‘তুমি আসবে বলে জাকির হোসেন ভুল করে ফেলে তালে’ দুই দশক আগে একটি গানে কিংবদন্তি তবলাবাদক জাকির হোসেনকে এমনভাবেই তুলে ধরেছিলেন নচিকেতা চক্রবর্তী। যদিও জাকির হোসেন কখনো তালে ভুল করেছিলেন এমনটা শোনা যায়নি। ভারতীয় ধ্রুপদি সংগীতের এই পুরোধা ১৫ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।
জাকির হোসেন ভারতের পাশাপাশি বিশ্ব দরবারে অন্যতম শ্রদ্ধেয় শিল্পী। তার অসাধারণ দক্ষতা এবং সংগীতে অবদান তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতি এনে দিয়েছে। ফলে তার প্রয়াণে বিশ্ব জুড়ে থাকা শ্রোতা ও সহকর্মীরা শোকবিহ্বল থাকবেন তাই যেন স্বাভাবিক।
ওস্তাদ আল্লা রাখা খাঁর প্রথম সন্তান জাকির হোসেন। জন্ম ১৯৫১ সালের ৯ মার্চ ভারতের মুম্বাইয়ে। তিন বছর বয়স থেকে বাবার কাছে তবলায় হাতেখড়ি হয়েছিল তার। ১২ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে প্রথম কনসার্টে অংশ নেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন মুম্বাইয়ের মাহিমের সেন্ট মাইকেলস স্কুলে। স্নাতক করেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে।
সত্তরের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন জাকির হোসেন। শুরু হয় তার আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনে বিচরণ। ১৯৭৩ সালে জর্জ হ্যারিসনের লিভিং ইন দ্য ম্যাটেরিয়াল ওয়ার্ল্ড অ্যালবামে অংশগ্রহণ তাকে এনে দেয় বিরাট স্বীকৃতি। তার পর থেকেই বহু খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী যেমন জন ম্যাকলাফলিন, মিকি হার্ট, বিল ল্যাসওয়েল, ভ্যান মরিসন, জো হেন্ডারসনসহ আরও অনেকের সঙ্গে তবলা পরিবেশন করেন। তবলায় তিনি সংগত করেছেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, শিব কুমার শর্মা বা কত্থক নৃত্যশিল্পী বিরজু মহারাজকে।
বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, জন্মের পর তার বাবা তার কানে প্রার্থনা না শুনিয়ে তবলার তাল শুনিয়েছিলেন। সেই যে যাত্রা শুরু, তারপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
তবলাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্পর্কে কবি সাজ্জাদ শরিফকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি যখন এসেছি তখন বাদ্যযন্ত্র হিসেবে তবলা প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। আমার কাজের অর্ধেকটা ততদিনে সারা হয়ে গেছে। কয়েকটি ভাষায় বিচিত্র লোকের সঙ্গে কথাবার্তা চালানোর যোগ্যতা আমার পরিবেশনায় কিছু মাত্রা যোগ করেছে। এতে পৃথিবীর সব জায়গাতেই তবলার সঙ্গে খুব সহজে শ্রোতাদের যোগাযোগ ঘটানো সম্ভব হয়েছে। খুব শক্তিশালী একটি মাধ্যমকে পরিচিত করানোর একটি মাধ্যম হিসেবে আমি কাজ করেছি। কিন্তু আবার বলছি, আমি কিন্তু অনেকের মধ্যে একজন।’
শাস্ত্রীয় সংগীতের বিবর্তনের অনেকটাই দেখেছেন জাকির হোসেন। কিন্তু তিনি মনে করতেন ঘটনাচক্রে ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় উপস্থিত ছিলেন এই ওস্তাদ। ‘জন ম্যাকললিন যখন একজন তবলা-শিল্পী খুঁজছেন, আমি তখন সেখানে; কার্লোস স্যান্টানার যখন একজন ভারতীয় তবলা-শিল্পী প্রয়োজন, আমি সেখানে আছি। আমার বিরাট প্রতিভা ছিল, বা আমি দারুণ জনপ্রিয় ছিলামÑ ব্যাপারটা মোটেই সে রকম না। সংগীতের বড় বড় মহাজন আমার মধ্যে হয়তো কিছু দেখতে পেয়েছিলেন, যে কারণে ভেবেছিলেন, আচ্ছা, এই তরুণটিকে নিয়ে দেখা যাক তো।’
এভাবেই জাকির হোসেন উত্তরসূরিদের কাছ থেকে শেখা শাস্ত্রীয় সংগীতের সঙ্গে জনপ্রিয় ধারার একটা মিশ্রণ তৈরি করেছিলেন। ফলে তার ডিসকোগ্রাফি ছন্দ ও সুরের এক অনন্য মিশ্রণ। বিষয়টি মূলত শিল্পী হিসেবে তার প্রতিভার বহুমুখিতা তুলে ধরে। এসব ভূমিকার জন্য ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ এবং পদ্মবিভূষণের মতো সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। এছাড়াও চারটি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডস জিতেছেন জাকির হোসেন।
সত্তরের দশকে তার প্রথম অ্যালবামগুলো প্রকাশিত হয়। এই সময়ে বসন্ত রাইয়ের সঙ্গে ‘ইভিনিং রাগাস (১৯৭৯)’ তার উল্লেখযোগ্য কাজ। এছাড়া আশির দশকে ‘ফুটপ্রিন্টস ইন দ্য স্কাই (১৯৮১)’, ব্রিজভূষণ কাবরার সঙ্গে ‘দ্য ম্যাজিক অব মিউজিক অন গিটার (১৯৮২)’, সারেঙ্গী শিল্পী সুলতান খানের সঙ্গে ‘সুর তাল (১৯৯১)’ অ্যালবামগুলো প্রকাশ করেন। এগুলোতে তবলার জটিল তাল ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনির সঙ্গে মিশে এক অনন্য শৈলী তৈরি করে।
বিখ্যাত পরিচালক ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা বা বেরনার্দো বের্তোলুচ্চির সিনেমার জন্য তিনি বাজিয়েছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সাহায্যার্থে নিউ ইয়র্কের মেডিসন স্কয়ারে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ তবলা পরিবেশন করেছিলেন তার বাবা ওস্তাদ আল্লা রাখা খাঁ। সেদিন সেখানে ছিলেন জাকির হোসেনও।
এ নিয়ে তার ভাষ্য ছিল, ‘‘পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বাংলাদেশের বার্তা পৌঁছে দেওয়া খুবই দরকার ছিল। ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে সেটা করা গিয়েছিল। আমি সেখানে ছিলাম। পুরো ঘটনা স্বচক্ষে দেখেছি। জর্জ হ্যারিসন শুধু কনসার্টের আয়োজন করেই থেমে যাননি, তিনি নিশ্চিত করেছিলেন প্রত্যেক শিল্পী যেন কিছু অর্থও অনুদান করেন। আমি দেখেছি জর্জ হ্যারিসন নিজের হাতে বাক্স ধরে আছে, বব ডিলান চেক লিখে সে বাক্সে জমা দিচ্ছেন।’