কাজ করার কোনো দরকার নেই। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে যখন ‘ইন এইড অব সিভিল পাওয়ারে’ যখন আর্মি ডাকা হয় তখন কিন্তু দুই বাহিনী আলাদা আলাদা থেকে কাজ করে। যৌথভাবে কাজ হলেও ফোর্সগুলো নিজেদের এখতিয়ার অনুযায়ী আলাদা থেকে কাজ করে। এটা কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য করা হয়। এ ক্ষেত্রে র‌্যাব যদি পুনর্গঠন করা হয় তাহলে র‌্যাবে স্বতন্ত্র নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। আর পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনী থেকে যাদের এখানে নিযুক্ত করা হয় তাদের ধীরে ধীরে নিজেদের বাহিনীতে ফেরত পাঠাতে হবে।”

র‌্যাব থেকে সেনাসদস্যদের প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন। তিনি বলেন, ‘র‌্যাব যে পরিস্থিতিতে রয়েছে, দৈনন্দিন আইনপ্রয়োগকারী হিসেবে যে কাজ করবে; সেটার মধ্যে আর্মিকে যোগ করা হয়েছে। এখান থেকে আর্মিকে সরাতে হবে। বিলুপ্তির অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে, সেখান থেকে এগুলোর তদন্ত কীভাবে হবে, র‌্যাবের যে বদনাম হয়েছে, র‌্যাবের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড, র‌্যাবের মাধ্যমে গুম-খুন হয়েছে; সেখানে র‌্যাবের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাই র‌্যাবকে বিলুপ্ত করা উচিত। র‌্যাবকে বিলুপ্ত করে যে ব্যবস্থা রাখতে হবে যেখান থেকে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা তদন্ত করতে পারবেন। এখানে শুধু র‌্যাব অপরাধ করে বিষয়টি এমন নয়। যারা ভবিষ্যতে এ ধরনের গুরুতর অপরাধ করবে, তাদের বিষয়ে তদন্ত করবে। সাধারণ পুলিশের ক্ষেত্রেও এ ব্যবস্থা করতে হবে। এখন যে পুলিশিংয়ের কাঠামো রয়েছে, সেখানেও সক্ষমতার অভাব রয়েছে। সেই বিষয়গুলো যদি সংস্কার না করা হয় বা জবাবদিহির আওতায় যদি না নেওয়া হয়, তাহলে শুধু র‌্যাব বিলুপ্ত করলেই হবে না; র‌্যাব বিলুপ্তর পাশাপাশি অর্জিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

র‌্যাব সংস্কারের অবস্থায় আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘পুলিশ সংস্কারের সঙ্গেই র‌্যাব সংস্কার হবে। এটা তো আলাদা করে করার কিছু নেই। পুলিশের সব সংস্কার নিয়ে তো কথা বলছে। র‌্যাব তো পুলিশের একটা ইউনিট। তবে যেটা হয়েছে, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড় হয়ে গিয়েছিল। এটা একটা খারাপ হয়েছে। র‌্যাব পুলিশের অধীন, কিন্তু অনেক সময় দেখা যেত, আইজি জানে না কিন্তু র‌্যাব অনেক কিছু করে ফেলে। এগুলো তো ঠিক নয়। এগুলোর ওপর তো একটা নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। যদিও র‌্যাবের মহাপরিচালক পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজি মর্যাদার, কিন্তু উনিও জানেন না, আসলে কী হচ্ছে।’

তবে র‌্যাব বিলুপ্ত হলে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন পুলিশের সাবেক এ আইজিপি। তিনি বলেন, ‘বিএনপি ও গুম কমিশন বাতিলের সুপারিশ করেছে কিন্তু সুপারিশ করলেই তো সরকার বাতিল করে দিচ্ছে না। এটা নিয়ে অনেক সংলাপ, কথাবার্তা হবে তারপর সিদ্ধান্ত হবে। এখানে সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে তো আর কারও কিছু করার নেই। এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়। তারা বিলুপ্তির সুপারিশ কেন করল? কারণ, র‌্যাবের মধ্যে তারা ভালোর থেকে মন্দের পরিমাণ তারা বেশি দেখতে পাইছেন। সব প্রতিষ্ঠানেই ভালো-মন্দ দুটিই থাকে। যেটাতে ভালোর পরিমাণ বেশি থাকে সেটাকে আমরা ভালো বলি। আর যেটাতে মন্দের পরিমাণ বেশি থাকে সেটাকে আমরা খারাপ বলি। যারা র‌্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে তাদের মতে, বিগত সময়ে পুলিশের এই ইউনিট ভালোর থেকে মন্দ বেশি করেছে। এজন্য এমন সুপারিশ করা হয়েছে বলে আমার মনে হয়। আরেকটা বিষয় হলো, র‌্যাব যে কাজটা করে সেটা পুলিশের অন্যান্য ইউনিট করে থাকে। সে ক্ষেত্রে র‌্যাব যদি বিলুপ্ত করে দেয়, তাহলে খুব একটা খারাপ কিছু হবে আমার মনে হয় না। পুলিশ যথেষ্ট সক্ষম এগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য। সন্ত্রাস দমন, মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের মতো কাজগুলো করার জন্য মূলত র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল। একই কাজ পুলিশের প্রায় প্রত্যেকটি ইউনিটই করে। এজন্য সরকারের সিদ্ধান্ত যেটা হয় ওইভাবেই চলবে।’